বুড়িগঙ্গার বুকে সারিবেধে নোঙর করা দক্ষিণাঞ্চল দাপিয়ে বেড়ানো যাত্রীবাহী বিলাসবহুল লঞ্চ। লঞ্চের গায়ে আছড়ে পড়ছে ঢেউ। কিন্তু এখন আর নেই বাড়ি ফেরার তাড়া। চিমনি থেকে বের হয়না ধোঁয়া, লঞ্চের সাইরেনও বাজে না।
সড়কপথ যখন ব্যস্ত, নৌপথ তখন অলস। পদ্মা সেতুতে যান চলাচল শুরুর আগে বরিশাল-ঢাকা নৌ রুটে যেখানে গড়ে ১০-১৪টি লঞ্চ প্রতিদিন দুই প্রান্ত থেকে চলাচল করতো, সেখানে বর্তমানে চারটি লঞ্চ চলাচল করছে। এই বিশাল আয়ের লোকসান বন্ধে লঞ্চ মালিকরা কোটি টাকার স্বপ্নগুলোকে বিক্রি করে দিচ্ছেন কেজি দরে।
রাজধানীর হাসনাবাদ এলাকায় কেটে ফেলা হচ্ছে এক সময়ে নৌপথ দাপিয়ে বেড়ানো সুরুভী ৭ লঞ্চটি। হাতুড়ির আঘাতে এভাবেই সড়ক পথের গতির নিচে চাপা পড়েছে শত বছরের নৌ-ঐতিহ্য। লঞ্চ মালিকরা বলছেন, আগে যেখানে একটি ট্রিপে লাখ টাকা লাভ হতো, এখন তেলের খরচ আর স্টাফদের বেতন দেয়াই অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
সুন্দরবন নেভিগেশনের পরিচালক আখতার হোসেন বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের চারটি লঞ্চ চলাচল করে। আর বাকিগুলো বন্ধ রয়েছে। সবাইকে বেতন দিতে গিয়ে অনেক ঝামেলায় পড়তে হচ্ছে।’
এম খান ৭’র সুপারভাইজার মো. শুভ বলেন, ‘দিন দিন ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে। সরকার যদি এ সেক্টরের দিকে নজর দেয় তাহলে এই সেক্টরটি টিকে থাকবে। কেননা দক্ষিণ অঞ্চলের ঐতিহ্য হলো এই লঞ্চ।’
লঞ্চ মালিক সমিতি বলছে, পদ্মা সেতুর প্রভাব, তেলের দাম বৃদ্ধিতে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে গুলিস্তান থেকে সদরঘাটের যানজট সমস্যার কারণে যাত্রীরা নৌপথ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। এ বিষয়ে বি আই ডব্লিউ টি এর উদাসীনতাকে দায়ী করছে লঞ্চ মালিক সমিতি।
অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল যাত্রী পরিবহন সংস্থার মহাসচিব সিদ্দিকুর রহমান পাটোয়ারী বলেন, ‘পদ্মা সেতুর প্রভাব আর গুলিস্তান থেকে সদরঘাটের যানজট। এছাড়াও তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে।’
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়ক পথের পাশাপাশি নিরাপদ চলাচলে নৌ পথকেও সচল রাখতে সরকারকে কার্যকরী উদ্যোগ নিতে হবে।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আরমানা লাইভা বলেন, ‘বিশ্বের অনেক দেশেই এতো বেশি নদী পথ নেই। তাই আমরা যদি এই পথ ব্যবহার করতে পারি তাহলে অনেক আংশেই কমে যাবে রাস্তার জানজট।’
বিআইডব্লিউটি এর তথ্য অনুযায়ী, ৪ বছর আগে ঢাকা সদর ঘাট থেকে ঢাকা - বরিশাল সহ ৪৭ রুটে ১৬২ টি লঞ্চ চলাচল করতো। এখন চলছে ৫০ থেকে ৬০ টি মাত্র। আর রুট বন্ধ হয়ে গেছে ১৪ টি। তবে ঢাকার চারপাশে বৃত্তাকার নদী পথকে সচল রাখতে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বি আর ডব্লিউ টি এ। এর মাধ্যমে নৌপথ আবার সচল হবে নলে মনে করছেন তারা।
ঢাকা নদী বন্দরের নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক বিভাগের যুগ্ম পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘এই নৌ পথকে কিভাবে আরও সচল করা যায়। আর পর্যটনকেন্দ্রীক করা যায় তার জন্য পরিকল্পনা করা হয়েছে।’
পদ্মা সেতু চালুর পরে প্রতিদিন কোটি টাকার ওপর টোল আদায় হচ্ছে এবং সড়ক পরিবহনের আয় বেড়েছে কয়েক গুণ। সেখানে নৌপরিবহনের আয় কমেছে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ।





