যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলে নির্বাচন: বিশ্ব রাজনীতির গতিপথে প্রভাবের শঙ্কা

বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু, ডোনাল্ড ট্রাম্প
উত্তর আমেরিকা
বিদেশে এখন
0

এক সপ্তাহের ব্যবধানে নির্বাচন ঘনিষ্ঠতম দুই মিত্র যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলে। বিশ্ব রাজনীতির কারিগর বলে দুই নির্বাচনের প্রভাবও হবে বৈশ্বিক। চলতি বছরের শুরুতে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের সিদ্ধান্ত বদলে দিয়েছে বিশ্ব অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিকে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ অবস্থায় দু’দেশের ভোটারদের ওপর নির্ভর করছে বিশ্বের ভবিষ্যৎ গতিপথ।

এক মহাসাগর পেরিয়ে দুই মহাদেশের দু’দেশ। মাঝে দূরত্ব ছয় হাজার মাইল হলেও ঘনিষ্ঠতম দুই মিত্র মিলেই কলকাঠি নাড়ায় বিশ্ব রাজনীতির। তাই সাত দিনের ব্যবধানে দেশ দু’টিতে নির্বাচনও দেশের ভেতরে সীমিত নেই। নির্বাচনের ফলের দিকে তাকিয়ে গোটা বিশ্ব।

মঙ্গলবারই সাধারণ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হচ্ছে ইসরাইলে। যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন আগামী মঙ্গলবার। ভোটের মাধ্যমে নতুন পার্লামেন্ট পাবে ইসরাইল, যুক্তরাষ্ট্র পাবে নতুন কংগ্রেস। দু’দেশে নিজেদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করবেন প্রায় ২২ কোটি ভোটার। শুধু কাছাকাছি সময়ে বলে নয়, রাজনৈতিকভাবে দুই দেশ প্রায় অবিচ্ছেদ্য বলেও দুই নির্বাচনের প্রভাব বৈশ্বিক।

বহুমুখী সংঘাতে জর্জরিত মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে ইসরাইলের ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থার ওপর। আর যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনি মানচিত্রে যেকোনো পরিবর্তন শুধু যুদ্ধেই নয়, প্রভাব ফেলতে সক্ষম বিশ্ব অর্থনীতিতেও। এছাড়া দুই নির্বাচন সরাসরি যুক্ত- উভয় নির্বাচনে ভোট দিতে সক্ষম আমেরিকান পাসপোর্টধারী পাঁচ লাখ ইসরাইলির কারণেও, তথ্য লবি গ্রুপ পাবলিকানস ওভারসিজ ইসরিইলের।

নীতিগত যোগসূত্র আরও গভীর- ইরান যুদ্ধের ক্ষেত্রে যা সবচেয়ে প্রকট। নির্বাচনের পর ইরানে নতুন করে আগ্রাসন শুরুর পরিকল্পনা আছে দু’দেশের, আগে থেকেই আভাস মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহুর।

আরও পড়ুন:

ইউনিভার্সিটি অব ভার্জিনিয়ার রাজনীতি ও জননীতির অধ্যাপক জেনিফার ললেস বলেন, ‘সাত মাস হয়ে গেছে। মানুষ এখনও জানে না যে আমরা কেন এ যুদ্ধে জড়িয়েছি। জয়ী হওয়া দেখতে কেমন হয়, তা তারা জানে না। আর যুদ্ধের লক্ষ্যটাও যেন অনবরত বদলাচ্ছে।’

জ্বালানির দাম আরও বাড়লে ভোটে প্রভাব পড়ার আশঙ্কায় নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহুকে ইরানে হামলা থেকে ট্রাম্পই বিরত রেখেছেন বলে ভিন্নমতও আছে। শুধু অভ্যন্তরীণই নয়, বিশ্ব অর্থনীতিকে কেন্দ্র করেও এক অক্ষে ঘুরছে দুই নির্বাচন। যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচারে মার্কিন ভোটারদের ক্রয়ক্ষমতা আর জীবনযাত্রার ব্যয় প্রাধান্য পাচ্ছে। ইরানে হরমুজ প্রণালী হয়ে জ্বালানি প্রবাহে বিঘ্ন এবং বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি বেড়ে চলার জন্য ট্রাম্পের আগ্রাসী নীতিকেই দায়ী করছেন বিশ্লেষকরা।

মিশিগান-ডিয়ারবর্ন ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক হুলিও বোর্কুইজ বলেন, ‘প্রায় সবকিছুর দামই বেড়ে গেছে, এবং এই সবকিছুই ঘটেছে ট্রাম্পের শাসনামলে। তাই না? আর বেশিরভাগ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মধ্যবর্তী নির্বাচনকে যেভাবে দেখেন, তা হলো এটি রাষ্ট্রপতির কর্মকাণ্ডের ওপর একটি গণভোট। এটি ভোটারদের জন্য বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তাদের সন্তুষ্টি বা অসন্তোষ প্রকাশ করার একটি সুযোগ।’

ইসরাইলের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু। ইসরাইলে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামীদের ৭ অক্টোবরের প্রাণঘাতী হামলায় ভাবমূর্তি সংকটে পড়েন তিনি। ক্ষমতা হারালে তাকে হামলার আগের কর্মকাণ্ডের জন্য আনুষ্ঠানিক তদন্ত ও দুর্নীতির অভিযোগে নতুন আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে। এতে ইতি ঘটতে পারে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের। তাই নিজের সুনাম পুনরুদ্ধারেও ৭ অক্টোবরের হামলার মদদদাতা হিসেবে ইরানে ফের হামলা শুরু করাও নেতানিয়াহুর নির্বাচনি প্রচারণার অংশ। ট্রাম্পের সমর্থনে ইরানে ফের হামলার জল্পনা তীব্র হলেও নিজ দেশে সমর্থন কমছে নেতানিয়াহুর।

আরও পড়ুন:

ইসরাইলের রাজনৈতিক বিশ্লেষক আমোৎজ আসা-এল বলেন, ‘আমরা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের গোধূলি লগ্নে আছি। অর্থাৎ এর পরে তার আরেকটি কর্মজীবন শুরু হতে পারে, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে মনে হচ্ছে যে এটাই তার কর্মজীবনের ইতি।’

ইসরাইলের হারেৎজের জ্যেষ্ঠ সম্পাদক এমি লেভিনসন বলেন, ‘আমরা প্রার্থনা করছি এবং আশা করছি যে আগামীকাল পরিস্থিতি পাল্টে যাবে। আমরা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে হওয়া ভয়াবহ ক্ষতির মেরামত এবং ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে সহাবস্থানে লক্ষ্যে আপোস চাই আমরা। গাজায় যা ঘটছে তা অকল্পনীয়, অবিশ্বাস্য। আমার মনে হয়, সারা বিশ্ব আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে এবং আগামীকাল কী ঘটবে- তা জানার অপেক্ষায় আছে।’

নেতানিয়াহু হেরে গেলে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী-মার্কিন প্রেসিডেন্টের আলোচিত রাজনৈতিক মিত্রতার অবসান ঘটবে বলেও মনে করছেন অনেকে। নতুন ইসরাইলি নেতার সাথে বিদায়ী রিপাবলিকান মার্কিন প্রেসিডেন্টের সম্পর্কের প্রেক্ষাপট হবে ভিন্ন। মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেলে ইসরাইলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নির্বিচার সমর্থনে লাগাম বসতে পারে; কমতে পারে ইসরাইলের প্রতি সামরিক সহায়তাও। এরই মধ্যে ইরান যুদ্ধের পাশাপাশি অবরুদ্ধ গাজা ও অধিকৃত পশ্চিম তীরসহ ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে সামরিক অভিযানের কারণেও ইসরাইলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যবাহী দ্বি-দলীয় সমর্থন তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।

এসএস