নীতিনির্ধারকদের বড় দুশ্চিন্তার জায়গা এখন চুক্তি সইয়ের সম্ভাবনা নিয়ে নয়, বরং ওয়াশিংটন বা তেহরানের কোনো ভুল পদক্ষেপে ফের সংঘাত বেধে যাওয়ার আগে এ উত্তেজনা কত দিন চলবে, তা নিয়ে। সম্প্রতি বার্তা সংস্থা রয়টার্স প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
ইরানে নতুন করে হামলার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলে দাবি জোরালো হচ্ছে। কিছু কর্মকর্তার দাবি, চাপ বাড়ালে তেহরান দুর্বল হবে এবং আলোচনার টেবিলে ফিরতে বাধ্য হবে। ইসরাইলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ গবেষক ও ইসরাইলি প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার ইরান শাখার সাবেক প্রধান ড্যানি সিট্রিনোভিচ বলেন, ‘এ তত্ত্বের একটি বড় সমস্যা হলো, আমরা এরইমধ্যে একাধিকবার এটি প্রয়োগ করে দেখেছি, কিন্তু ইরান আত্মসমর্পণ করেনি।’
এক আঞ্চলিক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা একটি স্নায়ুযুদ্ধের মধ্যে রয়েছি, যেখানে দিন দিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের নতুন হামলার শঙ্কা বাড়ছে।’ রয়টার্সকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ইরানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, পারমাণবিক সক্ষমতা বা হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ কোনো সাধারণ নীতিগত বিষয় নয়; বরং এগুলো ইসলামি প্রজাতন্ত্রটির টিকে থাকার আদর্শিক ভিত্তি। এগুলোর ক্ষেত্রে ছাড় দেয়া মানে কোনো আপস নয়, বরং আত্মসমর্পণ।
সিট্রিনোভিচ জানান, ঠিক এ কারণেই দীর্ঘস্থায়ী সামরিক সংঘাতও তেহরানকে তাদের নিজস্ব অবস্থান থেকে সরাতে পারেনি। এমনকি উত্তেজনা আরও বাড়ালেও তা সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় কয়েক দফা পরোক্ষ আলোচনা হলেও কোনো সমাধান আসেনি। দুই পক্ষের মধ্যে দূরত্ব এখনো যোজন যোজন।
যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরান ২০ বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ রাখুক এবং তাদের মজুত যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়ে দিক। অন্যদিকে ইরানের দাবি, হামলা বন্ধ, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ এবং হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি। তবে ওয়াশিংটন এসব শর্ত প্রত্যাখ্যান করেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘সময় ফুরিয়ে আসছে।’ দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে তাদের ‘কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ট্রাম্প হুমকি দিয়ে বলেন, ‘তেহরান ওয়াশিংটনের সঙ্গে চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে তাদের ‘‘ভয়ানক দুঃসময়’’ পার করতে হবে।’
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষক আলী বায়েজ বলেন, ‘চুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় কঠিন ছাড় দিতে কোনো পক্ষই সদিচ্ছা দেখায়নি।’ তিনি বলেন, ‘উভয় পক্ষই মনে করে, সময় তাদের পক্ষে আছে এবং তারাই সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। আর এই ধারণাই চুক্তিকে অসম্ভব করে তুলেছে।’ এর ফল হলো বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ ঘিরে একটি টিকে থাকার লড়াই। যুদ্ধের আগে বিশ্বব্যাপী তেল বাণিজ্যের প্রায় ২৫ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো। এখন এটি প্রায় বন্ধ থাকায় অর্থনৈতিক বিপর্যয় বাড়ছে এবং সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনায় অংশ নেয়া মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সাবেক কর্মকর্তা অ্যালান আইয়ার মনে করেন, এই দুই পক্ষ কখনোই চুক্তিতে পৌঁছাতে পারবে না। তিনি বলেন, ‘ট্রাম্প শুধু জিততে চান না, তিনি ইরানকে অপমান করতে চান এবং ইরানকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছেন, এমনটি দেখাতে চান।’ অন্যদিকে তেহরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণকে টিকে থাকার মূল কৌশলগত সম্পদ হিসেবে দেখে। এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা বলেন, ‘ইরান তাই নিজেদের স্বার্থ নিশ্চিত করতে এই সম্পদ ব্যবহারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আমরা যুদ্ধ করবো, মারা যাবো, কিন্তু অপমান মেনে নেবো না। আত্মসমর্পণ মূলত ইরানের পরিচয়ের সঙ্গে বেমানান।’
আরও পড়ুন:
দ্বিতীয় আরেক ইরানি কর্মকর্তার দাবি, ওয়াশিংটনের কাছে মাথা নত না করে তেহরান এরইমধ্যে জয়ী হয়েছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলা ইরানের মনোবল ভাঙতে পারেনি, বরং এটি তাদের এই বিশ্বাসকে আরও সুদৃঢ় করেছে যে পারমাণবিক মজুত এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণই তাদের মূল রক্ষাকবচ। এগুলো ছেড়ে দেয়া মানে সেই ভারসাম্য নষ্ট করা। ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘ট্রাম্প বিজয় ঘোষণা করতে চান, কিন্তু ইরান তাকে সেই সুযোগ দেবে না। বিশ্ব অর্থনীতি কি এই চাপ সহ্য করতে পারবে? ট্রাম্পের কাছে বিশ্বের এই প্রশ্নের উত্তর পাওনা রয়েছে।’
তিনি আরও জানান, নতুন করে হামলা ইরানের হিসাব-নিকাশ পাল্টাতে পারবে না, উল্টো উত্তেজনা আরও বাড়াবে। ওয়াশিংটনের আপস ছাড়া ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ছাড়বে না বা কোনো আল্টিমেটাম মানবে না। তবে এই অনড় অবস্থানের পেছনে ভিন্ন এক বাস্তবতার কথাও জানিয়েছেন ইরানের নীতিনির্ধারকদের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো। মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব বৃদ্ধি এবং মূল শিল্প খাতগুলোতে হামলার কারণে আগে থেকেই বিপর্যস্ত অর্থনীতিতে নতুন করে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। এমন অবস্থায় তেহরান দীর্ঘমেয়াদে ‘যুদ্ধও নেই, শান্তিও নেই’—এমন কোনো পরিস্থিতির মধ্যে থাকতে চায় না।
সূত্রগুলো বলছে, এর বদলে ইরান যুদ্ধ বন্ধে একটি প্রাথমিক চুক্তিতে পৌঁছাতে চাইছে। তারা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও পারমাণবিক সীমাবদ্ধতার মতো কঠিন বিষয়গুলো মোকাবিলার আগে মার্কিন অবরোধ তুলে নেয়ার বিনিময়ে নিজেদের তত্ত্বাবধানে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দিতে চায়। তবে যুক্তরাষ্ট্র বলছে, যুদ্ধ বন্ধের বিষয়টি পরবর্তী আলোচনার জন্য স্থগিত রাখতে হবে। পারমাণবিক ইস্যুতে ইরানি সূত্রগুলো জানায়, তেহরান তাদের ৪৪০ কেজি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত কমাতে বা এর একটি অংশ বিদেশে (বিশেষত রাশিয়ায়) পাঠাতে পারে, যাতে ওয়াশিংটন কোনো চুক্তি লঙ্ঘন করলে তা ফেরত পাওয়া যায়। তবে ওয়াশিংটন এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।
সূত্রগুলো আরও জানায়, ওয়াশিংটনের ২০ বছরের দাবির চেয়ে কম সময়ের জন্য সমৃদ্ধকরণ বন্ধ রাখা এবং জব্দ হওয়া তিন হাজার কোটি (৩০ বিলিয়ন) ডলারের তহবিলে পূর্ণাঙ্গ প্রবেশাধিকার চাইছে ইরান। কিন্তু ওয়াশিংটন একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার আওতায় এর মাত্র এক-চতুর্থাংশ ছাড়তে রাজি হয়েছে। যুদ্ধের আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে হরমুজ প্রণালিতে নতুন একটি নিয়ন্ত্রণকাঠামো চাইছে তেহরান। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বিনাশর্তে (বিনা টোল, বিনা ভেটোতে) প্রণালিটি খুলে দেয়ার দাবিতে অনড়। এই দূরত্ব ঘোচানো পারমাণবিক ইস্যুর চেয়েও কঠিন হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক কর্মকর্তা ও মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক মধ্যস্থতাকারী অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন, ‘ওয়াশিংটনের সাফল্য বা ব্যর্থতার মূল মাপকাঠি হবে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ। এর সমাপ্তি ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি কেমন হবে, তা নির্ধারণ করতে পারে।’
মিলার আরও বলেন, ‘রাজনৈতিক মীমাংসা ছাড়া এই জলপথ পুনরায় চালু করার জন্য ‘ইরানি ভূখণ্ডে মার্কিন স্থলবাহিনীর দীর্ঘস্থায়ী দখলদারির’ প্রয়োজন হবে। আলী বায়েজও মনে করেন, একটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল উপায় ছাড়া হরমুজ সংকটের কোনো সামরিক সমাধান নেই এবং ট্রাম্প হয়তো সেই পথে হাঁটতে চাইবেন না। এর মানে, কেবল আলোচনাই এখন একমাত্র কার্যকর পথ।
সিট্রিনোভিচ বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলি জোটের সামরিক অভিযানের কিছু কাঠামোগত সাফল্য থাকলেও এসব হামলা কৌশলগতভাবে কোনো চূড়ান্ত ধাক্কা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা ইরানের শাসকগোষ্ঠীকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারিনি, বরং তারা এখন আরও কট্টর হয়ে উঠেছে। আমরা তাদের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা শেষ করতে পারিনি। আর তাদের কাছে এখনো ইউরেনিয়াম রয়ে গেছে।’
সিট্রিনোভিচের মতে, চাপ প্রয়োগের মাত্রাকে বেশি মূল্যায়ন করা এবং তেহরানের ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতাকে খাটো করে দেখাটা বিপজ্জনক। তিনি বলেন, ‘এর ফলে এমন একটি ঝুঁকি তৈরি হয়, যেখানে ওয়াশিংটন হয়তো আবারও সংঘাতের পথে হাঁটবে এই ভেবে যে চাপ দিলেই ইরান আত্মসমর্পণ করবে। কিন্তু অনেক দেরিতে তারা বুঝতে পারবে, তাদের অনুমানের চেয়েও অনেক বেশি আঘাত সহ্য করার প্রস্তুতি এ শাসকগোষ্ঠীর রয়েছে।’





