এটি দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় প্রধান তেলক্ষেত্রগুলোকে লোহিত সাগরের ‘ইয়ানবু’ বন্দরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধ শুরুর পর কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় বিকল্প পথ হিসেবে সৌদি আরব মূলত এ পাইপলাইনের ওপরই ভরসা করে আসছিল।
সৌদি শক্তি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রিয়াদ ও মদিনা অঞ্চলে হামলায় অবকাঠামোগত ক্ষতি এবং কয়েকজন আহত হওয়ার পর ‘পূর্বসতর্কতা’ হিসেবে এ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে।
এরইমধ্যে যুদ্ধে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। অন্যদিকে লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদেব প্রণালিতেও হামলা জোরদার করেছে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা। চরম ঝুঁকিপূর্ণ এমন মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্যের এ মূল বিকল্প পথটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা বড় ধরণের সংকটে পড়ল।
ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কতটুকু?
হামলায় পাইপলাইনটির কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তা এখনো স্পষ্ট নয়। এটি ফের সচল হতে কতদিন সময় লাগবে তা নিয়েও ভিন্ন ভিন্ন মতামত পাওয়া যাচ্ছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, মেরামত কাজ শেষ হতে ৫ থেকে ৬ সপ্তাহ লেগে যেতে পারে। তবে অপর একটি সূত্র বলছে, দ্রুততম সময়ের মধ্যেও কার্যক্রম শুরু হতে পারে।
সৌদি কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, ইরাকের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় মাইসান প্রদেশ থেকে ড্রোনগুলো উৎক্ষেপণ করা হয়। এলাকাটি ইরানি সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থিত এবং দীর্ঘদিন ধরেই সেখানে ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীর সক্রিয় উপস্থিতি রয়েছে।
এর আগে গত মার্চেও ইয়ানবুতে অবস্থিত ‘সৌদি আরামকো-এক্সনমোবিল’ শোধনাগারের কাছে এক হামলায় অপরিশোধিত তেল খালাস সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়েছিল। সেবার কয়েক দিনের মধ্যেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসলেও, সাম্প্রতিক এ হামলা প্রমাণ করে যে দেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় তেল অবকাঠামোও এখন আর নিরাপদ নয়।
ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন কী?
পেট্রোলাইন নামে পরিচিত এ পাইপলাইনটি ১৯৮১ সালে নির্মিত হয়। এটি আবকাইকের কাছে অবস্থিত সৌদি পূর্বাঞ্চলীয় তেলক্ষেত্রগুলো থেকে তেল নিয়ে আরব উপদ্বীপ অতিক্রম করে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে পৌঁছে দেয়।
এর সর্বোচ্চ পরিবহন ক্ষমতা দৈনিক ৭০ লাখ ব্যারেল হলেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বাস্তব সরবরাহ বেশ কম ছিল। লোহিত সাগরে হুথি হামলার কারণে রুটটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক সংস্থা কেপলারের তথ্য অনুযায়ী আগস্টে এর মাধ্যমে সরবরাহ কমে দৈনিক ২০ লাখ ব্যারেলে নেমে আসে, যা জানুয়ারি পর সর্বনিম্ন।
তবে যুদ্ধের প্রাথমিক দিনগুলোতে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সৌদি আরব এই পথ দিয়ে সরবরাহ বাড়িয়ে দৈনিক ৪০-৫০ লাখ ব্যারেলে উন্নীত করেছিল—যা বৈশ্বিক মোট সরবরাহের প্রায় ৪ থেকে ৫ শতাংশ। এর মাধ্যমে দেশটি হরমুজ প্রণালীর অচলাবস্থাকে পাশ কাটাতে সক্ষম হয়েছিল।
কেন এটি বৈশ্বিক বাজারের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ?
পাইপলাইনটি এমন এক সময়ে বন্ধ হলো যখন বিশ্ব তেল বাজার এমনিতেই সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেলের এক-পঞ্চমাংশের বেশি—অর্থাৎ দৈনিক প্রায় ২ কোটি (২০ মিলিয়ন) ব্যারেল তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো। ইন্ডাস্ট্রি ডেটা অনুযায়ী তা এখন আশঙ্কাজনকভাবে কমে দৈনিক ৬০ থেকে ৯০ লাখ ব্যারেলে ঠেকেছে।
এ ঘাটতি মেটাতে রিয়াদ লোহিত সাগরের দিকে বেশি তেল পাঠানো শুরু করলেও নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়েছে সেই রুট, এর স্টোরেজ সুবিধা এবং জ্বালানিবাহী ট্যাংকারগুলো।
রয়টার্স জানায়, পাইপলাইনটি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে ইয়ানবু বন্দরে জমা থাকা মজুত দিয়ে বড়জোর ৫ থেকে ৭ দিনের রপ্তানি সচল রাখা যাবে। এছাড়া মিসরের আইন সুখনা এবং সিদি কেরির সুবিধাকেন্দ্রে থাকা সৌদি তেল দিয়ে আরও কিছুদিন চলানো সম্ভব।
তবে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হওয়ায় এরইমধ্যে কমতে শুরু করেছে বৈশ্বিক রিজার্ভ। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) জানিয়েছে, হরমুজ ও লোহিত সাগরের অচলাবস্থার কারণে আগস্টে সৌদি তেলের সরবরাহ তিন দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। এ বছর বিশ্বজুড়ে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ দিনে প্রায় ৫৭ লাখ ব্যারেল বা মোট বৈশ্বিক সরবরাহের ৬ শতাংশ হ্রাস পেতে পারে।
স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভ থেকে তেল বাজারে ছাড়ায় ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি ৭০ থেকে ৯০ ডলারের মধ্যে ধরে রাখা সম্ভব হলেও, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে রিজার্ভ খালি হয়ে দাম লাফিয়ে বাড়বে। আইইএ সতর্ক করে বলেছে, রিজার্ভের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেলে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি ১৫০ ডলারে গিয়ে ঠেকতে পারে।
ইয়ানবু বন্দরের শোধনাগারগুলোতে দিনে ১০ লাখ ব্যারেল তেল প্রক্রিয়াজাত হয়। ড্রোন হামলার হুমকির মুখে যদি কোনোভাবে এ বন্দর সচল রাখা সম্ভব না হয়, তবে আগেই চাপে থাকা বৈশ্বিক তেল শোধন ব্যবস্থার জন্য তা এক ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে।





