ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতে নতুন মোড়, মধ্যস্থতায় সৌদি আরব

তেহরানের আজাদি স্কয়ারে প্রদর্শিত ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা
বিদেশে এখন
0

সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের একটি ফোনালাপেই বদলে গেল দৃশ্যপট। ইরানে নতুন করে হামলার হুমকি দিয়ে আসা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শনিবার রাতে জানিয়ে দিলেন, আপাতত হামলা হচ্ছে না। শর্ত একটাই—দ্রুত চুক্তি করে খুলে দিতে হবে হরমুজ প্রণালি, বন্ধ করতে হবে পারমাণবিক কর্মসূচি। তবে ট্রাম্পের এই দাবি নাকচ করে দিয়েছে তেহরান। ইরান বলছে, হামলা বন্ধের অনুরোধের কথাটি ‘আরেকটি নতুন মিথ্যা’। রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ ‘দ্রুত, পূর্ণ ও সম্পূর্ণভাবে’ হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়া এবং ‘ইরানের পারমাণবিক হুমকির অবসান’ ঘটানোর মতো চুক্তি সম্পন্ন করতে সময় চেয়েছে। ওই পোস্টে দেশগুলোর নাম উল্লেখ করেননি তিনি। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে তার একটি টেলিফোন-আলাপ হয়।

ট্রাম্প লিখেছেন, ‘এই অনুরোধের ভিত্তিতে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি—বিশ্বের ভবিষ্যৎ কল্যাণের জন্য এবং একটি সফল ও সমৃদ্ধ ইরানের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে দ্রুত একটি চুক্তি সম্পন্ন করার শর্তে হামলা বাতিল করব।’ তিনি আরও জানান, ইসরাইলও ‘এই প্রতিশ্রুতিতে আমার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে’। তবে রোববার এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চেয়ে যোগাযোগ করা হলেও ইসরাইলের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনালাপে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান (এমবিএস) মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা কমাতে ‘সংলাপকে অগ্রাধিকার দেয়ার প্রয়োজনীয়তার’ ওপর জোর দিয়েছেন। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে দুই নেতার এই আলাপের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।

দুই পক্ষ থেকে টানা কয়েকদিন ধরে নতুন হামলার হুমকির পর ট্রাম্পের এই আপাত নরম অবস্থান পাঁচ মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের শুরু করা যুদ্ধের সর্বশেষ মোড় বলে ধারণা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে এই হামলা উপসাগর থেকে লোহিত সাগর এবং এমনকি মিসরের ভূমধ্যসাগরীয় একটি স্থাপনা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল ও এলএনজি পরিবহন করা হতো। ইরান এই জলপথটি প্রায় বন্ধ করে দেয়ায় জ্বালানির দাম বেড়েছে এবং সার্বিক মূল্যস্ফীতিও উসকে গেছে।

ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা মেহের রোববার জানায়, ইরানি সামরিক কর্মকর্তারা ট্রাম্পের এই দাবি নাকচ করে দিয়েছেন। কর্মকর্তাদের নাম প্রকাশ না করে সংস্থাটি জানিয়েছে, তেহরান হামলা বন্ধ করতে চেয়েছে বলে ট্রাম্পের দাবি ‘আরও একটি নতুন মিথ্যা’, যা মূলত উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য বলা হচ্ছে। তারা জানান, যুক্তরাষ্ট্র হামলা বাড়াক বা প্রত্যাহার করুক, ইরানের বাহিনী সর্বোচ্চ প্রস্তুত অবস্থায় রয়েছে। কর্মকর্তারা সতর্ক করে দিয়েছেন, সরাসরি সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠলে যুদ্ধক্ষেত্রই এর পরিণতি নির্ধারণ করবে। এর আগে তেহরান যুক্তরাষ্ট্রকে যেকোনো ‘দুঃসাহসিক পদক্ষেপ’ থেকে বিরত থাকার এবং নতুন হামলার কঠোর জবাব দেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছিল।

তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় ট্রাম্পের ওপর চাপও বাড়ছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি শনিবার তুরস্ক ও পাকিস্তানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে ফোনালাপে জানান, তেহরান যেকোনো ‘আগ্রাসনের’ কড়া জবাব দেবে। টেলিগ্রামে দেয়া বার্তায় তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের ‘অস্থিতিশীল কর্মকাণ্ডের’ পরিণতি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির ঝুঁকি নিয়েও ওই আলোচনায় কথা হয়েছে।

এর কয়েক ঘণ্টা আগে কুয়েতের সেনাবাহিনী জানায়, তারা তাদের দেশের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে ছোড়া ইরানি ড্রোন ধ্বংস করেছে। আরাঘচি সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহানকে জানিয়ে দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যেকোনো হামলা অথবা এসব হামলায় আঞ্চলিক দেশগুলোর অংশগ্রহণের ‘সমুচিত জবাব’ দেয়া হবে।

শুক্রবার মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে ট্রাম্প বলেছিলেন, তার জামাতা জ্যারেড কুশনার, বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওসহ মার্কিন আলোচকেরা ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে সক্ষম হবেন। গত মাসে এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার পর বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারসের দাম ২৪ শতাংশ বেড়েছে। রয়টার্সের জরিপে বিশ্লেষকেরা চলতি বছর তেলের দাম আরও বাড়ার পূর্বাভাস দিয়েছেন।

ট্রাম্প যুক্তি দেখিয়েছেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখার লক্ষ্যপূরণে স্বল্প মেয়াদে জ্বালানির দাম বাড়াটা যুক্তিসংগত। তবে বাস্তব অর্থনৈতিক চাপ তাকে যুদ্ধ থামানোর পথ খুঁজতে বাধ্য করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইরানের মিত্র ইয়েমেনের হুথিদের নতুন হুমকি। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে হুথিরা লোহিত সাগরের অন্য প্রান্তে সুয়েজ খালের কাছাকাছি বাব-এল-মান্দেব প্রণালিতে হামলার হুমকি দিতে শুরু করেছে, যা সৌদি অপরিশোধিত তেলের আরেকটি রপ্তানি রুট।

যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস শনিবার জানায়, তারা ওমান উপকূলে দুটি সামুদ্রিক ঘটনার প্রতিবেদন পেয়েছে। এদের মধ্যে একটি অজ্ঞাত ক্ষেপণাস্ত্র একটি ট্যাংকারে আঘাত হেনেছে এবং জাহাজটির ইঞ্জিন কক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যটির ক্যাপ্টেন জানান, তার জাহাজের কাছেই একটি বড় ধরনের বিস্ফোরণের শব্দ ও পানি ছিটকে ওঠার দৃশ্য তিনি দেখেছেন। তবে সেখানে কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।

এএম