ফ্লাইদুবাই ফ্লাইটে হামলা; পাইলট সহিংস হলে বিমান কতটা নিরাপদ

উড়োজাহাজের ককপিট
বিদেশে এখন
0

দুবাই থেকে ইসরাইলের তেল আবিবগামী ফ্লাইদুবাইয়ের একটি ফ্লাইটে বুধবার সকালে ক্যাপ্টেনকে ছুরিকাঘাত করেন কো-পাইলট। ১৭০ জনের বেশি আরোহী নিয়ে বিমানটি বিধ্বস্ত করার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। জর্ডানের আকাশসীমায় পৌঁছানোর পর বিমানটি এক মিনিটের মধ্যে অর্ধেক উচ্চতায় নেমে আসে। এ সময় আহত ক্যাপ্টেন ককপিটের দরজা খুলতে সক্ষম হন এবং যাত্রী ও ক্রুরা মিলে হামলাকারীকে পরাস্ত করেন। হামলাকারী বিমানের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নষ্ট করার চেষ্টা করছিলেন। আল জাজিরার বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

ঘটনার সময় বিমান থেকে জরুরি সংকেত পাঠানো হয়। ফ্লাইটে থাকা অন্য একজন পাইলট বিমানের নিয়ন্ত্রণ নেন এবং সৌদি আরবের তাবুকে নিরাপদে অবতরণ করান।

ফ্লাইদুবাইয়ের আয়োজক দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ইতোমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে। অন্যদিকে সৌদি কর্তৃপক্ষ সন্দেহভাজন হামলাকারী কো-পাইলটকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। তিনিও আহত হয়েছেন এবং বর্তমানে সৌদি হেফাজতে আছেন। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, তারা তদন্ত পর্যবেক্ষণ করবেন এবং এতে ‘সম্ভবত অংশও নেবেন’। যাত্রীদের বেশির ভাগই ইসরাইলি হওয়ায় দেশটি দাবি করেছে, এটি একটি ‘সন্ত্রাসী’ হামলা।

ফ্লাইদুবাইয়ের এফজেড১০৭৩ ফ্লাইটের এই ঘটনা বেসামরিক বিমান চলাচল শিল্পে অস্বস্তিকর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, পাইলট নিজেই সহিংস হয়ে উঠলে বাণিজ্যিক বিমান কতটা নিরাপদ?

২৫ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রে ৯/১১ হামলার পর বেসামরিক বিমান চলাচল শিল্পে বড় পরিবর্তন আসে। ওই দিন আল-কায়েদা সংশ্লিষ্ট ছিনতাইকারীরা চারটি বিমানের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল। এরপর বিমান চলাচলে নিরাপত্তা জোরদার করা হয় এবং ককপিটে অননুমোদিত প্রবেশ ঠেকাতে বিশেষ মনোযোগ দেয়া হয়। ইন্টারন্যাশনাল সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশন (আইসিএও) বৈশ্বিক নিয়মে পরিবর্তন আনে। ককপিটে বুলেটপ্রুফ দরজা সংযোজন এবং বিমানবন্দরে পরিচয়পত্র যাচাই বাধ্যতামূলক করা হয়।

আধুনিক বাণিজ্যিক বিমানে ককপিটের দরজা সাধারণত খুব ভারী এবং ভেতর থেকে নিয়ন্ত্রিত হয়, যা ছোট আগ্নেয়াস্ত্রের আঘাতও সহ্য করতে পারে। কেবিন ক্রুরা কিপ্যাডের মাধ্যমে জরুরি প্রবেশের সংকেত দিতে পারেন, তবে ককপিটের ভেতর থেকে কেউ তা বাতিল না করলে নির্দিষ্ট সময় পর দরজা খোলে। এসব ব্যবস্থা মূলত বাইরের আক্রমণকারীদের ঠেকাতে তৈরি, ভেতরের কোনো হুমকি মোকাবিলার জন্য নয়।

২০১৫ সালে জার্মানউইংস ফ্লাইটের ফার্স্ট অফিসার আন্দ্রেয়াস লুবিৎস ক্যাপ্টেনকে ককপিটের বাইরে আটকে রেখে ইচ্ছাকৃতভাবে ফরাসি আল্পসে বিমান আছড়ে ফেলেন। এতে ১৫০ জন আরোহীর সবাই নিহত হন। এরপর ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এভিয়েশন সেফটি এজেন্সি (ইএএএসএ) মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করে।

ফ্লাইদুবাইয়ের ঘটনায় আহত ভারতীয় পাইলট ককপিটের দরজা খুলতে পেরেছিলেন। নেতানিয়াহু তাকে ‘হিরো’ আখ্যা দিয়ে বলেন, এর ফলেই যাত্রী ও ক্রুরা হামলাকারীকে পরাস্ত করে বড় বিপর্যয় এড়াতে পেরেছেন।

জরুরি পরিস্থিতিতে পাইলটরা রেডিওর মাধ্যমে ‘মে ডে’ সংকেত দিতে পারেন। লন্ডনভিত্তিক এভিয়েশন কনসালটেন্সি স্ট্র্যাটেজিকঅ্যারো রিসার্চের প্রধান বিশ্লেষক সাজ আহমাদ বলেন, চিকিৎসা বা যান্ত্রিক ত্রুটির ক্ষেত্রে পাইলটরা ৭৭০০ সংকেত ব্যবহার করেন। ছিনতাই বা বেআইনি হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রে ৭৫০০ সংকেত দেয়া হয়। ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, ফ্লাইদুবাই বিমানটি ৫টা ২৮ মিনিটে (জিএমটি) ৭৭০০ এবং ৫টা ৩৫ মিনিটে ৭৫০০ সংকেত পাঠিয়েছিল।

সাজ আহমাদ বলেন, ককপিটে দুই পাইলটই অকার্যকর হয়ে পড়লে তা সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি তৈরি করে। ফ্লাইদুবাই বিমানে থাকা অন্য দুজন পাইলট নিরাপদে অবতরণ করিয়েছেন, যা অত্যন্ত বিরল। ওই পাইলটরা না থাকলে কী হতো, তা ভাবলেও ভয় লাগে।

লাইসেন্স পাওয়ার আগে পাইলটদের দৃষ্টি, শ্রবণ, হৃদ্‌রোগ এবং স্নায়বিক স্বাস্থ্য পরীক্ষাসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য ও মানসিক পরীক্ষা দিতে হয়। সাজ আহমাদ মনে করেন, ফ্লাইদুবাইয়ের ঘটনার পর ইসরাইল হয়তো এখন থেকে ফ্লাইট ক্রুদের জাতীয়তা যাচাইয়ের ওপর জোর দেবে।

ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র দোরোন স্পিলম্যান বলেছেন, ইসরাইলে আসা সব পাইলটের পরিচয় তাদের জানতে হবে এবং একধরনের নিরাপত্তা পরীক্ষাও করা হবে।

পাইলটদের মধ্যে বাগ্‌বিতণ্ডা বা হাতাহাতির ঘটনা আগে ঘটলেও, মাঝ আকাশে বিমান ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে ক্যাপ্টেনকে কো-পাইলটের ছুরিকাঘাত করার ঘটনা বিমান চলাচলের ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল বলে জানিয়েছেন বিশ্লেষকেরা।

এএম