মৃত্যুর পরও যার প্রভাব অমলিন; ‘চলচ্চিত্রকারদের চলচ্চিত্রকার’ ঋত্বিক ঘটক

ঋত্বিক ঘটক
শিল্পাঙ্গন
1

বাংলা চলচ্চিত্রের তিন কিংবদন্তি নির্মাতা সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন ও ঋত্বিক ঘটক। তবে জীবদ্দশায় প্রাপ্য স্বীকৃতির অনেকটাই পাননি ঋত্বিক। ১৯৭৬ সালে মাত্র ৫০ বছর বয়সে মারা গেলেও চলচ্চিত্রের ভাষা, নির্মাণশৈলী ও পরবর্তী প্রজন্মের নির্মাতাদের ওপর তার প্রভাব দিন দিন বিস্তৃত হয়েছে। এ কারণেই তাকে বলা হয় ‘চলচ্চিত্রকারদের চলচ্চিত্রকার’।

নির্মাতা, চিত্রনাট্যকার, লেখক ও অভিনেতা হিসেবে ঋত্বিকের প্রতিভা ছিল বহুমাত্রিক। তবে তার সবচেয়ে বড় অবদানগুলোর একটি ছিল ভারতের পুনের ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়ায় (এফটিআইআই) শিক্ষকতা। ষাটের দশকে প্রতিষ্ঠানটির উপাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি গড়ে তুলেছিলেন একদল নির্মাতা, যারা পরবর্তী সময়ে ভারতীয় চলচ্চিত্রের নতুন ধারার পথিকৃৎ হয়ে ওঠেন।

তার ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন কুমার শাহানি, মণি কাউল ও জন আব্রাহামের মতো নির্মাতা। বলিউডের জনপ্রিয় পরিচালক সুভাষ ঘাইও তার কাছে অভিনয়ের পাঠ নিয়েছেন। ঘাইয়ের ডিপ্লোমা চলচ্চিত্র ‘ফিয়ার’ পরিচালনা করেছিলেন ঋত্বিক নিজেই।

২০১৮ সালে দিল্লিতে ঋত্বিকের দুই প্রাক্তন ছাত্র নির্মাতা কুমার শাহানি ও সাঈদ আখতার মির্জা এক বিশেষ আয়োজনে তার চলচ্চিত্র নিয়ে আলোচনা করেন। উপলক্ষ ছিল ঋত্বিকের বিখ্যাত সিনেমা ‘মেঘে ঢাকা তারা’র ডিজিটাল পুনরুদ্ধার করা সংস্করণ প্রকাশ। বিশ্ব চলচ্চিত্রের গুরুত্বপূর্ণ কাজ সংরক্ষণ ও প্রকাশের জন্য পরিচিত দ্য ক্রাইটেরিয়ন কালেকশন ছবিটির নতুন সংস্করণ প্রকাশ করে।

আলোচনায় সাঈদ আখতার মির্জা ‘মেঘে ঢাকা তারা’র শব্দপ্রয়োগ ও অভিনয়ের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেন। তার মতে, ঋত্বিক অভিব্যক্তিবাদী উপাদান ও বাস্তবধর্মী অভিনয়ের অসাধারণ সমন্বয় ঘটিয়েছেন ছবিটিতে। বিশেষ করে অভিনেত্রী সুপ্রিয়া চৌধুরীর অভিনয় চলচ্চিত্রটিকে অনন্য মাত্রা দিয়েছে। অন্যদিকে কুমার শাহানি কলকাতার কলেজ স্ট্রিটে ধারণ করা একটি দৃশ্যের উদাহরণ দিয়ে দেখান, কীভাবে ঋত্বিক দর্শককে আবেগঘন গল্পের ভিন্ন এক বাস্তবতায় নিয়ে যেতে পারতেন।

আরও পড়ুন:

ঋত্বিকের ছাত্রদের চলচ্চিত্রেও তার প্রভাব স্পষ্ট। কুমার শাহানি ও মণি কাউল প্রচলিত নির্মাণরীতির বাইরে গিয়ে চলচ্চিত্রের নতুন ভাষা তৈরি করেন। শাহানির কাজে দৃশ্য ও আঙ্গিকের নিরীক্ষা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। অন্যদিকে মণি কাউল ঋত্বিকের মহাকাব্যিক নির্মাণরীতি দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত ছিলেন। তার চলচ্চিত্র ভাবনায় কাহিনির পাশাপাশি প্রকৃতি, ইতিহাস ও নানা দার্শনিক অনুষঙ্গও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

মালায়ালাম চলচ্চিত্রের নির্মাতা জন আব্রাহামের কাজেও ঋত্বিকের প্রভাব দেখা যায়। জনের ‘আগ্রাহারাথিল কাজুথাই’ (১৯৭৭) চলচ্চিত্রে সরল বর্ণনার পাশাপাশি রূপক ও বহুস্তরীয় ভাবনার ব্যবহার রয়েছে। ব্যক্তিগত অনুভূতি, সামাজিক বাস্তবতা ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে একসঙ্গে তুলে ধরার যে নির্মাণভঙ্গি ঋত্বিক তৈরি করেছিলেন, তা তার ছাত্রদের চলচ্চিত্র ভাবনাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

পরিচালক অপর্ণা সেন এক সাক্ষাৎকারে সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন ও ঋত্বিক ঘটককে বাংলা চলচ্চিত্রের তিন মহীরুহ হিসেবে উল্লেখ করেন। তার মতে, চলচ্চিত্রের সামগ্রিক ধারাবাহিকতায় ঋত্বিক হয়তো সত্যজিতের মতো ছিলেন না; তবে ফ্রেম নির্মাণ, লোকেশন নির্বাচন ও ক্যামেরার লেন্স ব্যবহারে তার দক্ষতা ছিল অসাধারণ।

ঋত্বিকের শিল্পীসত্তার অন্যতম উজ্জ্বল উদাহরণ ‘মেঘে ঢাকা তারা’র নীতা চরিত্র। উদ্বাস্তু পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্য নীতা নিজের জীবন ও স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে পরিবারের দায়িত্ব পালন করে। একসময় অভিমান ও ক্ষোভ নিয়ে বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার দৃশ্যে দুর্গাপ্রতিমা বিসর্জনের শব্দ ব্যবহার করে নির্মাতা চরিত্রটির যন্ত্রণা ও দেবীত্বের এক অসাধারণ প্রতীকী প্রকাশ ঘটান।

১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে ভারতীয় চলচ্চিত্র যখন নিজস্ব ভাষা খুঁজছিল, তখন ঋত্বিক তৈরি করেছিলেন স্বতন্ত্র নির্মাণরীতি। দেশভাগ, উদ্বাস্তু জীবন, মানুষের ব্যক্তিগত সংকট, ইতিহাস ও সামাজিক বাস্তবতা তার চলচ্চিত্রের প্রধান অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছিল। বাণিজ্যিক সাফল্য অবশ্য তার জীবনে খুব বেশি আসেনি। আটটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করলেও অর্থাভাব ও ব্যক্তিগত সংকটের কারণে তার বেশ কয়েকটি কাজ অসমাপ্ত থেকে যায়।

তবে জীবদ্দশার সীমাবদ্ধতা তার শিল্পীসত্তার প্রভাবকে থামাতে পারেনি। বরং তার ছাত্রদের হাত ধরে সত্তর ও আশির দশকে ভারতীয় চলচ্চিত্রে নতুন ধারার বিকাশে তার শিক্ষার প্রতিফলন দেখা যায়। চলচ্চিত্রের দৃশ্যভাষা, শব্দের ব্যবহার, আবেগের গভীরতা ও গল্প বলার ধরন পরবর্তী প্রজন্মের নির্মাতাদের কাছে হয়ে ওঠে গুরুত্বপূর্ণ পাঠ।

সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ঋত্বিক ঘটকের চলচ্চিত্রের আবেদন আরও বিস্তৃত হয়েছে। বাংলা ভাষা ও চলচ্চিত্র-অধ্যয়নের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরেও তার কাজ গুরুত্ব পেয়েছে। বিভিন্ন চলচ্চিত্র সংস্থা ও সংগ্রহশালার উদ্যোগে তার চলচ্চিত্র ডিজিটালভাবে পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণ করা হচ্ছে। ফলে নতুন প্রজন্মের দর্শক ও নির্মাতাদের কাছেও তার কাজ পৌঁছে যাচ্ছে।

জীবদ্দশায় সীমিত স্বীকৃতি পাওয়া এই নির্মাতা আজ ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে স্বতন্ত্র এক অবস্থানে। তার চলচ্চিত্র শুধু একটি সময়ের গল্প বলে না, বরং চলচ্চিত্র কীভাবে মানুষের ব্যক্তিগত যন্ত্রণা, সমাজ ও ইতিহাসকে ধারণ করতে পারে, তারও অনন্য উদাহরণ হয়ে আছে।

এসএস