হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, ইসরাইলও যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। হামলা বাড়ানোর পরিকল্পনা স্থগিত করার ঘোষণা দিয়ে ট্রাম্প জানান, ইরানের কাছ থেকে তিনি ১০ দফা একটি প্রস্তাব পেয়েছেন, যা তার ভাষায় আলোচনার জন্য ‘কার্যকর ভিত্তি’।
তবে ইরানের এই পরিকল্পনায় কী আছে, আর ট্রাম্প কি তা মেনে নেবেন?
ইরানের ১০ দফা পরিকল্পনায় কী দাবি আছে?
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে হোয়াইট হাউসে পাঠানো ১০ দফা শান্তি পরিকল্পনার শর্তগুলো চূড়ান্ত হলেই কেবল ইরান যুদ্ধের অবসান মেনে নেবে।
ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত তালিকায় এমন কিছু শর্ত রয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্র আগে একাধিকবার প্রত্যাখ্যান করেছে। পরিকল্পনায় বলা হয়েছে—
১. ইরানের ওপর আরোপিত সব প্রাথমিক ও গৌণ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার
২. হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা
৩. মধ্যপ্রাচ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী প্রত্যাহার
৪. ইরান ও তার মিত্রদের ওপর হামলা বন্ধ
৫. জব্দ করা ইরানি সম্পদ মুক্ত করা
৬. যেকোনো সমঝোতাকে বাধ্যতামূলক করতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের একটি প্রস্তাব
ফারসি সংস্করণে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির জন্য ‘সমৃদ্ধিকরণ মেনে নেয়া’ কথাটিও ছিল। তবে কেন, তা পরিষ্কার নয়—ইরানি কূটনীতিকদের সাংবাদিকদের কাছে পাঠানো ইংরেজি সংস্করণে সেই অংশটি ছিল না।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে পরিকল্পনার অর্থ কী?
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, ইরানের সামরিক ব্যবস্থাপনার অধীনেই হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ যাতায়াতের সুযোগ থাকবে। এতে প্রণালিটির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি শিথিল হবে কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট নয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই পরিকল্পনায় ইরান ও ওমানকে প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী প্রতিটি জাহাজের কাছ থেকে সর্বোচ্চ ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত ফি আদায়ের সুযোগ রাখা হয়েছে। পরে ইরান সেই অর্থ পুনর্গঠনের কাজে ব্যবহার করবে।
শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হলে তেহরান আবারও প্রণালি বন্ধ করার চেষ্টা করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র কী ১০ দফা পরিকল্পনা মানবে?
ট্রাম্প প্রশাসন ও ইরানের মধ্যে প্রায় এক বছর ধরে চলা আলোচনায়, তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়ে উভয় পক্ষের বিপরীতমুখী দাবি এবং ছাড় দেয়ার সীমা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার ইরানি দাবি বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। কারণ সংঘাত শুরুর আগে প্রণালিটির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ ছিল না।
ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর ক্রিস মারফি সিএনএনকে বলেন, ‘সত্যি-মিথ্যা যা-ই হোক, যদি এই সমঝোতায় ইরানকে প্রণালির নিয়ন্ত্রণের অধিকার দেয়া হয়, তা হবে বিশ্বব্যাপী বিপর্যয়কর।’
ট্রাম্প নিজে ইরানের দাবিগুলো নিয়ে সরাসরি মন্তব্য করেননি। তবে তিনি বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালিতে যানজট কমাতে সহায়তা করবে।’
বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ইরানের সর্বোচ্চ দাবিগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মেনে নেয়া কঠিন। বরং সেগুলো আলোচনার ভিত্তি হিসেবে কাজ করতে পারে।
ইসরাইল কি চুক্তির অংশ?
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহুর দপ্তর বলেছে, ইরানের বিরুদ্ধে হামলা দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত রাখার যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তকে ইসরাইল সমর্থন করে। তবে এই যুদ্ধবিরতিতে লেবানন অন্তর্ভুক্ত নয়। এর আগে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন,‘ সমঝোতাটি লেবাননসহ সব জায়গায় প্রযোজ্য।’
নেতানিয়াহুর দপ্তর জানিয়েছে, তেহরানকে অবিলম্বে প্রণালি খুলে দিতে হবে এবং যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও অঞ্চলের দেশগুলোর ওপর হামলা বন্ধ করতে হবে। ইসরাইল আরও বলেছে, ইরান যাতে আর পারমাণবিক, ক্ষেপণাস্ত্র বা ‘সন্ত্রাসী’ হুমকি না থাকে, সেজন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টাকে তারা সমর্থন করে।
লেবাননে ইসরাইলি অভিযানে অন্তত ১ হাজার ৫০০ জন নিহত এবং ১২ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। হিজবুল্লাহ তেহরানের প্রতি সংহতি জানিয়ে ইসরাইলের ওপর রকেট ছোড়ার পর লেবাননও যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।
এরপর কী হবে?
শান্তি আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এক্সে এক পোস্টে বলেছেন, তিনি শুক্রবার ইসলামাবাদে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের বৈঠকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
তেহরান বলেছে, তারা আলোচনায় অংশ নেবে। হোয়াইট হাউস বলেছে, ইরানের সঙ্গে সরাসরি বৈঠকের বিষয়টি তারা বিবেচনা করছে, তবে এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
ট্রাম্পের সময়সীমা স্থগিতের আগে কী ঘটেছিল?
গতকাল (মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল) রাতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ট্রাম্পকে সময়সীমা আরও দুই সপ্তাহ বাড়িয়ে কূটনীতিকে এগিয়ে নিতে সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। এক্সে দেয়া পোস্টে শেহবাজ, যার দেশ আলোচনায় নেতৃত্ব দিচ্ছে, ইরানকেও দুই সপ্তাহের জন্য হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে অনুরোধ করেন।
চীনের সঙ্গে ইরানের বাণিজ্যিক সম্পর্ক সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ। আলোচনার মধ্যে চীনও ইরানকে যুদ্ধবিরতির পথ খুঁজে নিতে উৎসাহ দিয়েছে বলে এপির সঙ্গে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলা দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন। ট্রাম্প গতকাল (মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল) এএফপিকে বলেন, ‘চীন ইরানকে আলোচনার টেবিলে আনতে সহায়তা করেছে।’
যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচার শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। এতে রিপাবলিকান দল কংগ্রেসে তাদের ক্ষীণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছে। জরিপে দেখা যাচ্ছে, বেশির ভাগ মার্কিনী যুদ্ধের বিরোধী এবং জ্বালানির দাম বাড়ায় ক্ষুব্ধ।





