বার্নহাম জাতীয় রাজনীতিতে ফেরার আগে গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেয়ার পরপরই তিনি নেয়া প্রথম পদক্ষেপগুলোর একটি হিসেবে ম্যানচেস্টারে সরকারের এই শাখা অফিস চালু করেছেন। এই অফিস তার দেয়া প্রতিশ্রুতির প্রতীক ও চালিকাশক্তি—স্থানীয় নেতাদের হাতে আরও ক্ষমতা তুলে দেয়া এবং সারা দেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছড়িয়ে দেয়া।
বার্নহাম এই অফিসকে অভিহিত করছেন ‘একটি উত্তর মেরু’ হিসেবে, যা ‘দক্ষিণ মেরু’ ওয়েস্টমিনস্টারের রাজনীতির ভারসাম্য রক্ষা করবে। তবে সমালোচকেরা একে ‘একটি চটকদার কৌশল’ বলছেন।
বিষয়টি নিঃসন্দেহে নতুন। অতীতে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীরা সপ্তাহান্তে নিজেদের নির্বাচনি এলাকায় বা প্রধানমন্ত্রীর গ্রামীণ অবকাশ কেন্দ্র ‘চেকার্স’-এ কাটালেও কেউই লন্ডনের বাইরে এত বড় পরিসরে অফিস খোলেননি। বার্নহাম পূর্ণকালীন সহকারী, বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে অন্তত সপ্তাহে এক দিন এখানে কাজ করার পরিকল্পনা করেছেন।
শুক্রবার বার্নহাম বলেন, ‘এটি শুধু আরেকটি অফিস নয়, বরং প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ নিয়ে দেশের ভাবনার মৌলিক পরিবর্তন।’ সাবেক লেবার নেতা ও প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের পরিণতি এড়াতেই বার্নহাম ম্যানচেস্টারকে প্রধান অস্ত্র মনে করছেন। বিভিন্ন ভুল সিদ্ধান্ত, নীতিগত অবস্থান বদল ও ব্রিটেনের ঝিমিয়ে পড়া অর্থনীতিকে চাঙা করতে না পারায় দুই বছরের মাথায় জুলাইয়ে পদত্যাগ করেন স্টারমার।
ম্যানচেস্টারের মেয়র হিসেবে ৯ বছরের দায়িত্বকালে বার্নহাম কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে গর্বিত ও ঐতিহ্যবাহী এই উত্তরের শহরের পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য প্রশংসা কুড়িয়েছেন। শহরটি একসময় শিল্পবিপ্লবের সূতিকাগার এবং সামাজিক পরিবর্তনের আন্দোলন ও এক প্রাণবন্ত সংগীত অঙ্গনের জন্য পরিচিত ছিল। ম্যানচেস্টারের পক্ষে জোরালো অবস্থানের কারণে ও রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার জেরে বার্নহাম অর্জন করেন ‘কিং অব দ্য নর্থ’ উপাধি।
বার্নহাম ‘ম্যানচেস্টারিজম’ নামে পরিচিত একটি ধারার প্রবক্তা। এটি এক ধরনের ব্যবসাবান্ধব সমাজতন্ত্র, যেখানে বড় প্রকল্পে বেসরকারি বিনিয়োগ কাজে লাগানো এবং আবাসন, পরিবহন, প্রশিক্ষণ ও জনসেবার ওপর সম্প্রদায়ের নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে সরকারকে বিকেন্দ্রীকরণ করা হয়। তার মেয়র থাকাকালীন সময়ে ম্যানচেস্টার শহরের কেন্দ্র বেশ ঝলমলে হয়ে ওঠে। খালি জমিতে গড়ে ওঠে আকাশছোঁয়া ভবন, সেবা খাত বিস্তৃত হয়, হাজারো কফি শপ চালু হয় এবং শহরজুড়ে চালু হয় হলুদ রঙের বাস ও ট্রামের নিজস্ব নেটওয়ার্ক।
এখন এই মডেল সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে চান বার্নহাম। নাম্বার টেন নর্থকে তিনি বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প, চাকরিহারা মানুষ এবং তরুণদের অভিবাসনজনিত সংকটে থাকা এলাকাগুলোতে সম্পদ ও অর্থনৈতিক সুযোগ পুনর্বণ্টনের চালিকাশক্তি হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছেন।
প্রথম ধাপে শুক্রবার বার্নহাম ঘোষণা দেন, বিভিন্ন এলাকার মেয়ররা এখন থেকে সেখানকার আয় ও ব্যবসাবাণিজ্যের কর রাজস্বের বড় অংশ নিজেদের কাছে রাখতে পারবেন। এটিকে তিনি ‘এক প্রজন্মে ওয়েস্টমিনস্টার থেকে ক্ষমতা, অর্থায়ন ও দায়িত্বের সবচেয়ে বড় হস্তান্তর’ বলে অভিহিত করেছেন। তবে মেয়রদের হাতে ঠিক কত টাকা আসবে, সে বিষয়সহ অনেক খুঁটিনাটি এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক রব ফোর্ড বলেন, বার্নহামের এই দ্রুত পদক্ষেপগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ‘তিনি সরকারের সামগ্রিক কাঠামো বদলাতে সত্যিই সিরিয়াস’। তার ভাষ্য, ‘উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোর মধ্যে ব্রিটেনই সবচেয়ে কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রগুলোর একটি। এখানে অর্থ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কেন্দ্রেই গুটিয়ে থাকে। প্রদেশগুলোর হাতে করার মতো তেমন কিছুই থাকে না। এটা বদলাতে বার্নহাম দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মনে হচ্ছে, তবে কাজটি বিশাল।’
তবে সমালোচকেরা বলছেন, ম্যানচেস্টারের এই উত্থান শহরের সব প্রান্তে পৌঁছায়নি। অভিবাসনবিরোধী দল রিফর্ম ইউকে ভোটারদের ক্ষোভের সুযোগ নিচ্ছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, নাম্বার টেন নর্থ শেষ পর্যন্ত ভেতরের শহরে চলমান একটি পুনর্গঠন প্রকল্পের অংশ হিসেবে সম্পূর্ণ নতুন ভবন পাবে। আপাতত এই অফিসটি একটি চেইন পাব, একটি নাগরিক নিবন্ধন কার্যালয় এবং সাইবার গোয়েন্দা সংস্থা জিসিএইচকিউর একটি শাখার সঙ্গে একই ভবনে অবস্থান করছে।
লন্ডনের ৩৫০ বছরের পুরোনো ও ঘিঞ্জি টাউনহাউস ১০ ডাউনিং স্ট্রিটের সঙ্গে নাম্বার টেন নর্থের চরিত্রগত পার্থক্য অনেক। ডাউনিং স্ট্রিটকে জোড়াতালি দিয়ে সরকারের কেন্দ্রে রূপান্তর করা হয়েছিল, যা এখন দিন দিন বড় হতে থাকা সরকারের জন্য অপ্রতুল।
সমর্থকেরা বলছেন, নাম্বার টেন নর্থ এরই মধ্যে এক ঝলক টাটকা বাতাসের মতো। সদস্য-মালিকানাধীন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সমষ্টিগত সংগঠন কোঅপারেটিভস ইউকের প্রধান নির্বাহী রোজ মার্লে এই অফিসে বৈঠকের আমন্ত্রণ পেয়ে এই পার্থক্য টের পেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘সবসময় আমাদের আর লন্ডনে ছুটে যেতে হবে না—এটি বেশ স্বস্তির। ওয়েস্টমিনস্টার হয়তো এখন উপলব্ধি করতে শুরু করবে যে ট্রেন কতটা খারাপ এবং উল্টো পথে আসতে গেলে কতটা খরচ পড়ে।’
মার্লে বার্নহাম মেয়র থাকাকালে তার উপদেষ্টা ছিলেন। তিনি এর প্রভাবকে বিবিসির কিছু অনুষ্ঠানের প্রযোজনা গ্রেটার ম্যানচেস্টারের সালফোর্ডে সরিয়ে নেয়ার ঘটনার সঙ্গে তুলনা করেছেন। তার ভাষ্য, ‘তখনই প্রথমবারের মতো আমাদের মতো মানুষদের বিবিসির স্টুডিওতে আমন্ত্রণ জানানো হয়। এতে আমার মতো কণ্ঠস্বরগুলো সেখানে জায়গা পেতে শুরু করে এবং বৈচিত্র্যময় চিন্তাভাবনা শোনা যেতে থাকে।’ তিনি আরও বলেন, ‘যে কণ্ঠগুলো আপনার কথা বা বিশ্বাস থেকে সবচেয়ে দূরে, সেই কণ্ঠই সবচেয়ে বেশি শোনা দরকার। ওয়েস্টমিনস্টারকে সত্যিই দেশের সব অঞ্চলের কথা শুনতে হবে।’
ম্যানচেস্টারের অধিকাংশ মানুষই নিজেদের শহর নিয়ে গর্বিত এবং এখানকার কাজকর্মের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর ধারণাটিকে অনেকেই সমর্থন করছেন। নার্সিং শিক্ষক স্যাম টার্নার বলেন, ‘আমার কাছে এটি যৌক্তিক মনে হয়। কারণ, উত্তর দক্ষিণের চেয়ে অনেক ভিন্ন। এখানে বাড়ির দাম, জমির দাম ও বেতন সবই আলাদা।’
তবে অধ্যাপক ফোর্ড বলেন, বার্নহামকে দেখাতে হবে যে তিনি ক্ষমতা শুধু ম্যানচেস্টারকেই দিচ্ছেন না; দেশের সব প্রান্তে সেটি ছড়িয়ে দিচ্ছেন। তার ভাষ্য, ‘আপনি পাশের শহর লিভারপুল, লিডস বা শেফিল্ডে গেলে সেখানকার মানুষ বলবেন, ম্যানচেস্টারে একটা অফিস মানে সেটি আমাদের জন্য অফিস নয়। এই যুক্তিতে বার্নহামকে জিততে হবে।’
পূর্ব ইংল্যান্ডের নিউমার্কেট থেকে ম্যানচেস্টার ভ্রমণে আসা লেসলি লেবন বলেন, নাম্বার টেন নর্থ ‘একটি শুরু মাত্র’; তবে অন্যান্য অঞ্চলেও নজর দেয়া প্রয়োজন। তিনি চান আরও অনেক নাম্বার টেন হোক, ‘হয়তো একটি ইস্ট ও একটি ওয়েস্ট নাম্বার টেন’। তারপরও তিনি বলেন, ‘নাম্বার টেন নর্থ যা প্রতিনিধিত্ব করছে, সেই ধারণাটি আমার ভালো লেগেছে। কোনো অগ্রগতিই না হওয়ার চেয়ে সামান্য অগ্রগতিও অনেক ভালো।’





