প্রস্তাবিত বাজেট ঝামেলামুক্ত দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ উৎসাহিত করবে: সংসদে আলোচনা

জাতীয় সংসদ অধিবেশন
অর্থনীতি
দেশে এখন
0

জাতীয় সংসদে আলোচনায় সদস্যরা বলেছেন, দেশে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকে ঝামেলামুক্ত করতে প্রস্তাবিত বাজেটে ওয়ান-স্টপ সার্ভিস (একক সেবা) চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আজ (শনিবার, ২৭ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তারা বলেন, ‘স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা কমাতে এ ব্যবস্থা কার্যকর ভূমিকা রাখবে।’

গত ১১ জুন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করেন। এতে চলতি অর্থবছরের সম্ভাব্য ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে আগামী অর্থবছরে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আবদুল বারী বলেন, ‘আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার ওপর প্রস্তাবিত বাজেটে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, যাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা যায়।’

তিনি বলেন, ‘বাজেটে আর্থিক খাত সংস্কার, ব্যাংকিং ব্যবস্থার উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা, দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সংরক্ষণ নীতি এবং কর্মসংস্থানের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।’

গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে বাজেটে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের জন্য ভাতা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। আবদুল বারী বলেন, ‘গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হলে মূল্যস্ফীতি কমবে এবং সাধারণ মানুষ দ্রুত স্বস্তি পাবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সরকার সবক্ষেত্রে সততা ও দক্ষতার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। গত ১৭ বছরে ধ্বংস হয়ে যাওয়া প্রশাসনিক ব্যবস্থা ধাপে ধাপে পুনর্গঠন করা হচ্ছে।’

বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) ৩ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী এ অর্থ ব্যয়ের বিষয়ে সম্পূর্ণ সচেতন। একটি টাকাও যাতে অপচয় না হয়, সে জন্য কঠোর নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।’

তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী বলেন, ‘প্রস্তাবিত বাজেট দেশের অর্থনীতিকে নতুন রূপ দেবে। ফ্যাসিবাদী শাসন দেশের সব খাত ধ্বংস করে দিয়েছিল। প্রস্তাবিত বাজেট সেই খাতগুলো পুনরুজ্জীবিত করতে সহায়ক হবে।’

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, ‘বিভিন্ন ওষুধের কাঁচামালের ওপর কর কমানো হয়েছে, ফলে জীবনরক্ষাকারী অনেক ওষুধের দাম কমবে।’

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ‘জ্বালানি খাতে ১৭ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা এ খাতকে আত্মনির্ভরশীল করতে সহায়তা করবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য মোট জ্বালানি চাহিদার ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পূরণ করা।’

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বাজেটে ৫১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২৫ শতাংশ বেশি। বন্যা ও দুর্যোগপ্রবণ মানুষের পুনর্বাসন ও জীবন পুনর্গঠনের বিষয়েও বাজেটে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।’

গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহাম্মদ সোহেল মঞ্জুর এ বাজেট বাংলাদেশের অর্থনীতিকে স্থবিরতা থেকে গতিশীলতার পথে নিয়ে যাবে বলে জানান।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু বলেন, ‘বাজেট মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।’

সরকারি দলের সদস্য আলতাফ হোসেন চৌধুরী (পটুয়াখালী-১) বলেন, ‘বিএনপি সরকার সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে গত ৫৪ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দিয়েছে।’

বাজেট ঘাটতি প্রসঙ্গে সরকারি দলের সদস্য ব্যারিস্টার মোহাম্মদ নওশাদ জামির (পঞ্চগড়-১) বলেন, ‘বাজেট ঘাটতি নতুন কোনো বিষয় নয়। এটি স্বাভাবিক।’ তিনি উদাহরণ হিসেবে বলেন, ২০২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (মে পর্যন্ত) যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল বাজেট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ২৪৬ ট্রিলিয়ন ডলার।

অন্যদিকে, বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সদস্য শাহজাহান চৌধুরী (চট্টগ্রাম-১৫) প্রস্তাবিত বাজেটকে জনবান্ধব নয়, ব্যবসাবান্ধব বলে সমালোচনা করেন।

তিনি অর্থমন্ত্রীর বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলেন, ‘অর্থমন্ত্রী নিজেই বলেছেন যে ব্যবসার পরিবেশ সহজ করতে এ বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘দেশ শুধু ব্যবসায়ীদের নয়, ১৮ কোটি মানুষের। আপনি ব্যবসায়ী পরিবারের সদস্য বলেই শুধু ব্যবসায়ীদের জন্য বাজেট দিয়েছেন।’

সাবেক অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের কথা স্মরণ করে শাহজাহান চৌধুরী বলেন, ‘বাজেট উপস্থাপনের আগে তিনি বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে সহযোগিতা চাইতেন।’

তিনি অভিযোগ করেন, ‘যারা ফ্যাসিবাদী আমলে বাজেট প্রণয়ন করতেন, তারাই এবারও বাজেট তৈরি করেছেন। তারা জুলাই-৩৬-এর চেতনা বাস্তবায়ন করতে পারেননি।’ তিনি বলেন, ‘আপনারা চাইলে আমি তাদের পরিচয় দিতে পারি, কিন্তু সংসদে তাদের নাম বলতে চাই না।’

তিনি আরও বলেন, ‘ক্ষমতাসীন বিএনপিও জামায়াতে ইসলামীর মতো ‘‘সবার আগে বাংলাদেশ’’ স্লোগান দিয়েছে, কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটে সে স্লোগানের কোনো প্রতিফলন নেই। প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষকদের অবহেলা করা হয়েছে। কৃষক ছাড়া বাংলাদেশ টিকে থাকতে পারবে না।’

বরাদ্দের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘প্রস্তাবিত বাজেটে ১৫টি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ বাড়ানো হলেও বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ, কৃষি, জনপ্রশাসন, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান, স্বরাষ্ট্র, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং শিল্প মন্ত্রণালয়সহ ৯টি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ কমানো হয়েছে।’ বাজেট আলোচনায় সরকারি ও বিরোধী দলের আরও বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্য অংশ নেন।—বাসস

এএইচ