গত মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা জয় পাওয়ার পর প্রযুক্তি খাতের শেয়ারের এই ধারাবাহিক পতন শুরু হয়। তাদের নির্বাচনি প্রচারের অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল এআই প্রযুক্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ আনা। এই খবরের প্রভাবে বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাজারে প্রযুক্তি সংবেদনশীল নাসড্যাক কম্পোজিট সূচক ৫.৫ শতাংশের বেশি পড়ে যায়। ডাও জোন্সের তথ্য অনুযায়ী, কেবল এই এক সূচকে বাজার মূলধন কমেছে প্রায় ২.৫ ট্রিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালের পর এটি মার্কিন পুঁজিবাজারের জন্য সবচেয়ে খারাপ দিন।
যুক্তরাষ্ট্রের এই ধসের প্রভাব পড়েছে এশিয়ার বাজারেও। শুক্রবার সকালে এআই প্রযুক্তির জন্য চিপ ও যন্ত্রাংশ তৈরি করা প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারের দাম দ্রুত কমতে থাকে। জাপানের নিকেই ২২৫ সূচক ৬.৩ শতাংশ পড়ে যায়। মেমোরি চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান কিওক্সিয়ার শেয়ারের দাম কমেছে প্রায় ১১.৫ শতাংশ এবং টোকিও ইলেকট্রনের কমেছে ৫.৮ শতাংশ।
দক্ষিণ কোরিয়ার চিপ নির্মাতা এসকে হাইনিক্সের শেয়ার ৮.৮ শতাংশের বেশি এবং স্যামসাংয়ের শেয়ার প্রায় ৬ শতাংশ পড়ে গেছে। সিউলের কোসপি সূচক সকালে ৮ শতাংশের বেশি নামলে অতিরিক্ত বিক্রি ঠেকাতে কিছু সময়ের জন্য লেনদেন স্থগিত (সার্কিট ব্রেকার) করা হয়। দিনশেষে সূচকটি ৫ শতাংশ কমে বন্ধ হয়। অন্যদিকে তাইওয়ানের শেয়ারবাজার ২০০১ সালের পর সবচেয়ে বড় সাপ্তাহিক পতনের মুখে পড়ে; শুক্রবার তাদের তাইেক্স সূচক কমেছে ৪.৫ শতাংশ।
মার্কেটওয়াচের চিপ বিশ্লেষক ব্রিটনি এনগুয়েন জানান, এআইয়ের অবকাঠামো খাতে বিপুল বিনিয়োগের কাঙ্ক্ষিত মুনাফা আসবে কি না, তা নিয়ে তৈরি হওয়া অনাস্থাই এই পতনের অন্যতম মূল কারণ। মধ্যবর্তী নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা ডেটা সেন্টার ও এআইয়ের নিয়ন্ত্রহীন বৃদ্ধির গতি কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রচার চালান। মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ ও সেনেটের নিয়ন্ত্রণ এখন ডেমোক্র্যাটদের হাতে চলে যাওয়ায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেয়াদের বাকি সময়ে এই খাতে আইনি কড়াকড়ি আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। টেক্সাসের নবনির্বাচিত ডেমোক্র্যাট গভর্নর জিনা হিনোহোসা নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণ স্থগিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
শেয়ারবাজারের এই পতনের জন্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দায়ী করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লেখেন, ‘নির্বাচনের ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে শেয়ারবাজারে ইতিহাসের অন্যতম খারাপ দিন গেছে। মনে রাখবেন, এটি রিপাবলিকানদের কারণে নয়, হয়েছে ডেমোক্র্যাটদের (ব্যঙ্গ করে ‘ডিউমোক্র্যাটস’) কারণে। তবে ভয় পাবেন না, আমরা শিগগিরই আবার আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বড় ও শক্তিশালী হয়ে উঠব।’ আরেক পোস্টে তিনি ভোটারদের উদ্দেশে লেখেন, ‘আজ বাজারে ধস নেমেছে কারণ ডেমোক্র্যাটদের মঙ্গলবারটা বড় গেছে। এটি দেখে খুব খারাপ লাগছে, কিন্তু এজন্য আপনারা নিজেরাই দায়ী!’
অন্যদিকে ডেমোক্র্যাট সেনেটর বার্নি স্যান্ডার্স এক্সে দেয়া পোস্টে লেখেন, ‘বিগ টেক ধনকুবেরা পরিবেশ ধ্বংস করুক, চাকরি কেড়ে নিক আর মানবজাতির ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে ফেলুক—আমেরিকানরা তা চায় না। জাতীয়ভাবে ডেটা সেন্টার নির্মাণে এখনই স্থগিতাদেশ দিতে হবে।’
বিয়োগকারীদের উদ্বেগের মধ্যে বৃহস্পতিবার চিপ নির্মাতা ও সেমিকন্ডাক্টর খাতের শেয়ারে বড় ধরনের ধস নামে। ইউরোপের বাজারে চিপ নির্মাতা ইনফিনিয়নের শেয়ারের দাম ৮.৫ শতাংশের বেশি এবং এএসএমএলের দাম ৬.৫ শতাংশ কমেছে। নিউ ইয়র্কের বাজারে এনভিডিয়ার শেয়ারের পতন হয়েছে ৯ শতাংশের বেশি, যা তাদের বাজার মূলধন ৪০ হাজার কোটি ডলারের বেশি কমিয়ে দিয়েছে। এ ছাড়া এএমডি ও মাইক্রনের শেয়ার ১৭ শতাংশের বেশি এবং ইন্টেলের ১০.৩ শতাংশ কমেছে। আর মেমোরি কার্ড নির্মাতা স্যানডিস্কের দাম কমেছে ২২ শতাংশের বেশি।
ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স ও টেসলার শেয়ার যথাক্রমে ৮ শতাংশ ও প্রায় ১১ শতাংশ কমেছে, যার ফলে তার প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল্য কমেছে ৩০ হাজার কোটি ডলারের বেশি। রিপাবলিকানদের প্রচারে মাস্ক প্রায় ৪৫ কোটি ডলার খরচ করলেও টেক্সাস সেনেট আসনসহ অনেক জায়গায় তার সমর্থিত প্রার্থীরা হেরেছেন। অ্যাপল, এনভিডিয়া ও টেসলাসহ বৃহৎ সাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের বাজার মূলধন কেবল এক লেনদেন দিনেই ১ ট্রিলিয়ন ডলার কমেছে। সার্বিকভাবে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক ৪.৪ শতাংশ এবং ডাও জোন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজ ৩.৪ শতাংশের বেশি পড়েছে। নাসড্যাক সূচকটি তার সাম্প্রতিক সর্বোচ্চ চূড়া থেকে ১০ শতাংশের বেশি নিচে নেমে গিয়ে সংশোধিত বাজারে প্রবেশ করেছে।
ওয়েলথ ক্লাবের প্রধান বিনিয়োগ কৌশলবিদ সুজানা স্ট্রিটার বলেন, ‘ওয়াল স্ট্রিটে এআই বাণিজ্য নিয়ে নতুন আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। অবকাঠামোতে ঢালা বিপুল অর্থ কাঙ্ক্ষিত মুনাফা আনবে কি না—সেই উদ্বেগের সঙ্গে এখন যোগ হয়েছে ডেটা সেন্টার নির্মাণ থমকে যাওয়ার আশঙ্কা।’ মেটা ও ওপেনএআই-এর প্রতিনিধিরা স্বীকার করেছেন, ডেটা সেন্টারের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ তাদের ভাবনায় ছিল না। এর সঙ্গে অনেক বিনিয়োগকারী আশঙ্কায় আছেন, কৃত্রিম জোয়ার বা ফুলে-ফেঁপে ওঠা বাজারে থাকা এআই খাতের এই দরপতন হয়তো একটি বড় মূল্য সংশোধনের সূচনা।





