আকতার হোসেন, গাজীপুর থেকে প্রায়ই আসেন ঢাকার শ্রম আদালতে; বয়স ৬০ এর কাছাকাছি। মামলার ঘানি টানতে তিনি ক্লান্ত-বিষন্ন, চোখে মুখে হতাশার ছাপ স্পষ্ট। বিদেশি প্রতিষ্ঠান শেভরন থেকে চাকরিচ্যুত হয়েছেন ২০১৫ সালে। এরপর পাওনা আদায়ে দ্বারস্থ হয়েছেন শ্রম আদালতে। এক যুগ ধরে চলছে মামলা, মিলছে না সুরাহা।
আকতার হোসেন বলেন, ‘আমি ১১ বছর চাকরি করছি। এ দেশের মানুষ হয়ে, আমার কষ্টে দিন কাটাতে হয়। তাদের নিয়োগকৃত যারা আছে, তারা আরাম আয়েশ করে চলে আমাদের টাকায়।’
আকতার হোসেনের মতো শেভরনের ৩০০ কর্মীর মামলা চলছে ঢাকার শ্রম আদালতে। কোম্পানি বার বার সময় নেয়ায় শেষ হচ্ছে না মামলা। বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকা আসা যাওয়া, নতুন করে চাকরি না পাওয়া। জীবন সংসারে হেরে অনেকটা অমানবিক জীবন-যাপন করছেন তারা, আর কণ্ঠে হতাশা।
ওয়ারেসুল রহমান একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করতেন। হঠাৎ করে কোনো নোটিশ ছাড়াই তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। কোম্পানির কাছে পাওনা অর্থ আদায়ে মামলা করেন শ্রম আদালতে। চার বছর ধরে চলছে মামলা। কবে নিষ্পত্তি হবে তাও জানেন না ভুক্তভোগী ব্যক্তি। মালিকপক্ষ প্রতি শুনানিতে নিচ্ছে সময়।
ওয়ারেসুল রহমান বলেন, ‘প্রত্যেকটি নথি জমা দেয়া আছে। এখানে এত সময় লাগার কথা নয়। এখানে এক দিন, এক মাস, দুই মাস— ২ থেকে ৪টি সিটিংয়ে এটা হওয়ার কথা।’
এরকম হাজার শ্রমিকের কষ্ট ও অসহায়ত্বের গল্প গেঁথে আছে ঢাকার শ্রম আদালতে। শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করে এমন একটি বিদেশি সংস্থার প্রতিনিধি সুলতান মাহমুদ ১৫ বছর ধরে শ্রম আদালতে আইনি সহায়তা দিচ্ছেন, তার অভিজ্ঞতাতেও হতাশা।
আরও পড়ুন:
সুলতান মাহমুদ বলেন, ‘মামলা ফাইলিং যেদিন হয়, সেদিন থেকে মামলার তারিখই পড়ে যায় ৩ থেকে ৪ মাস পর। পরে মালিক উপস্থিত হয়, জবাব দিতে আরও কিছু সময় লাগে। এতে দীর্ঘসূত্রিতা তৈরি হয়ে যায়।’
চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের ১৩টি শ্রম আদালত ও শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালে ৩১ হাজার ২০টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকার ১ম শ্রম আদালতে ৪ হাজার ৮৭৭টি, দ্বিতীয় শ্রম আদালতে ৬ হাজার ৯৯৮, তৃতীয় শ্রম আদালতে ৩ হাজার ২৭৩টি মামলা রয়েছে। ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম শ্রম আদালতে রয়েছে ৮৮৫টি, নারায়ণগঞ্জে ২ হাজার ৭৪৫ আর গাজীপুরের আদালতে রয়েছে ৭ হাজার ২৯৩ টি মামলা। এছাড়া শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন ২ হাজার ২৩১টি মামলা।
আইনজীবীরা বলছেন, দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি হলে শ্রমিকদের হয়রানি বন্ধ হবে। এক আইনজীবী জানান, বিবাদী পক্ষে থাকলে আইনজীবীরা চাইলে মামলার শুরুতেই দেড় বছর কাটিয়ে দিতে পারেন। এছাড়া আরেক আইনজীবীর মতে, মামলা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে আইনী কোনো বাঁধা নেই। ঢাকায় আরও কোর্ট বাড়ানো দরকার বলেও মত তার।
শ্রম আদালত আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ মহসীন মজুমদার মামলা নিষ্পত্তি দ্রুত করার জন্য আদালতের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, ‘কিছু জায়গায় আদালত করা হয়েছে, যেখানে আসলে মামলার সংখ্যা খুব একটা নেই। যেসব জায়গায় মামলার সংখ্যা বেশি, সেসব জায়গায় নতুন আরও কিছু আদালত স্থাপন করা যায় কি না! এটা করলে বিচারপ্রার্থীরা আরও দ্রুত ন্যায় বিচার পাবেন বলে আমি আশা করি।’
কাগজে-কলমে শ্রম আদালতে আইনী প্রতিকারের পথ খোলা থাকলেও, শ্রমিকরা নানা কারণে মামলার প্রতিকার পাচ্ছেন খুবই কম। এই মুহূর্তে শ্রম আদালতে মামলা রয়েছে ৩০ হাজারেরও বেশি, তবে নিষ্পত্তির হার অর্ধেকেরও কম। মালিকপক্ষের রায় বাস্তবায়নে গড়িমসি করা এবং প্রশাসনিক নানা জটিলতার কারণে শ্রমিকরা তাদের কাঙ্ক্ষিত বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।





