২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার জারি করা একাধিক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, পাঁচটি উপজেলা পরিষদ এবং পাঁচটি পৌরসভার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ করা হয়। এতে স্থানীয় সরকারের চার স্তরে মোট ১২২ জন জনপ্রতিনিধি দায়িত্ব হারান।
অপসারিতদের মধ্যে রয়েছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ও ৩৭ জন কাউন্সিলর, পাঁচটি পৌরসভার পাঁচজন মেয়র ও ৬০ জন কাউন্সিলর, পাঁচটি উপজেলা পরিষদের পাঁচজন চেয়ারম্যান, পাঁচজন পুরুষ ভাইস চেয়ারম্যান ও পাঁচজন মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান। এছাড়া জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, সাধারণ সদস্য, সংরক্ষিত নারী সদস্য এবং বিশেষ কোটার সদস্যদেরও অপসারণ করা হয়।
পরবর্তীতে সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ দেয়া হয়। পাঁচটি পৌরসভায় সরকারি কর্মকর্তারা প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করছেন এবং উপজেলা পরিষদগুলো পরিচালিত হচ্ছে সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) মাধ্যমে।
তবে প্রশাসনিক কাঠামো সচল থাকলেও সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা মিলিয়ে জেলার ৯৭টি ওয়ার্ডে এখনো কোনো নির্বাচিত কাউন্সিলর নেই। ফলে নাগরিক সনদ প্রদান, ছোটখাটো বিরোধ নিষ্পত্তি, উন্নয়নকাজের তদারকি, সামাজিক সমস্যা সমাধানসহ বহু সেবায় সাধারণ মানুষকে বাড়তি ভোগান্তির মুখে পড়তে হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আগে জনপ্রতিনিধিরা এলাকাভিত্তিক সমস্যা দ্রুত সমাধান, প্রশাসনের সঙ্গে জনগণের সমন্বয় এবং সামাজিক নজরদারিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন। বর্তমানে সেই ভূমিকা কার্যত অনুপস্থিত থাকায় অনেক সমস্যাই দীর্ঘায়িত হচ্ছে।
আরও পড়ুন:
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, তৃণমূল পর্যায়ে জনপ্রতিনিধিদের অনুপস্থিতিতে সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ও জনসম্পৃক্ততা দুর্বল হয়ে পড়েছে। এর সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা সক্রিয় হয়ে উঠছে বলেও তাদের ধারণা।
গত ১ জুন থেকে ৯ জুলাই পর্যন্ত সময়ে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় হত্যা, ছিনতাই, ডাকাতির প্রস্তুতি, ধর্ষণের অভিযোগ, পুলিশের ওপর হামলা এবং মাদকসংক্রান্ত একাধিক ঘটনা সামনে এসেছে।
জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে এসময়ের কোনো সমন্বিত অপরাধসূচক (ক্রাইম ইনডেক্স) প্রকাশ না হলেও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী শহর, বন্দর, সিদ্ধিরগঞ্জ, ফতুল্লা, সোনারগাঁও ও আড়াইহাজারে একাধিক আলোচিত অপরাধের ঘটনা ঘটেছে। ব্যবসায়ীর মরদেহ উদ্ধার, গার্মেন্টসকর্মী ও অটোরিকশাচালক হত্যা, মহাসড়কে ছিনতাই, পুলিশের ওপর হামলা এবং মাদকবিরোধী অভিযানের ঘটনাগুলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নারায়ণগঞ্জ প্রশাসনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রশাসকরা দাপ্তরিক দায়িত্ব পালন করলেও একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির মতো প্রতিদিন মানুষের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকা সম্ভব হয় না। জনপ্রতিনিধিরা জনগণ ও প্রশাসনের মধ্যে কার্যকর সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করেন। তাদের অনুপস্থিতিতে অনেক সমস্যা স্থানীয় পর্যায়েই সমাধান করা যাচ্ছে না।’
নারায়ণগঞ্জের ৬ নম্বর অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা সমাজভিত্তিক নজরদারি ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। সেই কাঠামো দুর্বল হলে অপরাধীরা সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করে। তাই দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন করে জনগণের প্রতিনিধিদের দায়িত্ব ফিরিয়ে দেয়া হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।’
সংশ্লিষ্টদের অভিমত, প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও জনগণের সমন্বিত অংশগ্রহণ ছাড়া স্থানীয় সমস্যা কার্যকরভাবে সমাধান এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। তাই দীর্ঘদিনের এই জনপ্রতিনিধিশূন্যতা কাটিয়ে দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের দাবি দিন দিন আরও জোরালো হয়ে উঠছে।





