ইরানে পরমাণু অস্ত্র নয়, ‘মাদার অব অল বম্বস’ ব্যবহারের পরিকল্পনা ট্রাম্পের!

ফ্লোরিডার এগলিন বিমানঘাঁটিতে এমওএবি বোমা
বিদেশে এখন
0

ইরানে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা প্রথমবারের মতো সরাসরি খারিজ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে অদূর ভবিষ্যতে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে প্রাণঘাতী অ-পারমাণবিক অস্ত্র, যা ‘মাদার অব অল বম্বস’ (সব বোমার মা) নামে পরিচিত, তা ব্যবহারের পরিকল্পনা নিয়ে প্রকাশিত খবর অস্বীকার করেননি তিনি।

ডানপন্থি মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউজম্যাক্সকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, তার পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ইচ্ছা নেই। তবে তিনি স্পষ্ট করেন, জিবিইউ-৪৩/বি ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স এয়ার ব্লাস্ট বোমা (মোয়াব) কোনো পারমাণবিক অস্ত্র নয়।

ট্রাম্প বলেন, ‘আমি পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করব না। আমাদের তা করার প্রয়োজন নেই। আমরা বিশ্বের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক শক্তি।’

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের চলমান যুদ্ধের মধ্যে পারমাণবিক সংঘাতের জল্পনা নিয়ে এটিই ট্রাম্পের প্রথম স্পষ্ট বক্তব্য। একই সঙ্গে এটি আগামী ৩ নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর যুদ্ধের নতুন ধাপ শুরু হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ট্রাম্প ঠিক কী বলেছেন?
নিউজম্যাক্সকে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে, বিশেষ করে পিকঅ্যাক্স পর্বতে ফের হামলা চালাতে পারে। সেখানে গ্রানাইট পাথরের নিচে তেহরানের পারমাণবিক কেন্দ্র রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

পারমাণবিক বা কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের বিষয় খারিজ করে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করব না। আমাদের প্রয়োজন নেই। আমরা বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ পারমাণবিক শক্তি।’

সিএনএনের খবরে বলা হয়, মার্কিন সরকার মোয়াব ব্যবহারের কথা ভাবছে। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ট্রাম্প বলেন, ‘মাদার অব অল বম্বস কোনো পারমাণবিক অস্ত্র নয়। এটি একেবারেই পারমাণবিক নয়। এটি কেবল একটি বিশাল আকারের বোমা।’

তবে ইরানে এই বোমা ব্যবহারের অনুমোদন তিনি দিয়েছেন কি না, তা জানাননি ট্রাম্প। তিনি ইঙ্গিত দেন, খুব শিগগিরই নতুন হামলা হতে পারে। তার মতে, ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতেই যুক্তরাষ্ট্র এখন যুদ্ধ শেষ করতে পারছে না।

তিনি আরও বলেন, শক্তি বা কূটনীতির মাধ্যমে খুব দ্রুত যুদ্ধ শেষ হবে এবং তেলের দাম কমে যাবে। ভূখণ্ডে পদাতিক সেনা পাঠানোর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘না, আমি তা দেখছি না।’

‘মাদার অব অল বম্বস’ বা মোয়াব কী?
মোয়াব বোমায় প্রায় ৮ হাজার ৫০০ কেজি উচ্চমাত্রার বিস্ফোরক থাকে। এই বোমার মোট ওজন ৯ হাজার ৮০০ কেজি (প্রায় ১০ টন), যা প্রায় চারটি গাড়ির সমান। এটি নয় মিটারের চেয়েও বেশি লম্বা।

স্টিলথ বোমারু বিমানগুলো আকারে ছোট হওয়ায় এই বোমা বহন করতে পারে না। তাই লকহিড সি-১৩০ হারকিউলিস পরিবহন বিমানের মাধ্যমে এটি ফেলতে হয়।

এটি মাটির কয়েক মিটার ওপরে বিস্ফোরিত হয়ে এক কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে থাকা ভবন ও কাঠামো ধ্বংস করে দিতে পারে। মার্কিন বিমানবাহিনী জানিয়েছে, পরীক্ষার সময় এই বোমার বিস্ফোরণে সৃষ্ট ধোঁয়ার মেঘ ৩২ কিলোমিটার দূর থেকেও দেখা গেছে।

সামরিক বিশ্লেষক ইলাইজা ম্যাগনিয়ার বলেন, ‘এর মূল উদ্দেশ্য হলো বিশাল এলাকা জুড়ে প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটানো।’ তবে ইরানের মাটির গভীরে তৈরি পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর বিরুদ্ধে এটি কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে ট্রাম্পের আগের অবস্থান কী ছিল?
ট্রাম্প এর আগে কখনো স্পষ্ট করে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের কথা না বললেও, তা সম্পূর্ণ নাকচ করেননি।

গত এপ্রিলে ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দিলে ট্রাম্প তার সোশ্যাল মিডিয়া ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছিলেন, ইরান শান্তি চুক্তিতে না এলে ‘আজ রাতে পুরো এক সভ্যতা ধসে পড়বে, যা আর কখনো ফিরে আসবে না।’ জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনেও তিনি ইরানকে ‘ধ্বংস’ করার হুমকি দিয়েছিলেন।

‘কৌশলগত’ পারমাণবিক অস্ত্র কী?
কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র (টেকটিক্যাল নিউক্লিয়ার ওয়েপন) হলো রণক্ষেত্রের জন্য তৈরি ছোট আকারের পারমাণবিক বোমা। এগুলোর ধ্বংসক্ষমতা ০.৩ থেকে ৫০ কিলোটন পর্যন্ত হতে পারে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিরোশিমায় ফেলা ১৫ কিলোটনের বোমাটি আজ কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র হিসেবে গণ্য হবে। যুক্তরাষ্ট্র, উত্তর কোরিয়া ও রাশিয়ার কাছে এই অস্ত্র রয়েছে।

ইরানে পরবর্তী মার্কিন হামলা কেমন হতে পারে?
মোয়াব ব্যবহারের সম্ভাবনা ট্রাম্প নাকচ না করায় বিশ্লেষকদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক ও প্রতিরক্ষা কেন্দ্রগুলো, বিশেষ করে পিকঅ্যাক্স পর্বত লক্ষ্য করে আরেকটি বোমাবর্ষণ অভিযান চালাতে পারে।

মার্কিন নৌবাহিনী কৌশলগত বন্দরগুলোতে অবরোধ বজায় রাখতে পারে। অন্যদিকে ইরান হুমকি দিয়েছে, হামলা বাড়লে তারা প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল ও ডিজিটাল অবকাঠামোয় পাল্টা হামলা চালাবে।

—আল জাজিরার প্রতিবেদনে অবলম্বনে

এএম