‘গ্রেটার ইসরাইল’ পরিকল্পনার নীলনকশা: কতটা বাস্তব এ ধারণা?

বৃহত্তর ইসরাইল পরিকল্পনা
বিদেশে এখন
6

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উদ্বেগের ঝড় তুলেছে। তারা প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছেন ‘বৃহত্তর ইসরাইল’ (Greater Israel) বা ‘গ্রেটার ইসরাইল’র ধারণাকে— যে পরিকল্পনার কথা এত দিন চাপা স্বরে বলা হতো; এখন তা উচ্চারিত হচ্ছে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে।

এই ‘বৃহত্তর ইসরাইল’ আসলে কী? কতটা জনপ্রিয় এই ধারণা ইসরাইলে? আর মাটিতে কী ঘটছে?

যেভাবে শুরু হলো বিতর্ক

গত সপ্তাহে মার্কিন রক্ষণশীল পডকাস্টার টাকার কার্লসনের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে ইসরাইলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি ‘বৃহত্তর ইসরাইলের’ পক্ষে অবস্থান নেন। কার্লসন বারবার জানতে চান, মিসরের নীল নদ (Nile River) থেকে ইরাকের ইউফ্রেটিস নদী (Euphrates River) পর্যন্ত পুরো ভূখণ্ড ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণে আসুক— এটি কি হাকাবি সমর্থন করেন?

খ্রিষ্টান জায়নবাদী হাকাবি উত্তরে বলেন, ‘বাইবেলে এই ভূমি ইসরাইলকে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘তারা পুরোটা নিয়ে নিলেও আমার কোনো আপত্তি নেই।’ এই বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। কারণ এই ‘প্রতিশ্রুত ভূমির’ (Promised Land) মধ্যে পড়ে মিসর, ইরাক, জর্ডান, লেবানন, সৌদি আরব ও সিরিয়ার পুরো বা আংশিক অঞ্চল।

এরপর সোমবার ইসরাইলের বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ায়ের লাপিদও একই সুরে কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘জায়নবাদের ভিত্তি বাইবেল। ইসরাইল ভূমির ওপর আমাদের অধিকার বাইবেলে লেখা আছে। তাই সীমানাও হবে বাইবেলের সীমানা।’

‘বৃহত্তর ইসরাইল’ আসলে কী?

‘বৃহত্তর ইসরাইল’র সবচেয়ে চরম দাবি বাইবেলের একটি শ্লোকের (জেনেসিস ১৫:১৮-২১) ওপর ভিত্তি করে তৈরি। সেখানে বলা হয়েছে, ঈশ্বর ইব্রাহিমের (আব্রাহাম) সঙ্গে এক চুক্তি করে তার বংশধরদের জন্য নীল নদ থেকে ইউফ্রেটিস পর্যন্ত ভূমি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

ইহুদিরা নিজেদের ইব্রাহিমের পুত্র ইসহাকের বংশধর মনে করে। তবে আরবরাও ইব্রাহিমের আরেক পুত্র ইসমাইলের বংশধর হিসেবে একই দাবি রাখতে পারে। বাইবেলের অন্যান্য শ্লোকের ভিত্তিতে কিছু সংকীর্ণ সংজ্ঞাও আছে, যেখানে শুধু ইসহাকের বংশধরদের জন্য নির্দিষ্ট ভূমির কথা বলা হয়েছে।

ইসরাইলে কতটা জনপ্রিয় এই ধারণা?

এই প্রশ্নের উত্তর দুই ভাগে দেখতে হবে। প্রথমত, আশপাশের অঞ্চলে সম্প্রসারণ: ইসরাইলি ইহুদিদের বড় অংশ পূর্ব জেরুজালেম ও গোলান মালভূমি সংযুক্তির পক্ষে। পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি স্থাপনকেও (Settlement) মূলধারার রাজনীতিবিদেরা সমর্থন করেন। গাজায় বসতি স্থাপন তুলনামূলক কম জনপ্রিয় হলেও চরম ডানপন্থি দলগুলো এর পক্ষে।

দ্বিতীয়ত, নীল থেকে ইউফ্রেটিস: এই চরম দাবি এক সময় শুধু প্রান্তিক গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলো। ১৯৪৮-এর আগে অনেক জায়নবাদী ফিলিস্তিনের পাশাপাশি জর্ডানও চাইতেন। জায়নবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠী ইরগুনের প্রতীকে ফিলিস্তিন ও জর্ডান দুটোই ছিল।

ইসরাইল প্রতিষ্ঠার পর এই দাবি পেছনে চলে যায়। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলেছে। একসময়ের ‘প্রান্তিক’ চরম ডানপন্থি নেতারা— যেমন বেজালেল স্মোট্রিচ ও ইতামার বেন-গভির এখন সরকারে। এটি ইসরাইলি সমাজের ভেতরে বিস্তৃত উগ্রতারই প্রতিফলন। ফলে প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু বা মধ্যপন্থী লাপিদের মতো ‘মূলধারার’ নেতারাও হয় এই ধারণার প্রতি সমর্থন দিচ্ছেন, নয়তো প্রকাশ্যে বিরোধিতা করছেন না।

মাটিতে কী ঘটছে?

‘বৃহত্তর ইসরাইল’ শুধু কথার ফুলঝুরি নয়। মাঠে এর বাস্তবায়ন চলছে।

লেবাননে: এই সপ্তাহে ইসরাইলের অর্থমন্ত্রী স্মোট্রিচ প্রকাশ্যে বলেছেন, ‘ইসরাইলের উত্তর সীমানা হতে হবে লিতানি নদী (Litani River)।’ অর্থাৎ দক্ষিণ লেবাননের পুরো অঞ্চল দখল ও সংযুক্তির ডাক দিয়েছেন তিনি। ইসরাইলি বাহিনী এখন শুধু হিজবুল্লাহর ঘাঁটিতে হামলা করছে না। পুরো গ্রামের পর গ্রাম গুঁড়িয়ে দেয়া হচ্ছে, লিতানি নদীর ওপরের সেতু ধ্বংস করা হচ্ছে, দক্ষিণ লেবাননকে বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে। এরইমধ্যে ১০ লাখের বেশি লেবাননি বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

গাজায়: ইসরাইলি কর্মকর্তা ও আইনপ্রণেতারা বারবার গাজায় ইসরাইলি বসতি স্থাপনের ডাক দিয়েছেন। রাফাহ, বেইত হানুনের মতো শহর এরইমধ্যে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

পশ্চিম তীরে: বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা, গণউচ্ছেদ ও সামরিক অভিযান তীব্র হয়েছে। পুরো ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীকে তাদের জমি থেকে সরিয়ে দেয়া হচ্ছে— প্রায়ই ইসরাইলি সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ সহায়তায়।

সিরিয়ায়: এই সপ্তাহেই ইসরাইলি বাহিনী সিরিয়ার কুনেইত্রা শহরে প্রবেশ করে, রাস্তায় ব্যারিকেড বসায় এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের গ্রেপ্তার করে, যেন সেখানে তাদের আইনি কর্তৃত্ব আছে।

আঞ্চলিক দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া

হাকাবির বক্তব্যের পর সৌদি আরব, মিসর, তুরস্কসহ এক ডজনেরও বেশি দেশ কঠোর নিন্দা জানিয়েছে। ২০২৩ সালে স্মোট্রিচ যখন জর্ডানকে ইসরাইলের অংশ দেখানো মানচিত্রের সামনে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দেন, জর্ডান তখনো তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিল। আরব ও মুসলিম দেশগুলোর ক্ষোভের কারণ শুধু সার্বভৌমত্বের অসম্মান নয়। তাদের আশঙ্কা, আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য এমন একটি ইসরাইলের দিকে ঝুঁকে পড়ছে, যে ক্রমাগত আক্রমণাত্মক হচ্ছে এবং শান্তিতে যার কোনো আগ্রহ নেই।

‘প্রান্তিক’ থেকে ‘মূলধারায়’

‘বৃহত্তর ইসরাইল’ একসময় ছিল চরম ডানপন্থিদের গোপন স্বপ্ন। এখন তা ইসরাইল সরকারের নীতিতে পরিণত হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ সমর্থনে। ট্রাম্প প্রশাসন এসব পদক্ষেপকে ‘প্রতিরক্ষামূলক জোট’ বলে চালিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন। যুদ্ধ বাড়ছে, গণউচ্ছেদ বাড়ছে, একের পর এক দেশের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন হচ্ছে।

শেষ কথা

বিপদ এখন আর সম্ভাবনায় নয়, বাস্তবে। লিতানি নদী যদি ইসরাইলের নতুন উত্তর সীমানা হয়, তাহলে এটি শেষ হবে না। ইতিহাস বলে, মানচিত্র একবার বদলাতে শুরু করলে সহজে থামে না। প্রশ্ন এখন আর এই নয় যে, এই পরিকল্পনা আছে কি না। প্রশ্ন হলো, এটি কি চ্যালেঞ্জ ছাড়াই এগিয়ে যেতে দেয়া হবে?

এসআর