তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, উপসাগরীয় পরিস্থিতির অবনতি হওয়া এবং বৈশ্বিক হাইড্রোকার্বন সরবরাহ আবারও ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা পুরোপুরি রয়েছে। এখন পর্যন্ত যা দেখা গেছে, তার দীর্ঘমেয়াদি পরিণতিও থাকতে পারে। এ সংকট নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে অগ্রসর হওয়াকে উৎসাহিত করবে, যাতে ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তির বিরুদ্ধে বিমা হিসেবে কাজ করে।
তবে যদি ধরে নেয়া হয়, হরমুজ প্রণালি অন্তত আংশিকভাবে জাহাজ ও তেল ট্যাংকারের জন্য উন্মুক্ত থাকবে, তাহলে যুদ্ধের স্বল্পমেয়াদি প্রভাব ভয়াবহ হয়নি। একটি ঐকমত্য তৈরি হচ্ছে যে, কোভিড-১৯ মহামারি এবং ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের সময়ের সরবরাহ চেইন, জ্বালানি ও খাদ্য সংক্রান্ত বিঘ্নের সম্মিলিত প্রভাবের চেয়ে এ ধাক্কা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হবে।
ইরান সংকট ও কোভিড-ইউক্রেন সংকটের মধ্যকার পার্থক্যের চেয়ে আরও আকর্ষণীয় হচ্ছে, ১৯৭৩ সালে নিজস্ব তেলের ধাক্কা সামলানো সত্তরের দশকের সত্যিকারের মূল্যস্ফীতির যুগের সঙ্গে এসব ঘটনার সাদৃশ্য। এসব সাম্প্রতিক ঘটনা মূল্যবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা নিয়ে স্থায়ী স্ট্যাগফ্লেশনের যুগে ফিরে যাওয়ার ইঙ্গিত এমন ভবিষ্যদ্বাণী এখন পর্যন্ত ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
উদীয়মান বাজারগুলোর মূল্যস্ফীতি পরিমাপ করলে দেখা যায়, ইরান সংক্রান্ত মূল্যবৃদ্ধি কোভিড-ইউক্রেনের বিঘ্নের চেয়ে অনেক কম হয়েছে। মূলত উদীয়মান বাজারগুলো সাধারণত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের সবচেয়ে বেশি ধাক্কা সয়ে থাকে। এমনকি ২০১৬ সালের একটি ঘটনার চেয়েও এটি উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল প্রভাব তৈরি করেছে। ওই সময়ে চীনের ঋণ প্রণোদনা, বৈশ্বিক পণ্য বাজারের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা এবং শক্তিশালী ডলারের রেট সবগুলো সম্মিলিতভাবে প্রভাব রেখেছিল।
বর্তমান পরিস্থিতি এবং কোভিড-১৯ ও ইউক্রেন সংকটের মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যে বেশ কয়েকটি বড় পার্থক্য রয়েছে। এর একটি হচ্ছে বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থা। ২০২১ সাল থেকে কনটেইনার পরিবহনে যে জটিলতা তৈরি হয়েছিল, তা সরবরাহ চেইন ব্যাহত করে দাম বাড়িয়ে দিয়েছিল। বাস্তবে এটি ছিল সরবরাহ বিঘ্নের চেয়ে বেশি চাহিদা-ভিত্তিক ঘটনা। ২০২০ সালের মন্দা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে ভোক্তা টেকসই পণ্যের ক্রয় হু-হু করে বেড়ে যাওয়ার ফল ছিল এটি। কনটেইনার জাহাজগুলো চলমান ছিল এবং বন্দর সক্ষমতা প্রভাবিত হয়নি। এমনকি অনেক সমালোচনার মুখে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলের বন্দরগুলোও রেকর্ড পরিমাণ পণ্য আনা নেয়া চলছিল।
তার বিপরীতে, শুরুর দ্রুত সমন্বয়ের সময়ের পর গত কয়েক মাসে জ্বালানি তেল বহির্ভূত বাণিজ্য মোটামুটি ভালোই চলছে। হরমুজ প্রণালি হচ্ছে বাণিজ্যের একটি বদ্ধ লিম্ফ্যাটিক ক্যাপিলারি, বাণিজ্যের অক্সিজেন বহনকারী প্রধান ধমনী নয়। এটি বন্ধ থাকা কনটেইনার বাণিজ্যকে খুব একটা প্রভাবিত করেনি। এই অঞ্চলের বৃহত্তম ট্রান্সশিপমেন্ট হাব দুবাইয়ের জেবেল আলি বন্দরের ব্যবসা দ্রুত অন্যত্র স্থানান্তরিত হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর প্রথম কয়েক মাস কনটেইনারের রেট শান্ত ছিল। সম্প্রতি সেটি বাড়ার পেছনে কারণ হচ্ছে চাহিদার মৌসুমি ঊর্ধ্বগতি এবং শিপারদের ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন শুল্কের আগে পণ্য পাঠিয়ে দেয়ার তাড়া, সরবরাহ বিঘ্ন নয়।
এছাড়া খাদ্যমূল্যস্ফীতিও এবার অনেক কম হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম দুই বৃহৎ শস্য রপ্তানিকারক দেশকে ব্যাহত করা ইউক্রেন যুদ্ধের বিপরীতে উপসাগরীয় দেশগুলো খাদ্যের নিট আমদানিকারক। এখন পর্যন্ত সার সরবরাহের ব্যাঘাত ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকার শস্য চাষকে প্রভাবিত করেনি। সম্ভবত অস্ট্রেলিয়ার মতো দক্ষিণ গোলার্ধের উৎপাদকরাও এতে ক্ষতিগ্রস্ত হননি।
মজুত ব্যবস্থাপনা ও সার ব্যবস্থাপনা এটি সামলানোর জন্য যথেষ্ট নমনীয় ও দক্ষ প্রমাণিত হয়েছে। প্রণালি বন্ধ থাকার সময়ে সার সরবরাহে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, সেটি বড় ক্ষতি করবে কি না, তা এখনো দেখার বিষয়। তবে রপ্তানি আবার শুরু হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ইউরিয়া ও সার আমদানিকারক ভারত উপসাগরীয় অঞ্চলের ওপর প্রচণ্ড নির্ভরশীল হলেও তারা ভালো আছে বলে মনে হচ্ছে।
নীতিগত প্রতিক্রিয়ার প্রসঙ্গে বলা যায়, ২০২৪ সালে বৈশ্বিক অর্থনীতি একটি সফট ল্যান্ডিং অর্জন করেছে। কোভিড-ইউক্রেন সংকটের সময়ও মূল্যস্তরের বৃদ্ধি সর্বোচ্চ একটি সীমিত মজুরি-মূল্য সর্পিলের সূচনা করেছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো দ্রুত সুদের হার বাড়ালেও ব্যবস্থা থেকে মূল্যস্ফীতি বের করতে মন্দার প্রয়োজন হয়নি। প্রচলিত ময়নাতদন্তগুলো এটিকে দায়ী করে এই বিশ্বাসকে যে, মূল্যস্ফীতি কম থাকবে। সত্তরের দশকের অন্ধকার দিনগুলোর পর থেকে বিশ্বাসযোগ্য আর্থিক নীতির মাধ্যমে প্রত্যাশাকে নোঙর করা কেন্দ্রীয় ব্যাংকারদের প্রজন্মের কাছে এর জন্য অন্তত আংশিকভাবে কৃতজ্ঞ থাকা যায়।
ভবিষ্যতে ধাক্কা আসবে সন্দেহ নেই। যেমন চলতি বছরের শেষে এল নিনো আবহাওয়া ব্যবস্থার ঘটনা। হরমুজ প্রণালিতে বিঘ্নের কথাও শেষবারের মতো শোনা গেছে বলে ধারণা করা যাচ্ছে না। বুধবার ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি শেষ বলে ঘোষণা করেছেন, যদিও তিনি আগেও এমন করেছেন।
তবে শেষ পর্যন্ত একটি যুগ স্ট্যাগফ্লেশন দ্বারা সংজ্ঞায়িত হবে কি না, তা জ্বালানি বা অন্যান্য মূল্যের ধাক্কা দ্বারা নির্ধারিত হয় না। এটি নির্ধারণ করে নীতিনির্ধারক, ভোক্তা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়। এখন পর্যন্ত এমন কিছু দেখা যাচ্ছে না, যা থেকে বলা যায় যে ইরান যুদ্ধ সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতার মৌলিক ছেদ ঘটিয়ে বিশ্বকে সত্তরের দশকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে।





