সবজির সবুজে ছেয়ে যাওয়া বিস্তৃত ক্ষেত, মোঠো সড়ক, ঘুঘুর ডাক কিংবা গোয়ালের আদুরে বাছুর— গ্রামীন সকল অনুষঙ্গে যোগ হয়েছে নতুন কিছু। ‘ভোট চাই ভোটারের’, মিছিল-স্লোগান কিংবা জন-জমায়েত।
কিন্তু মাঘের দ্রুত দুপুরে, পাইকারি বাজার ধরার তাড়া করে ফেরা নূর মোহাম্মদ। তার জীবনে এই এত আলোচিত নির্বাচন নতুন করে কী যোগ করবে, জীবনে কোনো দিন যিনি সংসদে ঢোকেননি, জানেন না আইনসভা কী, এমপির রুলস অব বিজনেস কী?
নূর মোহাম্মদ বলেন, ‘আমাগো দাম খুব একটা বাড়ে না, এমপি-মন্ত্রীদের দাম বাড়ে, আমরা পাবলিক তো পাবলিকই, জনগণ-জনগণই।’
অবশ্য সেই ভারত ভাগের আমলে জন্ম নেয়া অশীতিপর নজর আলীর কাছে নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭৩ থেকে ২০২৪; বাংলাদেশের ১২টি নির্বাচনের নিরব পর্যবেক্ষক এ বৃদ্ধার ভাষায়, একদলীয় শাসন মানেই তো ভয়।
নজর আলী বলেন, ‘এর আগে দলীয়ভাবে ভোট হয়েছে, ভেতরে গিয়ে সামনাসামনি ভোট দিতে হয়েছে। পারলে তারা অপমান-অপদস্ত, মারধরও করেছে। আমরা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারিনি, তাই ভালোও লাগেনি। আমার ভোট আমি দেবো, যাকে খুশি তাতে দেবো। তোরা মানুষকে খুশি করে ভোট নিস না! সমস্যাটা কী?’
এভাবে নির্বাচন নির্বাচন গুঞ্জণ প্রান্তে প্রান্তে। মাড় শূন্য করে ফেলা পাত্রে জাবর কাটা বকরি কিংবা ফুলকপি আর পাঙ্গাসে বলক ওঠা তরকারি নিয়ে ব্যস্ত থাকা ঘরের বউরাও যে অপেক্ষা করছে ১২ তারিখের।
আরও পড়ুন:
ভোটাররা জানান, এবারের ভোট নিয়ে বেশ উচ্ছ্বসিত তারা। আগের নির্বাচনগুলোতে ভোট দিতে না পারলেও এবারের নির্বাচনে তারা ভোট দিতে যাবেন এবং নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেবেন, এজন্য বেশ খুশি তারা। তবে অনেকে আক্ষেপও প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে নির্বাচন শেষ হলে ভোটারদের আর খোঁজ নেন না প্রার্থীরা।
গ্রামের পথগুলোর মোড়ে মোড় একচালা চায়ের দোকানগুলো প্রান্তিক মানুষের সারাদিনের ক্লান্তি শেষে অনেকটা উন্মুক্ত মঞ্চের মতো। গ্রামের কোথায় কী হচ্ছে, কী হতে যাচ্ছে—সারা বছর এ নিয়ে সরব থাকলেও, ভোটের আগে এসব চায়ের দোকান রূপ নেয় মিনি সংসদে।
অবশ্য শঙ্কা তো কিছুটা আছেই! তবুও ভোটের আগে প্রচারণার শেষদিনে এই ভোট উৎসব নিয়ে আশাবাদীই থাকতে চান তরুণ রিফাত-তিথি থেকে শুরু করে রিকশাচালক মাহমুদ জামিল।
তিনি জানান, ভোটের সময় ভোটাররা প্রার্থীদের কাছে প্রিয় থাকলেও, ভোটের পর তারা আর প্রিয় থাকেন না। তবে ১৭ বছর পর ভোট দেয়ার সুযোগ হারাতে চান না তিনি।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জুলাই পরবর্তী জনতার এমন অবস্থানে সরাসরি কারচুপি প্রায় অসম্ভব তবে অন্য জায়গায় রয়েছে শঙ্কা।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ এখন এই জুলাইয়ের জন্য পরিবর্তন হয়ে গেছে। যদি কোনো পার্টি বা নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের ফল পাল্টে দিতে চেষ্টা করে, তাহলে তারা তো ডুববেই, তাদের সঙ্গে আমরাও ডুববো। দেশপ্রেম না হলেও নিজেদের সারভাইভালের জন্য নির্বাচন কমিশনের প্রত্যেকেরই এ ব্যাপারে সাবধান থাকা উচিত বলে আমি মনে করি।’
এটা ঠিক এবারের নির্বাচনে নেতৃত্ব দেয়া দুই দলই কর্তৃত্ববাদী দীর্ঘ শাসনামালে জুলুম ও নির্যাতনের শিকার। এ বিশ্লেষক আশা করছেন, সেই স্মৃতি তৃণমূল নেতাকর্মীদের অপরাধপ্রবণতা কমাতে ভূমিকা রাখবে। সেই সঙ্গে তিনি মনে করেন, এ নির্বাচন সশস্ত্রবাহিনী, প্রশাসন রাষ্ট্রীয় সব বিভাগের কালিমা ঘোচানোর এক সুবর্ণ সুযোগ।





