ইরান ও ইউক্রেন সংঘাত: হোয়াইট হাউসে একই দিনে নেতানিয়াহু-জেলেনস্কি

বিদেশে এখন
0

ইরান ও ইউক্রেনের যুদ্ধ যখন এক জটিল সন্ধিক্ষণে, তখন মঙ্গলবার একই দিনে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে আতিথেয়তা দিচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে ট্রাম্পের সঙ্গে এই দুই নেতার সম্পর্কের বাস্তবতা এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন। রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

রাশিয়ার অগ্রযাত্রা ঠেকিয়ে দেয়ার পর জেলেনস্কির সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ক উষ্ণ হয়েছে। অন্যদিকে, ইরান সংঘাতের বৃহত্তর সমাধানে অগ্রগতি না হওয়ায় হোয়াইট হাউসের হতাশা বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের গভীর সম্পৃক্ততার বিরোধিতাকারী ট্রাম্পের কিছু সমর্থকের সমালোচনার মধ্যেই ওয়াশিংটনে এসেছেন নেতানিয়াহু।

মূলত সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের স্মরণসভায় যোগ দিতে ওয়াশিংটনে এসেছেন এই দুই নেতা। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত ছিলেন কট্টর রিপাবলিকান এই নেতা। তিনি প্রায়ই ইউক্রেনের যুদ্ধে ট্রাম্পকে আরও বেশি সহায়তা দেয়ার জন্য প্ররোচিত করার চেষ্টা করতেন।

ওয়াশিংটনে পৌঁছে জেলেনস্কি জানান, ট্রাম্প ও তার দলের সঙ্গে বৈঠকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত সহযোগিতাকেই তিনি ‘এক নম্বর অগ্রাধিকার’ হিসেবে দেখছেন। এক্সে (সাবেক টুইটার) দেয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘শান্তিকে আরও কাছে নিয়ে আসতে হবে।’

ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ক্রমেই ছড়িয়ে পড়া মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত—উভয়ই এখন সন্ধিক্ষণে পৌঁছেছে। ইরান যুদ্ধে যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর ট্রাম্প জানিয়েছেন, কূটনীতিকে আরেকটি সুযোগ দিতেই তিনি মার্কিন বিমান হামলা স্থগিত করেছেন। অন্যদিকে, সাম্প্রতিক সাফল্যে জেলেনস্কিও কিছুটা চাঙা। তবে বাস্তবতা হলো, দুটি সংঘাতের কোনোটিরই সমাপ্তি এখনো দৃশ্যমান নয়।

পুনর্নির্বাচনের জন্য ট্রাম্পের সমর্থন চান নেতানিয়াহু

ট্রাম্পের সঙ্গে নেতানিয়াহুর সম্পর্ক বরাবরই ওঠানামা করেছে। ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের দুর্বল করতে গিয়ে লেবাননের লক্ষ্যবস্তুতে হামলার জন্য নেতানিয়াহুকে অনেক সময়ই লাগাম টেনে ধরতে হয়েছে ট্রাম্পকে। গত জুনে দুই নেতার মধ্যে একটি বিতর্কিত ফোনালাপের ঘটনাও গণমাধ্যমে ফাঁস হয়। ওই আলাপে ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করেছিলেন বলে জানা যায়, যা পরে ট্রাম্প নিজেই স্বীকার করেন। এই ঘটনা দুই নেতার সম্পর্কে সৃষ্ট টানাপোড়েনকে সামনে নিয়ে আসে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আগামী ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনের আগে নিজের পুনর্নির্বাচনী প্রচারণার জন্য ট্রাম্পের সমর্থন আদায় করাই এখন নেতানিয়াহুর মূল লক্ষ্য। জনমত জরিপে পিছিয়ে থাকা নেতানিয়াহুর জন্য দেশে বেশ কঠিন সময় যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের সঙ্গে একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ বৈঠক তার জন্য রাজনৈতিকভাবে বড় সহায়ক হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

ওয়াশিংটন যাত্রার আগে দেয়া এক ভিডিও বার্তায় নেতানিয়াহু বলেন, ‘এই জটিল সময়ে চরম দৃঢ়তা ও প্রজ্ঞার সঙ্গে কাজ করতে হবে। আলোচ্যসূচিতে থাকা সব ইস্যু নিয়ে আমরা আলোচনা করব, তবে প্রাধান্য পাবে ইরান। আমাদের লক্ষ্য নিরাপত্তা রক্ষা এবং একই সঙ্গে চারপাশে শান্তির পরিধি বিস্তৃত করা।’

হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ট্রাম্প এই বৈঠকে ইরান সংঘাতসহ ইসরাইল ও লেবাননের মধ্যকার উত্তেজনা নিয়ে আলোচনা করবেন। গত সপ্তাহেই লেবাননের প্রেসিডেন্টকে আতিথেয়তা দিয়েছিলেন ট্রাম্প। ওই কর্মকর্তা আরও জানান, ইসরাইলের সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, মরক্কো এবং সুদানের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় হওয়া ‘আব্রাহাম চুক্তি’ নিয়েও আলোচনা হবে।

‘বিবি দুর্দান্ত’: ট্রাম্প

আব্রাহাম চুক্তিতে সৌদি আরবকেও যুক্ত করতে চান ট্রাম্প। গত সপ্তাহে সৌদি আরবের সঙ্গে একটি বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তির শর্ত হিসেবে রিয়াদকে এই চুক্তিতে সই করার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। তবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নিশ্চয়তা ছাড়া এই চুক্তিতে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে রিয়াদ।

সোমবার মিশিগানে যাওয়ার পথে এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘বিবি দুর্দান্ত।’ ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর ডাকনাম উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘তিনি একজন যুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। আমরা একসঙ্গে খুব ভালো কাজ করেছি।’

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুর দিকে জেলেনস্কির সঙ্গে তার বেশ কয়েকবার বাদানুবাদ হলেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সম্পর্কের উন্নতি হয়েছে। রাশিয়ার তেল শিল্পে হামলা বাড়ানোসহ যুদ্ধে সাফল্য পাওয়ায় এই সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে। জেলেনস্কি হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে একটি সংক্ষিপ্ত ব্যক্তিগত বৈঠক করবেন, যেখানে সাংবাদিকরা সম্ভবত উপস্থিত থাকবেন না।

এক ইউক্রেনীয় সূত্র জানিয়েছে, প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ইন্টারসেপ্টর পাওয়াই তাদের এখন প্রধান অগ্রাধিকার। ওই সূত্রটি বলেছে, ‘আমরা প্রতিদিন হামলার মুখে পড়ছি। তাই মানুষের জীবন বাঁচাতে প্যাট্রিয়টের জন্য ক্ষেপণাস্ত্র কেনার অনুমতি পেতে ট্রাম্প ও তার দলের সবুজ সংকেত দরকার। এটাই এখন সবচেয়ে জরুরি।’ জেলেনস্কি ট্রাম্পের কাছে জরুরি ভিত্তিতে আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি ড্রোন চুক্তি চূড়ান্ত করার বিষয়ে চাপ দেবেন। ন্যাটো সম্মেলনে ট্রাম্পের দেয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, ইউক্রেনে প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর তৈরির লাইসেন্স নিয়েও দুই নেতা আলোচনা করতে পারেন।

হোয়াইট হাউসের ওই কর্মকর্তা জানান, ‘প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠকে ট্রাম্প রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে চলমান শান্তি প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করবেন। এই যুদ্ধ শেষ করার সময় এসেছে।’ হোয়াইট হাউসের বৈঠক শেষে জেলেনস্কি ইউএস ক্যাপিটলে গিয়ে ১০০ জন সিনেটরের সঙ্গেও বৈঠক করবেন বলে কথা রয়েছে।

জেলেনস্কির এই সফরের প্রাক্কালে পেন্টাগন থেকে মার্কিন কংগ্রেসের আইনপ্রণেতাদের কাছে পাঠানো এক চিঠি সামনে এসেছে। ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, ইউক্রেনের জন্য অনুমোদিত ৪০ কোটি ডলারের সহায়তা ২০২৯ অর্থবছরের আগে খরচ শেষ হবে না। অথচ রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিহত করার জন্য প্রয়োজনীয় অস্ত্রের সংকটে পড়েছে কিয়েভ। ডেমোক্র্যাটসহ ট্রাম্পের নিজ দলের কিছু রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা কিয়েভের জন্য বরাদ্দ সহায়তা আটকে রাখার জন্য পেন্টাগনের সমালোচনা করেছেন।

এএম