মক্কা চুক্তি ঘিরে দুশ্চিন্তায় নেতানিয়াহু; নির্বাচনের আগে নতুন সংকটে ইসরাইল

মক্কায় ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করছেন এরদোয়ান, মোহাম্মদ বিন সালমান ও শাহবাজ শরিফ
বিদেশে এখন
0

সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে সদ্য সই হওয়া প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া দেয়নি ইসরাইল। বিশ্লেষকদের অনেকেই এই চুক্তিকে ইসরাইলের আঞ্চলিক আগ্রাসী নীতির প্রতি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন। ইসরাইলের সম্ভাব্য প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচিত তুরস্ক, পারমাণবিক শক্তিধর দেশ পাকিস্তান এবং যে সৌদি আরবের সঙ্গে ইসরাইল সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে আগ্রহী এই তিন দেশ শুক্রবার ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ সই করেছে। এই সামরিক জোটের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ শর্ত হল—তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে সবার ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করা হবে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

বিশ্লেষক ও সরকারি সূত্রগুলো বলছে, ইসরাইলের নেতৃত্ব সম্ভবত শনিবারের সাব্বাত বা বিশ্রামের দিনটি কাজে লাগিয়ে এই নতুন আঞ্চলিক জোটের প্রভাব খতিয়ে দেখবে। সব রাজনৈতিক মতের ইসরাইলি নেতারাই তুরস্ককে একটি বড় হুমকি হিসেবে দেখেন। গত মাসে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেছিলেন, ইসরাইল ‘মানবতার জন্য এমন একটি বোঝা যা আর সহ্য করা যায় না’। এই মন্তব্যকে ‘গণহত্যায় উসকানি’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডিয়ন সার। গাজায় ইসরাইলের যুদ্ধের কড়া সমালোচক তুরস্ক। এই যুদ্ধে ৭২ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও গবেষকদের অনেকেই এই যুদ্ধকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে অভিহিত করে আসছেন।

গত জুনে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান বলেছিলেন, সিরিয়া ও লেবাননে ইসরাইলের অনুপ্রবেশ আঙ্কারার জন্য সরাসরি হুমকি। তিনি বলেন, ‘তুরস্কের নিরাপত্তা শুধু হাতায় প্রদেশ থেকেই শুরু হয় না, বরং আলেপ্পো, দামেস্ক ও বৈরুতেও তা বিস্তৃত।’ জবাবে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু এরদোয়ানকে ‘সেমেটিক-বিদ্বেষী স্বৈরশাসক’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। অন্যদিকে পাকিস্তান, যে দেশটি ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয় না, তারাও ইসরাইলের সমালোচনায় সোচ্চার। এপ্রিল মাসে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফ ইসরাইলকে ‘মানবতার জন্য অভিশাপ’ বলে অভিহিত করেছিলেন।

তবে সৌদি আরবকে ইসরাইল তুলনামূলকভাবে কম হুমকি হিসেবে দেখে। নেতানিয়াহু ও যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প উভয়েই সৌদি আরবকে ‘আব্রাহাম চুক্তির’ আওতায় আনতে চাপ দিয়ে আসছিলেন। কিন্তু ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রিয়াদ এই সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ প্রক্রিয়া থেকে দূরত্ব বজায় রেখেছে।

কিংস কলেজ লন্ডনের সিনিয়র লেকচারার আন্দ্রেয়াস ক্রিগ আল-জাজিরাকে বলেন, চলমান যুদ্ধের অভিজ্ঞতা রিয়াদের জন্য একটি অস্বস্তিকর সিদ্ধান্ত সামনে এনেছে। মার্কিন সামরিক শক্তি এখনো অপরিহার্য হলেও এই সম্পর্ক হামলা থেকে সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেয় না; আবার ওয়াশিংটন যে সৌদি স্বার্থ অনুযায়ী কাজ করবে, তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাই সৌদি আরব এখন আরও বৃহত্তর কৌশলগত বিকল্প খুঁজছে।

অনেকেই মনে করেন, সদ্য ঘোষিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি মূলত যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের ইরান যুদ্ধের প্রতিক্রিয়া। এদিকে নেতানিয়াহু নিজেও ইসরাইল, গ্রিস, সাইপ্রাস ও পাকিস্তানের প্রতিপক্ষ ভারতসহ কিছু আরব-আফ্রিকান-এশীয় দেশ নিয়ে ‘জোটের ষড়ভুজ’ গড়ে তোলার চেষ্টা চালাচ্ছেন। বিশ্লেষক ব্রেগম্যান আল-জাজিরাকে বলেন, ‘এই চুক্তির মূল কারণ হল যুক্তরাষ্ট্রের ওপর মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের আস্থা কমে যাওয়া। আমার ধারণা, এই চুক্তি ইসরাইলের চেয়ে বরং ইরানকে মোকাবিলার জন্যই বেশি করা হয়েছে।’

আসন্ন অক্টোবরের নির্বাচনে নেতানিয়াহু বেশ চাপে রয়েছেন। সাম্প্রতিক জনমত জরিপে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকটের সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি অবস্থানে আছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনের আগে নিজের নিরাপত্তা-ইমেজ শক্তিশালী করতেই তিনি তুরস্ককে ‘নতুন কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী’ হিসেবে দেখাতে পারেন। ইসরাইলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও নেতানিয়াহুর সমালোচক নাফতালি বেনেট গত ফেব্রুয়ারিতেই তুরস্ককে ‘নতুন ইরান’ হিসেবে চিহ্নিত করে পারমাণবিক পাকিস্তানের সঙ্গে মিলে ‘বৈরী সুন্নি জোট’ গঠনের বিরুদ্ধে সতর্ক করেছিলেন।

ইসরাইলি সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড্যানিয়েল লেভি আল-জাজিরাকে বলেন, ‘নির্বাচনের মৌসুমে সব কিছুই চড়া সুরে বাজে। নেতানিয়াহু তুরস্কের বিরুদ্ধে সরব হলেও বেনেট এই ইস্যুতে আরও চড়া অবস্থান নিয়েছেন। আমার ধারণা, বিরোধীরা এই চুক্তিকে বিশেষত সৌদি আরবের অন্তর্ভুক্তিকে নেতানিয়াহুর কূটনৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে তুলে ধরবে। অন্যদিকে নেতানিয়াহু বিষয়টি খাটো করে দেখিয়ে ভারতের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত সম্পর্ককে বড় করে দেখাতে চাইবেন।’

এএম