আলবিসেলেস্তেদের তিন বিশ্বকাপ, সঙ্গে কিছু ‘কটু তর্ক’

আর্জেন্টিনার তিন বিশ্বকাপ শিরোপা জয় ঘিরে বিতর্ক
ফিচার , বিশ্বকাপ
এখন মাঠে
1

‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ খ্যাত ফুটবল বিশ্বকাপের আরও একটি আসর শুরু হয়ে গেলো। পরম আরাধ্য এ শিরোপার ছোঁয়া পেতে লড়াই করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। তবে শ্রেষ্ঠত্বের এ লড়াইয়ে সবাই জয়ী হতে পারে না, অধরা রয়ে যায় শিরোপাস্বপ্ন। বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দল আর্জেন্টিনা এর আগে দু’টি শিরোপা জয় করলেও তৃতীয় শিরোপা ঘরে তুলতে তাদের অপেক্ষা করতে হয় ৩৬ বছর। তবে তাদের তিনটি বিশ্বকাপ ঘিরেই রয়েছে বিতর্ক-সমালোচনা। এবারও কি দেখা যাবে বিশ্বকাপে এমন কোনো বিতর্ক? খরা কাটিয়ে ২০২২ সালে বিশ্বকাপ শিরোপা জয় করে আলবিসেলেস্তেরা। এর আগে, ১৯৮৬ ও ১৯৭৮ সালে এ শিরোপার স্বাদ পেয়েছিলো আর্জেন্টিনা। তবে বিরোধী শিবিরে আর্জেন্টিনার এ তিন শিরোপা জয় ঘিরে রয়েছে নানা ‘কটু তর্ক’।

১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপ

আর্জেন্টিনা ১৯৭৮ সালে ফিফা বিশ্বকাপ নিজেদের ঘরের মাঠে আয়োজন করার সুযোগ পেয়েছিলো। সেবারই প্রথমবার তারা জয় করে বিশ্বকাপ। সেই সময়ে দেশটির শাসক ছিলেন সামরিক স্বৈরশাসক জর্জ রাফায়েল ভিদেলা। মাত্র দুই বছর আগে একটি গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করে তিনি ক্ষমতায় বসেছিলেন। তার শাসনকালে দেশটিতে চলা বিভিন্ন বিশৃঙ্খলার কারণে বেশ কয়েকটি দেশ এ বিশ্বকাপের ভেন্যু বদলানোর দাবি জানায়। তবে আর্জেন্টিনার আপত্তির কারণে সেটা সম্ভব হয়নি।

পরে আর্জেন্টিনার তৎকালীন প্রশাসকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে চরম পক্ষপাতিত্বের। বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর আসে, তারা চেষ্টা করছিলেন বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অন্য দেশগুলোকে মানসিক চাপে রাখতে। সেই বিশ্বকাপ সবচেয়ে ফেভারিট দলগুলো ছিলো হাঙ্গেরি, ব্রাজিল, ফ্রান্স, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, সুইডেন, জার্মানি ও আর্জেন্টিনা। এসব কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে নেদারল্যান্ডসের সেসময়ের সেরা খেলোয়াড় ইয়োহান ক্রুইফ নিজেকে সেই বিশ্বকাপ আসর থেকে প্রত্যাহার করে নেন। তিনি এর আগের বিশ্বকাপে ‘গোল্ডেন বল’ জয়ী খেলোয়াড়।

আর্জেন্টিনাকে এ বিশ্বকাপে একচ্ছত্র সুবিধা দেয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠে। আরও বলা হয়, আগের ম্যাচের ফলাফল দেখে ম্যাচ পাতানো হয়েছে। পরে এ ধরনের বিতর্ক এড়াতেই ফিফা বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ দুই ম্যাচ একই সময়ে ফেলার নতুন নিয়ম করতে ‘বাধ্য হয়’ বলেও ধারণা রয়েছে।

এ আসরেই আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের অভিযোগটি ওঠে। আসরে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে তাদের প্রতিপক্ষ ছিলো পেরু। বিকেলের ম্যাচে ব্রাজিল পোল্যান্ডকে হারিয়ে দেয় ৩-১ গোলে। এতে ফাইনালে উঠতে হলে স্বাগতিক আর্জেন্টিনার সামনে সমীকরণ দাঁড়ায়, সন্ধ্যায় পেরুর সঙ্গে জিততে হবে কমপক্ষে ৪-০ গোলে।

অভিযোগ আছে, দেশটিকে বিভিন্ন সুবিধা ও প্লেয়ারদের বিপুল টাকা দিয়ে ম্যাচটিতে ফিক্সিং করায় স্বাগতিক দল। সেই ম্যাচে অবিশ্বাস্যভাবে পেরু হেরে যায় ৬-০ গোলে। ম্যাচে পেরুর খেলার ধরনই যেন বদলে যায়। সমালোচকদের দাবি, দারুণ ফর্মে থাকা দলটি যেন সেদিন নেমেছিলো হারার জন্যই। এ ম্যাচে পেরুর এত বড় ব্যবধানে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যায় ফেভারিট ব্রাজিল, এতে ফাইনালের টিকিট কাটে আর্জেন্টিনা।

ফাইনালে এর থেকেও ‘জঘন্য’ ঘটনার অভিযোগ ওঠে। ম্যাচে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ ছিলো হল্যান্ড (বর্তমান নেদারল্যান্ডস)। আলাপ রয়েছে, হল্যান্ডকে নিরাপত্তার অজুহাতে বহু পথ ঘুরিয়ে স্টেডিয়ামে নিয়ে যাওয়া হয় স্টেডিয়ামে, এমনকি হল্যান্ড দল মাঠে প্রবেশের ১০ মিনিট পর ঢোকে স্বাগতিকরা। এই ১০ মিনিট গ্যালারির দর্শকরা বোম-পটকা ফাটিয়ে হল্যান্ডের খেলোয়াড়দের আতঙ্কিত করার চেষ্টা করা হয়। অভিযোগ উঠে, ম্যাচের জন্য নির্ধারিত রেফারিকে আগেই পরিবর্তন করা হয়েছিলো এবং পরে অনৈতিকভাবে কাজে লাগিয়ে শিরোপা ঘরে তোলে আর্জেন্টিনা।

এর বহু বছর পর আর্জেন্টিনার সেই দলের কয়েকজন প্লেয়ার ঘটনাগুলোর সত্যতা স্বীকার করেছিলেন বলে বেশকিছু আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় খবর আসে।

১৯৮৬ সালের ‘হ্যান্ড অব গড’

আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় শিরোপা আসে তাদের ইতিহাসের অন্যতম সেরা কিংবদন্তি খেলোয়াড় ম্যারাডোনার হাত ধরে ১৯৮৬ সালে। তবে বিশ্বকাপের এ আসরে দিয়েগো ম্যারাডোনার বিতর্কটি ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ও কালজয়ী ঘটনা; যা মূলত ‘হ্যান্ড অব গড’ বা ‘ঈশ্বরের হাত’ গোল নামে পরিচিত।

ঘটনাটি ঘটেছিলো ১৯৮৬ সালের ২২ জুন। মেক্সিকো বিশ্বকাপের সেই আসরের কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড ম্যাচের ঘটনা ছিলো এটি। ম্যাচটি কেবল ফুটবলের ছিলো না, দু’দেশের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বও এ ম্যাচে যুগিয়েছিলো বাড়তি উত্তেজনা। ১৯৮২ সালে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের মধ্যে ‘ফকল্যান্ড যুদ্ধ’ সংঘটিত হয়, যেখানে আর্জেন্টিনা পরাজিত হয়। ফলে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড় ও সমর্থকদের কাছে এ ম্যাচটি প্রতিশোধ নেয়ার মঞ্চও ছিলো বটে।

ম্যাচের দ্বিতীয় হাফে শূন্য-শূন্য সমতার সময় ইংল্যান্ডের ডি-বক্সে একটি বল বাতাসে ভেসে ওঠে। ম্যারাডোনা ইংল্যান্ডের দীর্ঘকায় গোলরক্ষক পিটার শিলটনের সাথে লাফিয়ে ওঠেন এবং তার মাথা ব্যবহার করে বলটি জালে জড়ান। তবে পরে ভিডিওতে দেখা যায়, চতুরতার সাথে বাঁ-হাত দিয়ে বলটিতে আঘাত করে ইংল্যান্ডের জালে পাঠিয়ে দেন ম্যারাডোনা। তৎকালীন সময়ের ভিডিও প্রযুক্তি এতটা উন্নত না হওয়ায় তিউনিসিয়ান রেফারি আলী বিন নাসেরের চোখ এড়িয়ে যায় বিষয়টি।

ম্যাচ শেষে ম্যারাডোনাকে এ গোলের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি রসিকতা করে বলেন, ‘গোলটি হয়েছিল— খানিকটা ম্যারাডোনার মাথা দিয়ে, আর খানিকটা ঈশ্বরের হাত দিয়ে।’ সেই থেকেই এ গোলটি ‘হ্যান্ড অব গড’ নামে পরিচিতি পায়।

২০২২ বিশ্বকাপের কটু আলাপের ইস্যু ‘পেনাল্টি’

সবশেষ ২০২২ সালে দীর্ঘ ৩৬ বছরের বিশ্বকাপ খরা কাটিয়ে লিওনেল মেসি তার দলকে বহুল আকাঙ্ক্ষিত শিরোপা এনে দেন, একইসঙ্গে পূর্ণতা দেন নিজের ফুটবল ক্যারিয়ারকেও। তবে এ আসরেও ‘রসিক কটু তর্ক’ পিছু ছাড়েনি দলটির। বিরোধী শিবির থেকে নিয়মিত আলাপ উঠে দলটির নিয়মিত ‘পেনাল্টি’ পাওয়া নিয়ে।

বিশ্বকাপের এ আসরে ফাইনাল পর্যন্ত মোট ৭টি ম্যাচ খেলেছিলো দলটি, যার মধ্যে ৫টিতেই পেয়েছিলো পেনাল্টি। যা অন্য কোনো দলই পায়নি। এ নিয়ে আর্জেন্টিনাবিরোধী সমর্থকদের মধ্যে রয়েছে হাস্যরস। তবে, পেনাল্টি খেলার বৈধ একটি নিয়ম।

এসএইচ