হেরোইন তৈরির কাঁচামাল বিক্রির বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভিযান

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভিযান
অপরাধ
দেশে এখন
0

হেরোইন তৈরির কাঁচামাল বিক্রির বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের গতানুগতিক অভিযান পরিচালনা করে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় অধিদপ্তরের গোয়েন্দা ইউনিট মাদক তৈরির কাজে ব্যবহৃত নিয়ন্ত্রিত রাসায়নিক পদার্থের অবৈধ ব্যবহার ও অননুমোদিত সরবরাহ প্রতিরোধে নজরদারি শুরু করেছে।

এই কার্যক্রমের অংশ হিসেবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা দল সম্প্রতি সাইবার পেট্রোলিং পরিচালনা করার সময় অনলাইনে নিয়ন্ত্রিত রাসায়নিক পদার্থের খুচরা বিক্রয় সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পায়।

সাইবার পেট্রোলিংয়ের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য যাচাই করতে গিয়ে দেখা যায়, ই-কেম নামীয় একটি প্রতিষ্ঠান তাদের অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক পদার্থ বিক্রির বিজ্ঞাপন দিচ্ছে এবং অর্ডার গ্রহণ করছে।

মামলার তদন্তের সূত্র ধরে দেখা যায়, খোলাবাজার থেকে বিভিন্ন ধরনের কাঁচামাল সংগ্রহ করে অবৈধ মাদক তৈরির প্রস্তুতি নেয়ার সম্ভাব্য কার্যক্রমে এসব নিয়ন্ত্রিত রাসায়নিকের সরবরাহের বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন।

গোয়েন্দা তথ্যর ভিত্তিতে দেখা যায়, মাদক তৈরিতে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে এমন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কনট্রোলড কেমিক্যাল সাধারণ অনলাইন ক্রয়-বিক্রয়ের পদ্ধতিতে সরবরাহের জন্য তালিকাভুক্ত রয়েছে।

গোয়েন্দা তথ্য যাচাইয়ের অংশ হিসেবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে ই-কেমের অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ৫০০ মিলিলিটার এসিটিক এ্যানহাইড্রাইড অর্ডার করা হয়, যা মরফিন থেকে হেরোইন উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত হতে পারে।

অর্ডার গ্রহণের ক্ষেত্রে ক্রেতার কাছ থেকে কনট্রোলড কেমিক্যাল ক্রয়ের প্রয়োজনীয় অনুমোদন, লাইসেন্স বা ব্যবহারের উদ্দেশ্য সংক্রান্ত কোনো নথি চাওয়া হয়নি। অর্ডার গ্রহণের পর প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে পণ্য সরবরাহের উদ্যোগ নেয়া হয়।

পরবর্তীতে পণ্যটি ঢাকার নিকেতন এলাকায় পৌঁছালে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের গোয়েন্দা দল সেখানে অভিযান পরিচালনা করে।

অভিযানে এসিটিক এ্যানহাইড্রাইড ও মাদক তৈরির অন্যান্য কাঁচামাল জব্দ করা হয়। গুলশান থানাধীন নিকেতন এলাকায় ই-কেমের সরবরাহকৃত পার্সেল থেকে ৫০০ মিলিলিটার এসিটিক এ্যানহাইড্রাইড এবং ১ লিটার এসিটোন জব্দ করা হয়।

ডেলিভারিম্যানকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, ই-কেমের কার্যালয় কুড়িল প্রগতি সরণী এলাকায় অবস্থিত। তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের গোয়েন্দা দল পরবর্তীতে ওই কার্যালয়ে অভিযান পরিচালনা করে।

আরও পড়ুন:

সেখানে প্রতিষ্ঠানের আইটি ম্যানেজার মো. আব্দুল মোমিন পাটোয়ারীকে আটক করা হয়। তার প্রতিষ্ঠানে অভিযানে অভিযানে সর্বমোট ৬ লিটার রাসায়নিক পদার্থ ও কোনরূপ যাচাই-বাছাই ব্যতিরেকে আরও কিছু নিয়ন্ত্রিত প্রিকারসর কেমিক্যাল বিক্রির কাগজপত্র জব্দ করা হয়।

অভিযানে সর্বমোট ৬ লিটার রাসায়নিক পদার্থ জব্দ করা হয় এবং মো. আব্দুল মোমিন পাটোয়ারীকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানের মালিকসহ আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে কয়েকজন পলাতক রয়েছে।

প্রিকারসর কেমিক্যালের আইনি গুরুত্ব

প্রিকারসর কেমিক্যাল মূলত এমন রাসায়নিক পদার্থ, যেগুলোর বৈধ শিল্প ও বাণিজ্যিক ব্যবহার রয়েছে; কিন্তু একই সঙ্গে এগুলো অবৈধ মাদকদ্রব্য উৎপাদন বা প্রক্রিয়াজাতকরণে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর ধারা ২-এর উপধারা (১৯) অনুযায়ী, প্রিকারসর কেমিক্যাল বলতে এমন রাসায়নিক পদার্থকে বোঝানো হয়েছে, যা ক অথবা খ শ্রেণির কোনো মাদকদ্রব্য উৎপাদন অথবা প্রক্রিয়াজাতকরণে অত্যাবশ্যকীয় উপাদান অথবা উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। একই আইনের তফসিলের ক শ্রেণির ৮ নম্বর ক্রমিকে প্রিকারসর কেমিক্যালের তালিকা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

এসব রাসায়নিককে কেবল সাধারণ রাসায়নিক পণ্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একই রাসায়নিক বৈধ শিল্পে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল হতে পারে, আবার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে অবৈধ মাদক তৈরির গুরুত্বপূর্ণ উপকরণে পরিণত হতে পারে।

আন্তর্জাতিক ও জাতীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা

প্রিকারসর কেমিক্যাল নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি শুধু বাংলাদেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কার্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অবৈধ মাদক উৎপাদনে ব্যবহৃত রাসায়নিকের বৈধ বাণিজ্যিক উৎস থেকে বিচ্যুতি ঠেকাতে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও ব্যবস্থা রয়েছে।

জাতিসংঘের মাদকদ্রব্য ও অপরাধবিষয়ক কার্যালয় এবং আন্তর্জাতিক মাদক নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রিকারসর কেমিক্যালের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সরবরাহের ওপর নজরদারি, তথ্য বিনিময় এবং সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্তকরণের ব্যবস্থা রয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো বৈধ সাপ্লাই চেইনের আড়ালে এসব রাসায়নিক যেন অবৈধ মাদক মাদক তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার না করা যায়।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এখন জব্দকৃত রাসায়নিক, উদ্ধারকৃত নথিপত্র এবং অন্যান্য আলামত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। একই সঙ্গে তদন্তে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে অনলাইন প্লাটফর্মে এসব রাসায়নিকের উৎস, সরবরাহ ব্যবস্থা, ক্রেতা এবং সম্ভাব্য ব্যবহার শনাক্ত করার বিষয়ে।

এফএস