দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটিতে চলতি বছর ডেঙ্গুতে ৫৬ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আক্রান্ত হয়েছেন ৭৭ হাজারের বেশি মানুষ। এর মধ্যে কেবল জুলাই মাসেই এক-চতুর্থাংশের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন।
মশার মাধ্যমে ছড়ানো ডেঙ্গু জ্বর মূলত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় জলবায়ু অঞ্চলে বেশি দেখা যায়। তবে বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বাড়ার কারণে রোগবাহী এসব মশা এখন ইউরোপ ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলসহ নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালে বিশ্বে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছিল প্রায় ৫ লাখ, যা ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৪৪ লাখে।
ডেঙ্গু কী এবং লক্ষণ
ডেঙ্গু একটি ভাইরাসজনিত জ্বর। এডিস মশার কামড়ের মাধ্যমে এই ভাইরাস মানুষের শরীরে ছড়ায়। বালতি, ফুলদানি ও টবের মতো পাত্রে জমে থাকা পানিতে এই মশা বংশবৃদ্ধি করে। দিনের বেলায় এরা বেশি সক্রিয় থাকে। সাধারণত সূর্যোদয়ের ঠিক পর এবং সূর্যাস্তের সময় এরা বেশি কামড়ায়।
ডেঙ্গু আক্রান্ত অনেকের শরীরে কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। তবে যাদের লক্ষণ প্রকাশ পায়, তাদের সাধারণত প্রচণ্ড জ্বর, মাথাব্যথা, পেশি ও অস্থিসন্ধিতে ব্যথা, বমি বমি ভাব ও শরীরে ফুসকুড়ি দেখা যায়। এগুলো সাধারণত এক বা দুই সপ্তাহের মধ্যে সেরে যায়। তবে মারাত্মক পর্যায়ে গেলে ডেঙ্গু থেকে শরীরে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ বা মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
দ্বিতীয়বার ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে মারাত্মক ঝুঁকির আশঙ্কা বেশি থাকে। শ্রীলঙ্কার ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ ইউনিটের পরিচালক কপিলা কান্নানগারা বলেন, ‘ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি ধরন রয়েছে। একটি থেকে সুস্থ হলে কেবল সেই নির্দিষ্ট ধরনটির বিরুদ্ধেই শরীরে প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়।’
বিবিসি সিনহালাকে তিনি বলেন, ‘অন্য ধরনগুলোর ক্ষেত্রে এই প্রতিরোধক্ষমতা কাজ করে না। তার মানে, ভাইরাসের একটি ধরনে আক্রান্ত কেউ অন্য ধরনে বহনকারী মশার কামড়ে আবারও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হতে পারেন। এর ফলে তার আরও মারাত্মক সংক্রমণ হতে পারে।’
ডেঙ্গুর কোনো সার্বজনীন টিকা নেই। তাই চিকিৎসায় সাধারণত প্যারাসিটামলের মতো ব্যথানাশক ওষুধ দেয়া হয়। মারাত্মক লক্ষণ দেখা দিলে রোগীদের হাসপাতালে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখার প্রয়োজন হয়, কারণ জটিলতাগুলো প্রাণঘাতী হতে পারে।
শ্রীলঙ্কার বর্তমান পরিস্থিতি
শ্রীলঙ্কার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের মতে, গত ডিসেম্বরে দেশটিতে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড়ের কারণেই ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েছে। ঝড়ের কারণে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আবর্জনা মশার নতুন প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
বাড়ি, স্কুল ও নির্মাণাধীন ভবনের ছাদ পর্যবেক্ষণে সামরিক বাহিনীকে ড্রোন ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছে সরকার। পাশাপাশি বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিদর্শনের জন্য পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। চলতি মাসে এখন পর্যন্ত প্রায় ১১ হাজার মশা প্রজননক্ষেত্র পরিষ্কার করা হয়েছে। এসব প্রজননক্ষেত্র রাখায় ৪ হাজারেরও বেশি স্থাপনাকে জরিমানা করা হয়েছে।
সারা দেশেই ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা গেলেও রাজধানী কলম্বোর মতো শহরাঞ্চলে এর প্রভাব বেশি। পরিস্থিতি সামাল দিতে হাসপাতালগুলোতে শয্যা বাড়ানো হয়েছে এবং কাজের সময়সীমাও বাড়ানো হয়েছে। জাতীয় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ ইউনিটের কর্মকর্তা কান্নানগারা রয়টার্সকে বলেন, জনস্বাস্থ্যকর্মীরা ‘নিজেদের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে’ কাজ করছেন।
তিনি বলেন, ‘রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি এবং সংক্রমণের মাত্রাও তীব্র।’ মোট রোগীর প্রায় ৭৫ শতাংশই ডেঙ্গুর অপেক্ষাকৃত বেশি ক্ষতিকর ধরনে আক্রান্ত বলে উল্লেখ করেন তিনি।
হাসপাতালে জায়গার সংকুলান না হওয়ায় মৃদু লক্ষণযুক্ত রোগীদের বাড়িতে বিশ্রাম নেয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা। কর্তৃপক্ষ ডেঙ্গুর টিকা নিয়েও ভাবছে। তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ভাইরাসের চারটি আলাদা ধরনের কারণে এ ধরনের টিকা তৈরি করা বেশ কঠিন হবে।
শ্রীলঙ্কায় ডেঙ্গু মহামারির ঘটনা এটাই প্রথম নয়। ২০১৭ সালে ভারী মৌসুমি বৃষ্টির কারণে দেশটিতে ডেঙ্গুতে ৪৫০ জনের মৃত্যু হয়েছিল।
বিশ্বজুড়ে ডেঙ্গু বাড়ার কারণ
বিশ্বের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ও উপ-গ্রীষ্মমণ্ডলীয় জলবায়ু অঞ্চলে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে বেশি। উষ্ণ তাপমাত্রা ও উচ্চ আর্দ্রতার কারণে এসব অঞ্চলে এডিস মশা দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, লাতিন আমেরিকা এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলে ডেঙ্গুর সবচেয়ে বেশি প্রকোপ দেখা যায়।
তবে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে রোগবাহী এই মশা এখন ইউরোপ ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের মতো নতুন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ছে। এছাড়া গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে আগের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত ও দীর্ঘস্থায়ী বর্ষাকালের কারণে মশা বংশবৃদ্ধির জন্য বেশি সময় পাচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, গত ৫০ বছরে ডেঙ্গুর প্রকোপ ৩০ গুণ বেড়েছে। সংস্থাটি বৈশ্বিক স্বাস্থ্যের শীর্ষ ১০টি হুমকির তালিকায় ডেঙ্গুকে রেখেছে। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক মানুষ ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে রয়েছে।
টবের প্লেট খালি করা, অব্যবহৃত বালতি উল্টে রাখা এবং জমাট বাঁধা মাটি ভেঙে দেয়ার মাধ্যমে জমে থাকা পানি অপসারণ করা গেলে ডেঙ্গু সংক্রমণের চক্র ভাঙা সম্ভব।
ডেঙ্গুর মতো মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণে কিছু দেশের সরকার ‘ওলবাকিয়া’ (Wolbachia) ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করছে। প্রাকৃতিকভাবেই প্রায় অর্ধেক পতঙ্গের শরীরে এই ব্যাকটেরিয়া পাওয়া যায়। এই ব্যাকটেরিয়া মশাকে মেরে ফেলে না, বরং তাদের মাধ্যমে ভাইরাস ছড়ানোর প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে।





