ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, বাহরাইনের পঞ্চম নৌ ডিস্ট্রিক্টের বন্দর সালমান এবং কুয়েতের আলি আল-সালেম বিমানঘাঁটিতে যৌথ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। এতে বাধা দিতে আসা একটি মার্কিন এমকিউ-৯ ড্রোনও ভূপাতিত করা হয়েছে বলে দাবি করেছে বাহিনীটি। বাহরাইন ও কুয়েতে বিমান হামলার সতর্কতামূলক সাইরেন বাজানো হয়েছে। কুয়েতি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ‘বৈরী’ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা মোকাবিলায় বিমানপ্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কাজ করছে।
এর আগে হরমুজ প্রণালিতে তিনটি ট্যাংকারে হামলার প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানে নতুন করে সামরিক অভিযান চালায় এবং ইরানকে তেল বিক্রির অনুমতি দেয়া লাইসেন্স বাতিল করে। মার্কিন সেন্টকম বা সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, তাদের হামলায় আইআরজিসির ৬০টির বেশি ছোট নৌযান লক্ষ্যবস্তু ছিল। সেন্টকম এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘ইরানি বাহিনীর অযাচিত আগ্রাসন যুদ্ধবিরতির স্পষ্ট ও বিপজ্জনক লঙ্ঘন। এটি নৌ চলাচলের স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ন করে।’
ইরানের শীর্ষ যৌথ সামরিক কমান্ড খাতাম আল-আম্বিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্স মার্কিন হামলাকে ‘নির্লজ্জ আগ্রাসন’ বলে নিন্দা জানিয়ে ‘চূর্ণকারী জবাবের’ হুমকি দিয়েছে। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বলেন, ‘জবরদস্তি ও চাঁদাবাজির যুগ শেষ। আমরা মাথা নত করি না।’
ইরানি গণমাধ্যম জানিয়েছে, দেশটির প্রধান তেল কেন্দ্র খার্গ দ্বীপ, কেশম দ্বীপ এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দর শহর সিরিক ও বন্দর আব্বাসে বেশ কয়েকটি বিস্ফোরণ শোনা গেছে। ইরান তার মোট অপরিশোধিত তেলের ৯০ শতাংশ খার্গ দ্বীপ থেকে রপ্তানি করে। এক মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, তাদের হামলায় ইরানের বিমানপ্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, উপকূলীয় নজরদারি ব্যবস্থা, ভূমি থেকে আকাশে ছোঁড়া ক্ষেপণাস্ত্র, জাহাজ বিধ্বংসী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন উৎক্ষেপণ কেন্দ্রকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। ইরানে কোনো বেসামরিক মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি, তবে সিরিকের একটি বাণিজ্যিক ঘাটে ‘শত্রুপক্ষের ছোঁড়া গোলার’ আঘাতে কয়েকজন আহত হয়েছেন।
হরমুজ প্রণালি থেকে ফিরে গেল ট্যাংকার
জাহাজ ট্র্যাকিংয়ের তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টা থেকে ফিরে গেছে অন্তত চারটি তেল ও গ্যাসবাহী ট্যাংকার। কাতারি একটি এলএনজি ট্যাংকার ও সৌদি পতাকাবাহী একটি অপরিশোধিত তেলের ট্যাংকার মঙ্গলবার প্রণালির কাছে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর সমুদ্র চলাচলের ঝুঁকি ‘গুরুতর’ পর্যায়ে উন্নীত করা হয়েছে।
কেপলার ও এলএসইজির তথ্য অনুযায়ী, কাতার এনার্জির নিয়ন্ত্রণাধীন খালি এলএনজি ট্যাংকার আল ঘারিয়া, দুহাইল ও আল রুওয়াইস মঙ্গলবার রাতে হরমুজ প্রণালির দিকে এগিয়ে গিয়ে হঠাৎ পথ পরিবর্তন করে ফিরে যায়। এছাড়া কুয়েতের ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বহনকারী ভারতীয় পতাকাবাহী একটি ট্যাংকার ওমান উপকূল থেকে ফিরে গেছে।
তেলের দাম বৃদ্ধি
চুক্তির প্রতি বড় আঘাত হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে দেয়া তেল বিক্রির লাইসেন্স প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে। এই ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ৩ শতাংশের বেশি বেড়েছে। মার্কিন-ইরান অন্তর্বর্তী চুক্তির আওতায় ২২ জুন এই সাধারণ লাইসেন্স ইস্যু করা হয়েছিল, যার মেয়াদ ছিল ২১ আগস্ট পর্যন্ত। এখন ইরানকে ১৭ জুলাইয়ের মধ্যে সব লেনদেন সম্পন্ন করতে বলা হয়েছে।
যেকোনো ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারি
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় লাইসেন্স প্রত্যাহারকে যুদ্ধ অবসানের কাঠামো চুক্তি লঙ্ঘন হিসেবে নিন্দা জানিয়েছে এবং এর পরিণতির জন্য ওয়াশিংটনকে দায়ী করেছে। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নিজের স্বার্থ ও জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় ইরান প্রয়োজনীয় যেকোনো ব্যবস্থা নেবে।
জাহাজে হামলার দায় অস্বীকার করলেও কাতার ইরানকে দায়ী করেছে। কাতারের বিশাল এলএনজি ট্যাংকার আল রেকায়াতে ড্রোন হামলার ফলে ইঞ্জিন কক্ষে আগুন ধরে যায়, তবে ক্রুরা নিরাপদ ছিলেন। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কাতারের অভিযোগকে ‘বিভ্রান্তিকর’ বলে অভিহিত করেছে। তবে ইরানের সঙ্গে সমন্বয় না করে চলা বাণিজ্যিক জাহাজগুলো ঝুঁকিতে থাকবে বলে জানিয়েছে তেহরান।
আরেক মার্কিন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী ইরান তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে গুলি চালিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি চুক্তি নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে ইরান তার সুবিধাজনক অবস্থান জাহির করতেই জাহাজগুলোতে হামলার এই কৌশল নিচ্ছে।
পবিত্র নগরী কোমে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজায় বিপুল মানুষের সমাগমের পর যুক্তরাষ্ট্র এই হামলা চালায়। যুদ্ধের প্রথম দিনেই খামেনি তার মেয়ে, নাতনি, জামাতা ও পুত্রবধূসহ নিহত হয়েছিলেন।
স্থায়ী চুক্তির বিষয়ে ৬০ দিনের আলোচনার সুযোগ দিতে যুদ্ধবিরতি করা হয়েছিল। তবে গত সপ্তাহে কাতারে অনুষ্ঠিত পরোক্ষ আলোচনায় কোনো অগ্রগতি হয়নি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার হুমকি দিয়েছেন, ইরান ‘চুক্তি না করলে’ তিনি আবার বোমা হামলা শুরু করবেন। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি সমঝোতা স্মারকের শর্ত অনুযায়ী ‘হুমকি অব্যাহত থাকলে’ চূড়ান্ত চুক্তির আলোচনা শুরু হবে না।





