ওই ঘোষণার তিন দিন পর গত ২৩ অক্টোবর রোমানিয়ার জলসীমার ঠিক বাইরে আরেকটি জাহাজে হামলা হয়। আর গত সপ্তাহে বুলগেরিয়ার একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলে সি-ড্রোন হামলায় একটি গ্রিক কনটেইনার জাহাজ ডুবে যায়।
একের পর এক এসব হামলা দেখাচ্ছে, রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান নৌ-যুদ্ধ কৃষ্ণসাগরে ন্যাটোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। এতে রোমানিয়া ও বুলগেরিয়ার মতো কৃষ্ণসাগর তীরবর্তী ন্যাটো সদস্যদেশগুলো ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
সামরিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, এগুলো যে রাশিয়ার হামলা, সে বিষয়ে তাদের মনে খুব একটা সন্দেহ নেই। নৌ-নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান অ্যাম্ব্রির তথ্যমতে, সর্বশেষ হামলার ভিডিওতে দেখা সি-ড্রোনটি দেখতে রাশিয়ার তৈরি একটি সংস্করণের মতো। লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো সিদ্ধার্থ কৌশল বলেন, ‘আমি মনে করি এটি নিঃসন্দেহে সংঘাতের বিস্তার।’
তবে ইউক্রেনের প্রতিবেশী দেশগুলোর আশপাশে ড্রোন হামলার কথা অস্বীকার করেছে রাশিয়া। মস্কোর দাবি, ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দিয়ে ইউরোপীয় সরকারগুলোই যুদ্ধ উসকে দিচ্ছে। এ বিষয়ে বক্তব্যের জন্য রয়টার্সের অনুরোধে সাড়া দেয়নি রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।
অক্টোবরে হামলার শিকার অনেক জাহাজই ইউক্রেনের রপ্তানির কাজে ব্যবহৃত রোমানিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ খালের কাছে নোঙর করা ছিল কিংবা সেদিকে যাচ্ছিল। এর মধ্যে একটি জাহাজ ছিল রোমানিয়ার নিজস্ব জলসীমায় এবং বাকি আটটি ছিল রোমানিয়া বা বুলগেরিয়ার একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের কৃষ্ণসাগর কর্মসূচির পরিচালক ইউলিয়া জোজা বলেন, পশ্চিমা দেশগুলো যে সংঘাত বাড়াতে চায় না, তা মাথায় রেখেই এসব হামলা চালাচ্ছে রাশিয়া। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ন্যাটোর আকাশসীমায় রুশ ড্রোনের অনুপ্রবেশের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘আমরা যে সবচেয়ে ন্যূনতম পদক্ষেপ নিতে সম্ভাব্য সবকিছু করব, তা পুরোপুরি জেনেই তারা ন্যাটোর চূড়ান্ত সীমারেখা পরীক্ষা করে দেখছে।’
ন্যাটোর একজন কর্মকর্তা বলেছেন, ইউক্রেনকে সহায়তা দেয়া থেকে ন্যাটো মিত্রদের বিরত রাখতে রাশিয়ার এসব কর্মকাণ্ড গুরুতর নিরাপত্তা হুমকি। কৃষ্ণসাগর তীরবর্তী দেশগুলোসহ সব সদস্যকে রক্ষায় জোটের প্রতিশ্রুতি ‘লৌহকঠিন’। ওই কর্মকর্তা জানান, সাশ্রয়ী মূল্যের ড্রোন-প্রতিরোধী ব্যবস্থার স্পষ্ট প্রয়োজন রয়েছে। তবে আগামী পাঁচ বছরে ড্রোন প্রতিরোধের সক্ষমতা বাড়াতে ন্যাটো এরই মধ্যে ৪ হাজার কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
রোমানিয়ার বাণিজ্যের জন্য কৃষ্ণসাগর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ। এখানে দেশটির গভীর সমুদ্রের নেপচুন ডিপ গ্যাস প্রকল্প অবস্থিত, যা আগামী বছর রোমানিয়াকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সবচেয়ে বড় গ্যাস উৎপাদনকারী দেশে পরিণত করবে। গত আগস্টে একটি সি-ড্রোন এই প্রকল্পের কাছাকাছি চলে এসেছিল।
বেসামরিক জাহাজে ‘পরিকল্পিত’ হামলার জন্য রাশিয়াকে দায়ী করেছে বুখারেস্ট। তবে ফরেনসিক প্রমাণের প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করে নির্দিষ্ট কোনো হামলার দায় সরাসরি চাপানো থেকে বিরত রয়েছে দেশটি। অন্যদিকে বুলগেরিয়া সরাসরি রাশিয়াকে দোষারোপ না করলেও বলেছে, কিছু হামলা দেখে মনে হয় এতে রাশিয়াই লাভবান হচ্ছে।
চীনের দিকে মনোযোগ দেয়ার কারণে ওয়াশিংটন যখন ইউরোপে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি পুনর্মূল্যায়ন করছে, তখনই এসব হামলা ঘটছে। গত বছর রোমানিয়া থেকে এক হাজার সেনা প্রত্যাহার করে নেয় যুক্তরাষ্ট্র। রোমানিয়ার একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ‘আটলান্টিকের দুই পাড়ের সম্পর্কের এই মুহূর্তটিকে পুতিন সম্ভবত কাজে লাগাতে চান। ইইউ ও ন্যাটোর মনোযোগ জরুরি, কিন্তু তাদের বাহিনীগুলো বর্তমানে উত্তর দিক ও বাল্টিক অঞ্চলের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে।’
ইউলিয়া জোজা বলেন, বাল্টিক দেশগুলো ও পোল্যান্ডে ন্যাটো নিজেদের সামরিক উপস্থিতি জোরদার করলেও বুখারেস্টের অনুরোধ সত্ত্বেও রোমানিয়ায় তা করেনি। তিনি বলেন, ‘কৃষ্ণসাগর পুরোপুরি ন্যাটোর প্রতিশ্রুতির অংশ কি না, সে বিষয়ে ব্রাসেলস ও ওয়াশিংটন এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি বলেই মনে হয়।’
রোমানিয়ার ওই কর্মকর্তা হুমকি মোকাবিলায় দেশটির জন্য ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র ও রাডার ব্যবস্থার জরুরি প্রয়োজনের কথা জানান। জোজা বলেন, ইরান যুদ্ধের কারণে সস্তা ইন্টারসেপ্টর অস্ত্রের ঘাটতি আরও তীব্র হয়েছে, যা পশ্চিমাদের জন্য একটি বড় সমস্যা।
কৃষ্ণসাগরে জাহাজে হামলা বেড়ে যাওয়ায় রাশিয়া ও ইউক্রেনের শস্য ও তেল রপ্তানির প্রধান পথটি সংকুচিত হয়ে পড়েছে। অ্যাম্ব্রি অ্যানালিটিকসের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক তোমাস আলেক্সার তথ্যমতে, মে থেকে অক্টোবরের মধ্যে কৃষ্ণসাগর ও আজভ সাগরে উভয় পক্ষ ৩১৭টি বাণিজ্যিক ও অন্যান্য জাহাজে হামলা চালিয়েছে। আগের ছয় মাসে এই সংখ্যা ছিল ৭৪টি, অর্থাৎ হামলা চার গুণের বেশি বেড়েছে। আগামী ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার সর্বাত্মক অভিযানের পঞ্চম বার্ষিকীকে সামনে রেখে হামলার গতি ওঠানামা করছে। অ্যাম্ব্রি জানিয়েছে, বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে ইউক্রেন ১৩৭টি এবং রাশিয়া ৯২টি জাহাজে হামলা চালায়। তবে অক্টোবরে রাশিয়া ৩৮টি এবং ইউক্রেন ৫টি হামলা চালিয়েছে।
বন্দরগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এবং রপ্তানি কমে যাওয়ায় বিকল্প পথ খুঁজতে বাধ্য হচ্ছে রাশিয়া ও ইউক্রেন। রয়টার্সের দেখা রুশ রপ্তানি তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে কৃষ্ণসাগর ও আজভ সাগর দিয়ে রাশিয়া মাত্র ৩ লাখ মেট্রিক টন শস্য রপ্তানি করেছে, যা গত বছরের একই মাসে ছিল ৪৭ লাখ ৪০ হাজার মেট্রিক টন।
অন্যদিকে রুশ হামলার কারণে গত জুলাইয়ের শেষ দিকে কৃষ্ণসাগরের বন্দরগুলোর কার্যক্রম স্থগিত করে ইউক্রেন। এর বদলে দানিউব নদীর বন্দর এবং রোমানিয়ার সুলিনা খাল ও রোমানিয়ার কৃষ্ণসাগর অংশ দিয়ে পণ্য পরিবহন শুরু করে দেশটি। সরকারি তথ্য বলছে, এই বিকল্প পথ ব্যবহার করেও সেপ্টেম্বরে ইউক্রেনের বন্দর দিয়ে শস্য রপ্তানি কমে ৮ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টনে নেমেছে, যা গত বছরের সেপ্টেম্বরে ছিল ২১ লাখ মেট্রিক টন। ইউক্রেনের সাবেক জ্যেষ্ঠ নৌ কর্মকর্তা ও নৌ বিশ্লেষক আন্দ্রি রাইঝেঙ্কো বলেন, ইউক্রেনের রপ্তানি আরও কমিয়ে আনাই রাশিয়ার প্রধান লক্ষ্য, আর দ্বিতীয় লক্ষ্য হলো ন্যাটোকে পরীক্ষা করা।
গত সপ্তাহে বুলগেরিয়ার সোফিয়ায় যখন রোমানিয়া, বুলগেরিয়া ও ন্যাটোভুক্ত আরেক দেশ তুরস্কের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সামরিক প্রধানেরা পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠক করছিলেন, তখনই সর্বশেষ জাহাজডুবির ঘটনাটি ঘটে। সীমিত আকারের নৌ-যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে মস্কো ও কিয়েভের জবাবের অপেক্ষায় থাকা তুরস্কের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওই বৈঠকে নতুন করে হামলা না চালাতে রাশিয়া ও ইউক্রেনকে সতর্ক করেন। মঁত্রে সনদের আওতায় বসফরাস ও দার্দানেলিস প্রণালি দিয়ে যুদ্ধজাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে তুরস্ক।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও শস্যের দাম বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার প্রভাব এড়াতে মিসর, তুরস্ক ও ভারতসহ বেশ কয়েকটি দেশ নৌ-যুদ্ধবিরতির জন্য চাপ দিচ্ছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও শনিবার বলেছেন, সীমিত যুদ্ধবিরতির বিষয়ে আন্তর্জাতিক আগ্রহ বাড়ছে।
তবে সীমিত নৌ-যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে রাশিয়া। মস্কোর দাবি, এতে কিয়েভ স্বস্তি পাওয়ার সুযোগ পাবে। অন্যদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এ নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছেন। গত মাসে তিনি বলেন, ‘সবাই ডিজেল নিয়ে কথা বলছে এবং শস্যের কথা ভুলে যাচ্ছে। এক বা দুই মাসের মধ্যে সবাই কৃষি সংকট নিয়ে কথা বলা শুরু করবে।’





