মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের ছায়া, প্রবাসীদের উদ্বেগ—কী করবেন, কীভাবে থাকবেন নিরাপদ?

ইরান ইসরাইল যুদ্ধ
প্রবাস
0

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্টাপাল্টি হামলা, সামরিক ঘাঁটিতে অতর্কিত আঘাত এবং উচ্চপর্যায়ের নিরাপত্তা সতর্কতা; সব মিলিয়ে এক অনিশ্চিত সময় পার করছে অঞ্চলটি। ইরান, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান উত্তেজনা উপসাগরীয় দেশগুলোতে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। অনেকে দিন কাটাচ্ছেন আতঙ্কে, কেউবা পরিবারকে দেশে পাঠানোর কথা ভাবছেন। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন সংকটকালে আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন ঠাণ্ডা মাথায় পরিকল্পিত প্রস্তুতি।

সংঘাতের সময় সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়ায় গুজব। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভুয়া ভিডিও, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি বিভ্রান্তিকর অডিও কিংবা যাচাইবিহীন বার্তা মুহূর্তেই আতঙ্ক ছড়ায়।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, কেবল স্থানীয় সরকারের অফিসিয়াল পোর্টাল, নির্ভরযোগ্য টেলিভিশন চ্যানেল ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্যের ওপর নির্ভর করা উচিত। কোনো এলাকা ছাড়ার আগে অবশ্যই নিশ্চিত হতে হবে সেটি সরকারি নির্দেশ কি না। ভুল তথ্যের ভিত্তিতে হঠকারী সিদ্ধান্ত বড় ধরনের আইনি জটিলতা কিংবা প্রাণহানির কারণ হতে পারে।

বিদেশের মাটিতে প্রবাসীদের সবচেয়ে বড় আশ্রয় সংশ্লিষ্ট দেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস বা কনস্যুলেট। জরুরি হটলাইন নম্বর সংগ্রহ করে রাখা, নিজের বর্তমান ঠিকানা দূতাবাসে নিবন্ধন করা এবং নিয়মিত আপডেট অনুসরণ করা এখন সময়ের দাবি। অতীতে বিভিন্ন দেশে সংকটের সময় দূতাবাসের তৎপরতায় প্রবাসীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার নজির রয়েছে। তাই যোগাযোগ সক্রিয় রাখাই নিরাপত্তার প্রথম ধাপ।

ব্যক্তিগত প্রস্তুতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। পাসপোর্ট, আকামা বা ওয়ার্ক পারমিট, বিমা ও অন্যান্য নথি একটি ওয়াটার প্রুফ ব্যাগে গুছিয়ে রাখা উচিত। গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রের স্ক্যান কপি ইমেইল বা ক্লাউডে সংরক্ষণ করলে প্রয়োজনে দ্রুত পরিচয় প্রমাণ করা সম্ভব। ব্যাংকিং সেবা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় অন্তত এক থেকে দুই মাসের খরচের সমপরিমাণ নগদ অর্থ সংরক্ষণ করতে পরামর্শ দিচ্ছেন অর্থনীতিবিদরা। যারা নিয়মিত ওষুধ সেবন করেন, তারা বাড়তি মজুত রাখার কথাও বলা হচ্ছে।

নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা আরও সতর্ক করছেন, হামলার শব্দ শুনে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ভিডিও করা বা বাইরে বের হওয়া চরম ঝুঁকিপূর্ণ। সামরিক স্থাপনা, তেল শোধনাগার বা গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবনের আশপাশে অযথা ঘোরাঘুরি কিংবা ছবি তোলা থেকেও বিরত থাকতে হবে। সংঘাতকালে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ে, সামান্য অসতর্কতাও বড় বিপদের কারণ হতে পারে।

এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের অনিশ্চয়তার পাশাপাশি উন্নত জীবনের আশায় অনেকেই নজর দিচ্ছেন ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার দিকে। ২০২৬ সালে কাজের ভিসা প্রক্রিয়ায় কড়াকড়ি বাড়লেও সঠিক প্রস্তুতি থাকলে সুযোগ এখনো রয়েছে। কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাজ্যে স্কিলড বা জেনারেল ওয়ার্ক ভিসার জন্য বৈধ জব অফার, শিক্ষাগত সনদ, ভাষা দক্ষতার প্রমাণ ও পুলিশ ক্লিয়ারেন্স অপরিহার্য। অনলাইন আবেদন, বায়োমেট্রিক ও সাক্ষাৎকারসহ পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।

যুক্তরাজ্যে স্নাতক পর্যায়ে পড়াশোনার জন্য স্টুডেন্ট ভিসা এখনো আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের প্রধান পথ। টার্ম চলাকালে সপ্তাহে ২০ ঘণ্টা কাজের সুযোগ এবং কোর্স শেষে গ্র্যাজুয়েট ভিসায় দুই বছর থাকার সুবিধা অনেকের কাছে আকর্ষণীয়। তবে স্থায়ী বসবাসের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন, যেমন স্কিলড ওয়ার্কার ভিসায় রূপান্তর ও নির্দিষ্ট সময় পূরণ।

অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এফ-১ শিক্ষার্থীদের পরিবারের জন্য এফ-২ ভিসা এখনো চালু থাকলেও নতুন প্রশাসনের কড়াকড়ির কারণে আর্থিক প্রমাণ ও ভিসা শর্তে নজরদারি বেড়েছে। এফ-২ ভিসাধারীরা কাজ করতে পারেন না এবং পূর্ণকালীন ডিগ্রি প্রোগ্রামে অংশ নিতে পারেন না, ফলে আর্থিকভাবে সম্পূর্ণ নির্ভরশীল থাকতে হয়। তবে চাইলে স্ট্যাটাস পরিবর্তনের মাধ্যমে এফ-১ ভিসায় রূপান্তরের সুযোগ রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রবাস জীবন মানেই চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার মিশেল। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের আশঙ্কা হোক বা পশ্চিমা দেশগুলোর কঠোর ভিসা নীতি; প্রতিটি পরিস্থিতিতে প্রয়োজন সচেতনতা, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত ও ধৈর্য। বিদেশের মাটিতে লাখো বাংলাদেশি একই বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। সম্মিলিত সতর্কতা, দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ এবং ব্যক্তিগত প্রস্তুতিই পারে এই অনিশ্চিত সময়কে নিরাপদে পার করে দিতে।

এএইচ