ট্রাম্পকে হত্যার ছক, ইসরাইলি দাবির সত্যতা পায়নি ওয়াশিংটন

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
বিদেশে এখন
0

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যার ইরানি ষড়যন্ত্র সম্পর্কে গত এক বছরে ইসরাইলের কাছ থেকে যুক্তরাষ্ট্র বেশ কয়েকটি সতর্কবার্তা পেয়েছে। এর মধ্যে তুরস্কে ‘এয়ার ফোর্স ওয়ানের’ গোপন বিমান বদলের আগেও এমন সতর্কতা এসেছিল। তবে এসব সতর্কবার্তার সত্যতা মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেননি বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের একজন বর্তমান কর্মকর্তা ও দুইজন সাবেক কর্মকর্তা। রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

সূত্রগুলো জানিয়েছে, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে দেয়া এবং কিছু ক্ষেত্রে সরাসরি ইসরাইলি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে হোয়াইট হাউসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছানো এসব সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, ইরান স্নাইপার দিয়ে ট্রাম্পকে গুলি করে হত্যা করতে পারে অথবা কোনো বড় জনসমাগমে ছুরি হামলা চালানোর জন্য কাউকে নিয়োগ দিতে পারে। ২০২৫ সালের জুনের ১২ দিনের যুদ্ধের আগে থেকে এই তথ্যগুলো আসতে শুরু করে। গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানে যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্তের আগে এই ধারা আরও তীব্র হয় বলে জানিয়েছেন সূত্রগুলো।

ন্যাটো সম্মেলনের আগে বিস্তারিত ব্রিফিং
সবচেয়ে বিস্তারিত সতর্কবার্তাটি এসেছিল গত জুলাইয়ে আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলনের আগে বলে জানিয়েছেন মার্কিন ওই কর্মকর্তা এবং এই বিষয়ে অবগত অন্য একজন। এই কর্মকর্তারা জানান, ইসরাইলি কর্মকর্তারা হোয়াইট হাউসকে এমন গোয়েন্দা তথ্যের ব্রিফিং দিয়েছিলেন যে ট্রাম্প ন্যাটো সম্মেলনের উদ্দেশে ‘এয়ার ফোর্স ওয়ানে’ ভ্রমণের সময় ইরান তাকে হত্যার চেষ্টা করতে পারে। এতে সম্ভবত কাঁধে বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হতে পারে।

মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই মনে করে আসছে, ২০২০ সালে ইরানের সামরিক কমান্ডার কাসেম সোলাইমানিকে ট্রাম্পের নির্দেশে হত্যার প্রতিশোধ নিতে চায় তেহরান। তবে গত বছরের শুরু থেকে ইসরাইলি গোয়েন্দাদের পাঠানো ট্রাম্পের জীবনের প্রতি সুনির্দিষ্ট কিছু হুমকির সত্যতা যাচাই করতে পারেনি মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ। ন্যাটো সম্মেলনের ঘটনার ক্ষেত্রেও তুরস্কের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ট্রাম্পের জীবনের প্রতি হুমকি সম্পর্কে ইসরাইলি দাবির সত্যতা প্রমাণের কোনো প্রমাণ তুর্কি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছেও ছিল না। আঙ্কারা তাদের এই মূল্যায়নটি ওয়াশিংটনের সঙ্গে শেয়ার করেছিল।

তবে সত্যতা প্রমাণিত না হলেও অতিরিক্ত সতর্কতার অংশ হিসেবে হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তা ও সিক্রেট সার্ভিস এই হুমকি মোকাবিলায় বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে তুরস্ক সফরের সময় অসাধারণ এক প্রতারণামূলক অভিযান ছিল উল্লেখযোগ্য, যেখানে ট্রাম্পকে ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’ থেকে সরিয়ে দেশ ছাড়ার জন্য অন্য একটি বিমানে ওঠানো হয়।

ইসরাইলি গোয়েন্দাদের প্রভাব
এই ঘটনা প্রমাণ করে, তেহরানের সঙ্গে চলমান বাড়তি উত্তেজনার এই সময়ে ইসরাইলি গোয়েন্দা তথ্য ট্রাম্প প্রশাসনের ইরানসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে কতটা প্রভাব ফেলছে। ইরানের হুমকি সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি গোয়েন্দা মূল্যায়নেও ব্যাপক অমিল রয়েছে।

চলতি বছরের শুরুর দিকে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন ছিল, ইরান সক্রিয়ভাবে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে না। যদিও ইসরাইল দাবি করে আসছিল যে তেহরান জরুরি হুমকি সৃষ্টি করছে। মার্কিন গোয়েন্দাদের এসব প্রতিবেদন সত্ত্বেও গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানে হামলার সিদ্ধান্ত নেন ট্রাম্প। রয়টার্স আগে জানিয়েছিল, সামরিক অভিযান শুরুর আগে তেহরান তাকে হত্যার চেষ্টা করেছিল বলে ইসরাইলের দেয়া গোয়েন্দা তথ্যকেও বিবেচনায় নিয়েছিলেন ট্রাম্প।

ইসরাইলি দূতাবাসের একজন মুখপাত্র ইরানের বিষয়ে মার্কিন নীতিকে প্রভাবিত করতে ইসরাইলের গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহারের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। মুখপাত্র বলেন, ‘যারা বলছেন কথিত গোয়েন্দা তথ্য শেয়ারের মাধ্যমে ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রের নীতিকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে, তারাই আবার নিজেদের এজেন্ডা পূরণ হলে ইসরাইলকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন রাখার অভিযোগে অভিযুক্ত করতে দ্বিধা করবেন না।’ হোয়াইট হাউস ও সিআইএ এই বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

সিক্রেট সার্ভিসের মুখপাত্র অ্যান্থনি গুগ্লিয়েলমি নির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকৃতি জানালেও বলেন, সাম্প্রতিক হত্যাচেষ্টা এবং প্রেসিডেন্টের প্রতি বাড়তে থাকা হুমকির মধ্যে ট্রাম্পের নিরাপত্তার ওপরই সিক্রেট সার্ভিস মনোযোগ ধরে রেখেছে। তার ভাষায়, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সিক্রেট সার্ভিস প্রতিটি জায়গায় প্রতিরক্ষামূলক কার্যক্রম বাস্তব সময়ে পরিচালনার জন্য বিস্তৃত পরিসরের তথ্য ধারাবাহিকভাবে বিশ্লেষণ করে যাচ্ছে।’

ঘনিষ্ঠ মৈত্রীর ফাঁকফোকর
মধ্যপ্রাচ্যের বিষয়ে এবং বিশেষ করে ইরান সম্পর্কিত বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই ইসরাইলি গোয়েন্দা তথ্যের ওপর অনেকটা নির্ভরশীল। সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরান সম্পর্কে ইসরাইলি গোয়েন্দা তথ্য সাধারণত আনুষ্ঠানিক চ্যানেলের মাধ্যমে সিআইএ বা ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সিতে (এনএসএ) পৌঁছায়। এরপর সেগুলো বিশ্লেষণ করা হয়। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো প্রায়ই ইসরাইলি তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে পারে না, তবে অন্যান্য সূত্রের তথ্য ব্যবহার করে তার সত্যতা ও নির্ভুলতা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেয়।

সাবেক এক কর্মকর্তা ও এই বিষয়ে অবগত অন্য একজন জানিয়েছেন, দুটি মার্কিন সামরিক অভিযানের সময় সিআইএর মূল্যায়ন ছিল, ইরান কর্তৃক তৈরি হুমকি সম্পর্কে ইসরাইলের দেয়া গোয়েন্দা তথ্যের বিষয়ে তাদের ‘আস্থা কম।’ এর মধ্যে ট্রাম্পকে হত্যার যেকোনো পরিকল্পনার তথ্যও ছিল। প্রশাসনের ভেতরে এই মূল্যায়নগুলো কতটা ছড়ানো হয়েছে তা স্পষ্ট নয়। এনএসএ এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

দুই সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে বেশ কয়েকটি ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন, যেখানে গত এক বছরে জ্যেষ্ঠ ইসরাইলি কর্মকর্তা ও প্রতিনিধিরা হোয়াইট হাউসে, এমনকি সিচুয়েশন রুমেও ফোন করে ট্রাম্পের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সরাসরি ইরানি হুমকি সম্পর্কে ব্রিফ করেছেন। ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের প্রক্রিয়া ভেঙে পড়ার প্রেক্ষাপটে এই সরাসরি যোগাযোগের ঘটনা ঘটেছে।

সাবেক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত বছর জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালকের কার্যালয়ের (ওডিএনআই) সঙ্গে উত্তেজনা বৃদ্ধির মধ্যে সিআইএ ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স কাউন্সিলের (এনআইসি) সঙ্গে যৌথ মূল্যায়নের কাজ বন্ধ করে দেয়। এনআইসি হলো ওডিএনআইয়ের তত্ত্বাবধানে থাকা মার্কিন গোয়েন্দা সম্প্রদায়ের শীর্ষ বিশ্লেষণী গোষ্ঠী। এর মূল্যায়নগুলোতে সবচেয়ে বড় অবদান সিআইএর। ওডিএনআইতে সাম্প্রতিক ছাঁটাইয়ের কারণে এনআইসির পক্ষ থেকে ইরান সম্পর্কে সাম্প্রতিক মূল্যায়ন কম আসছে বলেও কর্মকর্তা ও অন্য একজন জানিয়েছেন।

এএম