যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র বানাতে ইরানকে গোপনে সহায়তা রাশিয়ার

আলাবুগায় ইরানের নকশায় তৈরি শাহেদ ড্রোনের রুশ সংস্করণের উৎপাদন লাইনে কাজ চলছে
বিদেশে এখন
0

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজকে হুমকিতে ফেলতে সক্ষম সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে ইরানকে গোপনে সহায়তা করেছে রাশিয়া। ২০২৩ সালে শুরু হওয়া ‘সি৩৪০এল’ নামের এই প্রকল্পে ইরানকে র‍্যামজেট প্রপালশন ব্যবস্থা তৈরিতে সহায়তা দেয়া হচ্ছে। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র শব্দের চেয়ে বেশি গতিতে উড়তে পারে। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের বরাত দিয়ে দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার সামরিক প্রযুক্তি ইরানে হস্তান্তরের জন্য ক্রেমলিনের সর্বোচ্চ পর্যায়ের অনুমোদন প্রয়োজন ছিল বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান যুদ্ধের মধ্যেও প্রকল্পটি চালু রয়েছে। ফলে ইরান ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরি ও অন্যান্য যুদ্ধজাহাজকে লক্ষ্য করতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সাবেক সিআইএ সামরিক বিশ্লেষক জিম ল্যামসন বলেন, ‘ইরানিদের জন্য এটি একটি গুণগতভাবে নতুন কৌশলগত অস্ত্রব্যবস্থা হবে, যা যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর জাহাজকে হুমকিতে ফেলতে পারে।’

সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা অত্যন্ত কঠিন। এগুলো নিচু উচ্চতায় ভূমির আকৃতি অনুসরণ করে উড়ে রাডারের নজর এড়াতে পারে। এসব ক্ষেপণাস্ত্র ঘণ্টায় প্রায় ২ হাজার ২০০ মাইল পর্যন্ত গতিতে ছুটতে পারে। ইরান র‍্যামজেট প্রপালশন ব্যবস্থা তৈরি ও পরীক্ষা করেছে। তবে এটি যুদ্ধক্ষেত্রে মোতায়েন করা হয়েছে, এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র বিশেষজ্ঞ ফ্যাবিয়ান হিনজ বলেন, ‘এটি রাশিয়ার কাছ থেকে অত্যন্ত কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক প্রযুক্তি হস্তান্তর। ইরান কয়েক দশক ধরে এই প্রযুক্তি অর্জনের চেষ্টা করেছে।’ তিনি বলেন, ‘এ ধরনের একটি প্রকল্পের জন্য রাশিয়ার সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে রাজনৈতিক অনুমোদন প্রয়োজন।’

ইরান এরই মধ্যে রাশিয়াকে ইউক্রেনের শহরগুলোতে রাতের হামলায় ব্যবহৃত ‘কামিকাজে’ শাহেদ ড্রোন সরবরাহ করেছে। অন্যদিকে রাশিয়া মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে হামলা চালাতে ইরানকে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করেছে বলে খবর রয়েছে।

প্যারিসের সায়েন্সেস পো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নিকোল গ্রাজেভস্কি বলেন, দুই দেশের এই সহযোগিতা ‘দেখাচ্ছে, রাশিয়া ইউক্রেনের যুদ্ধকে আরও বিস্তৃত করতে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে ভিন্ন ভিন্ন সংঘাতের ময়দানে টেনে নিতে চাইছে’। তিনি আরও বলেন, ‘এই অঞ্চলে রাশিয়া সীমারেখাগুলোকে ততটা গুরুত্ব দেয় না।’

প্রকল্পটি রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় অস্ত্র রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান রোসোবোরোনএক্সপোর্টের মাধ্যমে আয়োজন করা হয়েছে বলে জানা গেছে। প্রতিষ্ঠানটি রুশ রকেট নির্মাতা এনপিও মাশিনোস্ত্রোয়েনিয়ার সঙ্গে সমন্বয় করে প্রকল্পটি পরিচালনা করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ২০১৪ সাল থেকে এনপিও মাশিনোস্ত্রোয়েনিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে।

২০২৫ সালের মধ্যে এনপিও মাশিনোস্ত্রোয়েনিয়া র‍্যামজেট প্রপালশন ব্যবস্থা নিয়ে ইরানের কারিগরি নথিপত্রের একটি বড় সংগ্রহ পায়। রুশ প্রকৌশলীরা ইরানের একটি পরীক্ষামূলক উড্ডয়নের তথ্য বিশ্লেষণ করেন এবং সেটি কীভাবে কাজ করেছে, তা জানতে বিস্তারিত প্রশ্ন পাঠান।

প্রকল্পটিতে এনপিও মাশিনোস্ত্রোয়েনিয়ার জ্যেষ্ঠ ক্ষেপণাস্ত্র প্রকৌশলীদের দক্ষতা ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তাদের কয়েকজন ২০২৩ সালে চুক্তি স্বাক্ষরের আগে ইরান সফরও করেছিলেন।

মঙ্গলবার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, যুদ্ধের এই কঠিন সময়ে মস্কো ‘প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়ার চেষ্টা করছে’ এবং ‘প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ করছে’।

এক মাসের বেশি সময়ের বিরতির পর সপ্তাহান্ত থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হামলা-পাল্টা হামলা আবারও তীব্র হয়েছে। রোববার যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালির লারাক দ্বীপে ইরানের দুটি রকেট উৎক্ষেপণকারী যানকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়। মঙ্গলবার আরও হামলা হয়। জবাবে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।

এএম