কিশোরগঞ্জে ২ দিনে পানিতে ডুবে ৯ জনের মৃত্যু

কিশোরগঞ্জ
নিখোঁজ ব্যক্তিকে উদ্ধারে কাজ চলছে
এখন জনপদে
0

মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে কিশোরগঞ্জের আট উপজেলায় পৃথক নয়টি ঘটনায় পানিতে ডুবে প্রাণ হারিয়েছেন ৯ জন। গত শুক্রবার (২৪ জুলাই) সকাল থেকে শনিবার (২৫ জুলাই) বিকেল পর্যন্ত ঘটে যাওয়া এসব ঘটনায় নিহতদের মধ্যে রয়েছে ৬ শিশু, দুই যুবক ও একজন মধ্যবয়সী ব্যক্তি।

একের পর এক এমন মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় পুরো জেলায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। একই সঙ্গে বর্ষা মৌসুমে জলাশয় ঘিরে শিশু ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

নিহতরা হলেন— নিকলী উপজেলার কারপাশা ইউনিয়নের নানশ্রী গ্রামের নজরুল ইসলামের ছেলে মোহাম্মদ হাকিম (৫), গাজীপুরের টঙ্গী এলাকার এরশাদ নগরের বাসিন্দা আলমগীর হোসেনের ছেলে ও মাদ্রাসাছাত্র আরিফ হোসেন (১২), কটিয়াদী উপজেলার দক্ষিণ লোহাজুরি গ্রামের মজলু মিয়ার ছেলে নাঈম মিয়া (১১), ভৈরব উপজেলার জগন্নাথপুর মধ্যপাড়া এলাকার মো. সোহেল মিয়ার ছেলে শুভ ইসলাম স্মরণ (১২), কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার গাইটাল এলাকার ফিজিওথেরাপিস্ট বাছির উদ্দিন মিলন (৪২),

ইটনা উপজেলার পাঁচকাহনীয়া গ্রামের মো. নাইমের মেয়ে ফাইজা (৮), সদর উপজেলার লতিবাবাদ ইউনিয়নের ডুবাইল গ্রামের হেলাল উদ্দিনের ছেলে ফয়সাল (২২), বাজিতপুর পৌর শহরের মিরারবন্দ গ্রামের সুজন মিয়ার ছেলে তাহসিন মিয়া (৩) এবং একই গ্রামের শাওন মিয়ার মেয়ে মাওয়া আক্তার।

পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় সূত্র জানায়, শুক্রবার সকাল ৮টার দিকে নিকলী উপজেলার নানশ্রী গ্রামে বাড়ির পাশে খেলতে গিয়ে পুকুরে পড়ে যায় পাঁচ বছরের শিশু মোহাম্মদ হাকিম। স্বজনরা উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

একই দিন বেলা সাড়ে ১১টার দিকে গাজীপুরের টঙ্গী এলাকার বাইতুল কোরআন কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক ও প্রায় ৪০ জন শিক্ষার্থী শিক্ষা সফরে মিঠামইনের হাওরে বেড়াতে আসেন। ভ্রমণ শেষে ইসলামপুর ঘাট এলাকায় গোসল করতে নামলে পানির স্রোতে ভেসে যায় ১২ বছর বয়সী মাদ্রাসাছাত্র আরিফ হোসেন। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

শুক্রবার দুপুর ২টার দিকে কটিয়াদী উপজেলার দক্ষিণ লোহাজুরি গ্রামের নাঈম মিয়া সহপাঠীদের সঙ্গে বিলে গোসল করতে যায়। কিছুক্ষণ পর একটি প্লাস্টিকের বোতল আনতে একাই বিলে ফিরে গেলে গভীর পানিতে তলিয়ে যায় সে। স্থানীয়রা উদ্ধার করে হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

আরও পড়ুন:

ভৈরব উপজেলার জগন্নাথপুর মধ্যপাড়া এলাকার শুভ ইসলাম স্মরণ বৃহস্পতিবার গোসল করতে বের হয়ে নিখোঁজ হয়। শুক্রবার বিকেলে স্থানীয়রা জগন্নাথপুর এলাকার নদীতে তার মরদেহ ভাসতে দেখে পুলিশকে খবর দেয়। পরে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে।

শুক্রবার বিকেলে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে হাওর ভ্রমণে গিয়ে করিমগঞ্জ উপজেলার বালিখলা হাওরসংলগ্ন মিঠামইনের হাসানপুর ব্রিজ এলাকায় ঘটে হৃদয়বিদারক এক ঘটনা। মেয়ে শেমন্ত্রী আক্তার পানিতে তলিয়ে যেতে শুরু করলে তাকে বাঁচাতে পানিতে ঝাঁপ দেন বাছির উদ্দিন মিলন। মেয়েকে নিরাপদে তুলে দিতে সক্ষম হলেও নিজে আর পানির ওপর ভেসে উঠতে পারেননি। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

শনিবার সকাল ৮টার দিকে ইটনা উপজেলার বরিবাড়ি ইউনিয়নের পাঁচকাহনীয়া এলাকার নদী থেকে উদ্ধার করা হয় আট বছর বয়সী ফাইজার মরদেহ। শুক্রবার বিকেলে ভাইয়ের সঙ্গে নদীতে গোসল করতে নেমে সে নিখোঁজ হয়েছিল। ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল ও স্থানীয়দের দীর্ঘ অনুসন্ধানের পরও তাকে পাওয়া যায়নি। পরদিন সকালে ঘটনাস্থলের কাছেই তার মরদেহ ভেসে ওঠে।

একই দিন দুপুরে কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার নীলগঞ্জ বাজার নদীর ঘাটে গোসল করতে নেমে পানিতে ডুবে মারা যান ফয়সাল (২২)। তিনি তাবলিগ জামাতের সঙ্গীদের সঙ্গে নীলগঞ্জ বাজার জামে মসজিদে ধর্মীয় কার্যক্রমে অংশ নিতে সেখানে গিয়েছিলেন। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল প্রায় তিন ঘণ্টার অভিযান চালিয়ে বিকেল পৌনে ৪টার দিকে তার মরদেহ উদ্ধার করে।

শনিবার দুপুর আনুমানিক আড়াইটার দিকে বাজিতপুর পৌর শহরের মিরারবন্দ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনের খালে খেলতে গিয়ে পানিতে পড়ে যায় তিন বছর বয়সী তাহসিন মিয়া ও শিশু মাওয়া আক্তার। স্থানীয়দের সহায়তায় উদ্ধার করে জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক দুজনকেই মৃত ঘোষণা করেন।

ঘটনার সত্যতা পৃথকভাবে নিশ্চিত করেছেন নিকলী থানার ওসি মো. মাহবুবুর রহমান, মিঠামইন থানার এসআই তাইজুল ইসলাম, কটিয়াদী মডেল থানার ওসি মো. রফিকুল ইসলাম, ভৈরব থানার তদন্ত কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত ওসি) লিমন বোস, করিমগঞ্জ থানার ওসি মো. সোহেব খান, ইটনা থানার ওসি হাবিবুল্লাহ খান, বাজিতপুর থানার ওসি এসএম শহিদুল্লাহ এবং কিশোরগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টেশন অফিসার মোমেন মুর্শেদ।

একের পর এক এসব দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবারে চলছে আহাজারি। স্থানীয়দের ভাষ্য, বর্ষাকালে অসতর্কতা, অভিভাবকদের নজরদারির ঘাটতি এবং অরক্ষিত জলাশয় এসব দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এফএস