গত সোমবার (১৮ মে) স্থানীয় সময় বেলা ১১টা ৪৩ মিনিটে দুই তরুণ বন্দুকধারী যখন মসজিদ ও স্কুল কমপ্লেক্সটিতে ঢুকে বড় ধরণের গণহত্যার চেষ্টা করছিল, তখন আমিন আবদুল্লাহ নিজের জীবন বাজি রেখে তাদের প্রবেশদ্বারে আটকে দেন।
সান ডিয়েগোর পুলিশ প্রধান স্কট ওয়াহল এক সংবাদ সম্মেলনে তার ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, ‘আমিন আবদুল্লাহ যে বীরত্ব দেখিয়েছেন, তা নিঃসন্দেহে শত শত শিশুর জীবন বাঁচিয়েছে। তিনি না থাকলে পরিস্থিতি আরও কতটা ভয়াবহ হতে পারত, তা ভাবা যায় না।’
ঘটনার সময় মসজিদ কমপ্লেক্সের ভেতরে অবস্থিত বেসরকারি ইসলামিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘আল রশিদ স্কুল’-এ ৫ বছর বা তার বেশি বয়সী শতাধিক শিশু আরবি ভাষা, ইসলামিক স্টাডিজ ও কুরআন শিক্ষার ক্লাসে অংশ নিচ্ছিল। আকাশ থেকে ধারণ করা গণমাধ্যমের ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, ডজন ডজন পুলিশ গাড়ির উপস্থিতির মধ্যে সশস্ত্র অফিসাররা শিশুদের হাত ধরে এক সারিতে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন।
আমেরিকান মুসলিম স্কলার ওমর সুলেইমানসহ দেশটির লাখ লাখ মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ বীরের প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন। জানা গেছে, সব সময় নিষ্পাপ মানুষদের রক্ষা করার তাগিদ থেকেই আমিন আবদুল্লাহ নিরাপত্তা রক্ষীর পেশা বেছে নিয়েছিলেন।
মৃত্যুর মাত্র কয়েকদিন আগে গত ৫ মে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাফল্যের সংজ্ঞা নিয়ে এক আবেগঘন পোস্ট দিয়েছিলেন তিনি। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, ‘অনেকের কাছে সাফল্য মানে অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব, সুখ্যাতি বা সৌন্দর্য। কিন্তু আমার কাছে! আল্লাহর কসম, সাফল্য হলো আমাদের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর কাছে ঠিক সেই পবিত্র আত্মা নিয়ে ফিরে যাওয়া, যা তিনি আমার জন্মের সময় ধার দিয়েছিলেন।’
এছাড়া গত ১৩ মে এক পোস্টে মসজিদের মিনারে একটি বাজপাখি বসার ভিডিও দিয়ে তিনি লিখেছিলেন, ‘মিনারে আবার বাজপাখি, আল্লাহু আকবার।’ তার প্রোফাইলে নিয়মিত ইসলাম নিয়ে চিন্তাভাবনা এবং তার তীর-ধনুক নিক্ষেপ অনুশীলনের ভিডিও থাকত।
এদিকে পুলিশের তদন্তে হামলাকারীদের বিষয়ে অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। পুলিশ জানিয়েছে, হামলাকারী দুই তরুণের বয়স ১৭ এবং ১৮ বছর। হামলার ঠিক আগেই এক হামলাকারী তরুণের মা পুলিশকে ফোন করে জানিয়েছিলেন যে, তাঁর ছেলে আত্মহত্যার প্রবণতা নিয়ে বাড়ি থেকে গাড়ি ও অস্ত্রসহ নিখোঁজ হয়েছে।
আরও পড়ুন:
পুলিশ যখন জানতে পারে ছেলেটি একা নয়, বরং ছদ্মবেশী পোশাক পরে আরেকজন পরিচিতকে নিয়ে বের হয়েছে, তখন পুলিশ স্বয়ংক্রিয় লাইসেন্স প্লেট রিডারসহ আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে তাদের খোঁজা শুরু করে। পুলিশ একটি শপিং মল ও তাদের একটি স্কুলেও সতর্কবার্তা পাঠায়। কিন্তু পুলিশ যখন মায়ের সাক্ষাৎকার নিচ্ছিল, ঠিক সেই সময়ই মসজিদে হামলার খবর আসে।
পুলিশ প্রধান স্কট ওয়াহল জানিয়েছেন, নির্দিষ্ট করে এই মসজিদের বিরুদ্ধে আগে কোনো হুমকি ছিল না। তবে তদন্তে জানা গেছে, হামলাকারীরা সাধারণত ইসলামবিদ্বেষী বা ঘৃণামূলক বক্তব্য ব্যবহার করত। এই হামলায় আমিন আবদুল্লাহসহ ৩ জন প্রাপ্তবয়স্ক মুসল্লি নিহত হন এবং পরে পুলিশের ধাওয়ার মুখে কয়েক ব্লক দূরে হামলাকারী দুই তরুণ নিজেদের গুলিতে আত্মহত্যা করলে সর্বমোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৫ জনে।
এই নৃশংস হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম মুসলিম নাগরিক অধিকার ও অ্যাডভোকেসি গ্রুপ ‘কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস’ (কেয়ার)। এক বিবৃতিতে তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমেরিকায় মুসলিমবিদ্বেষী ঘৃণা এখন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। রাজনীতিবিদদের ক্রমাগত উসকানিমূলক বক্তব্য এবং হাউস রিপাবলিকানদের মুসলিমবিদ্বেষী শুনানির চূড়ান্ত পরিণতিই হলো উপাসনালয়ে এই রক্তাক্ত হামলা। এটি যতটা গ্রহণযোগ্য নয়, ততটাই অনুমেয় ছিল।’
মসজিদের পরিচালক ইমাম তাহা হাসানে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, উপাসনালয়কে লক্ষ্যবস্তু করা অত্যন্ত জঘন্য কাজ। ঘটনার ঠিক আগেই একদল অমুসলিম মানুষ ইসলাম সম্পর্কে জানতে মসজিদ পরিদর্শনে এসেছিলেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই ঘটনাকে একটি ‘ভয়াবহ পরিস্থিতি’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
অন্যদিকে নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি এ সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানিয়ে কোনো ধরণের সরাসরি হুমকি না থাকা সত্ত্বেও সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে শহরের সমস্ত মসজিদে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন ও বিশেষ নিরাপত্তা টহল জোরদার করার নির্দেশ দিয়েছেন।





