৮ ঘণ্টার ব্যাটারি স্টোরেজ সুবিধাসহ রামপাল সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের অনুমোদন: পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী

জোনায়েদ সাকি
দেশে এখন
1

নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে স্টোরেজ ব্যবস্থা জোরদারে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার আট ঘণ্টার ব্যাটারি স্টোরেজ সুবিধাসহ বাগেরহাটের রামপালে ৪৪২ মেগাওয়াট পিক ক্ষমতার একটি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে বলে জানিয়েছেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি।

আজ (বুধবার, ৭ অক্টোবর) একনেক সভা শেষে আয়োজিত ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা জানান।

পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার আলোকে, আট ঘণ্টার ব্যাটারি স্টোরেজ সুবিধা অন্তর্ভুক্ত করার জন্য প্রকল্পটির উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) সংশোধন করা হবে। মূল প্রকল্প প্রস্তাবে এ ধরনের ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা ছিল না এবং উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরাসরি জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের পরিকল্পনা ছিল।’

তিনি জানান, মূল প্রস্তাবে একটি সম্পূরক ব্যবস্থার আওতায় চার ঘণ্টার ব্যাটারি স্টোরেজের পরিকল্পনা ছিল। তবে একনেক বৈঠকে কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, যেন আলাদা কোনো সম্পূরক প্রকল্প না নিয়ে মূল ডিপিপিতেই আট ঘণ্টার স্টোরেজ সুবিধা অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

জোনায়েদ সাকি বলেন, ‘বর্ধিত ব্যাটারি স্টোরেজ সুবিধা অন্তর্ভুক্ত করার ফলে প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। কর্তৃপক্ষ প্রাথমিকভাবে ব্যাটারি স্টোরেজ ছাড়া সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় নির্ধারণ করেছিল। তবে আট ঘণ্টার স্টোরেজ সুবিধার জন্য সংশোধিত ব্যয় হিসাব এখনো চূড়ান্ত করা হয়নি। পুনরায় হিসাব করার পরই চূড়ান্ত ইউনিটপ্রতি খরচ নির্ধারণ করা হবে, কারণ ব্যাটারি স্টোরেজ ক্ষমতা এখন আট ঘণ্টায় উন্নীত করা হয়েছে।’

আরও পড়ুন:

তিনি বলেন, ‘অতিরিক্ত স্টোরেজ ব্যবস্থার ফলে প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় বাড়লেও তা অধিকতর সুবিধা বয়ে আনবে। এর মাধ্যমে সিস্টেমটি বিদ্যুৎ সংরক্ষণ করতে পারবে এবং প্রয়োজনে এমনকি রাতের বেলাতেও তা সরবরাহ করতে সক্ষম হবে।’

প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণের জন্য নির্ধারিত জমিতে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। বর্তমান রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট। পরিকল্পিত দ্বিতীয় ইউনিটের কাজ এগোয়নি। ফলে উন্নয়নের জন্য প্রস্তুত করা বিপুল পরিমাণ জমি অব্যবহৃত রয়েছে।’

ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, সংশ্লিষ্ট এলাকায় বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) এরইমধ্যে প্রায় ৬৮৫ একর জমি ভরাট করেছে। সরকার এখন সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য প্রস্তুত করা ওই জমি ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে সরকার ওই এলাকায় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

তিনি বলেন, ‘প্রস্তাবিত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য এরইমধ্যে প্রস্তুত করা জমি ব্যবহার করা যাবে বলে নতুন করে কোনো স্থান প্রয়োজন হবে না। রামপাল সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিবেশগত মূল্যায়ন ও ছাড়পত্রের প্রক্রিয়া এখনো চলমান রয়েছে।’

আরও পড়ুন:

দেশের পরিবেশগত শ্রেণিবিন্যাস ব্যবস্থার আওতায় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পটিকে একটি ‘সবুজ’ প্রকল্প হিসেবে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘পরিবেশের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবের ভিত্তিতে বাংলাদেশ বিভিন্ন প্রকল্পকে লাল, হলুদ ও সবুজ—এই তিন শ্রেণিতে ভাগ করে থাকে। সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো ‘সবুজ’ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত।

তিনি বলেন, ‘ডিপিপি প্রণয়নের পর্যায়ে পরিবেশগত বিষয়সহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে আরও গুরুত্ব দেয়ার জন্য সরকার নতুন একটি নীতিকাঠামো প্রণয়নের কাজও করছে। প্রস্তাবিত কাঠামোর আওতায় প্রকল্প প্রণয়নের সময় প্রায় ১০ থেকে ১২টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনা করতে হবে এবং এসব বিষয়ে পৃথক প্রতিবেদন ডিপিপিতে সংযুক্ত করতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘নতুন নীতিমালার আওতায় পরিবেশগত বিষয়গুলো অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক হিসেবে বিবেচিত হবে।’

প্রতিমন্ত্রী আজকের একনেক সভায় অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন নির্দেশনা ও পর্যবেক্ষণের কথাও জানান।

আরও পড়ুন:

সাকি বলেন, ‘কয়েকটি প্রকল্প নির্দিষ্ট কিছু পর্যবেক্ষণ বাস্তবায়নের শর্তে নীতিগত অনুমোদন পেয়েছে। বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোকে প্রস্তাব সংশোধন করে আবার একনেকে উপস্থাপন করতে হবে।’

অবকাঠামোর গুণগত মান ও স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ সাধারণ নির্দেশনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার তিন বছরের মধ্যে সড়ক বা অন্য কোনো অবকাঠামোয় বড় ধরনের ত্রুটি দেখা দিলে ঠিকাদারকে তা মেরামত করতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই শর্ত কার্যকর করার লক্ষ্যে সরকার চুক্তিনামায় যথাযথ গ্যারান্টি ও ওয়ারেন্টি সংক্রান্ত ধারা যুক্ত করবে। নির্মাণের তিন বছরের মধ্যে কোনো বড় ধরনের ত্রুটি দেখা দিলে ঠিকাদারদেরই সেই রাস্তা বা অবকাঠামো মেরামত করতে হবে।’

জনবসতিপূর্ণ এলাকার মধ্য দিয়ে যাওয়া সড়কগুলোতে ড্রেনেজ ব্যবস্থাও বাধ্যতামূলক করা হবে।

জোনায়েদ সাকি বলেন, ‘পানি নিষ্কাশনের দুর্বল ব্যবস্থা গ্রামীণ সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। কারণ জমে থাকা বৃষ্টির পানি সড়কের পৃষ্ঠ নষ্ট করে দেয়। জনবসতিপূর্ণ এলাকার সড়ক প্রকল্পে ড্রেনেজ ব্যবস্থা থাকতে হবে এবং পর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ছাড়া ভবিষ্যতে কোনো সড়ক পরিকল্পনা করা হবে না।’

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নতুন অন্তর্ভুক্ত পাঁচটি এলাকার ১৮টি ওয়ার্ডের সড়ক অবকাঠামো ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নয়ন প্রকল্পের বিষয়ে একনেক দু’বছরের মধ্যে একটি পয়ঃশোধনাগার (এসটিপি) যুক্ত করার নির্দেশনা দিয়েছে।

তিনি বলেন, ‘প্রকল্পের সঙ্গে এসটিপি ও সংযোগকারী পয়ঃনিষ্কাশন নেটওয়ার্ক সমন্বিতভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যাতে অপরিশোধিত বর্জ্যপানি নদীতে গিয়ে না পড়ে। সরকার ঢাকা দক্ষিণ, গাজীপুর ও রংপুর সিটি করপোরেশনের জন্য কয়েকটি প্রকল্প অনুমোদন করেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এসব প্রকল্পের সঙ্গে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের কোনো সম্পর্ক নেই। এসব প্রকল্পের প্রস্তুতির কাজ অনেক আগে শুরু হয়েছিল। সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও ডিপিপি প্রস্তুত করতে যথেষ্ট সময় লাগে। নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরুর অনেক আগেই গত ১৮ মে প্রস্তাবগুলো সরকারের “গ্রিন পেজে” অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল।’

আরও পড়ুন:

রংপুর সিটি করপোরেশনের বিষয়ে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘একটি প্রকল্পের মাধ্যমে নতুন অন্তর্ভুক্ত এলাকাগুলোর অবকাঠামো উন্নয়ন করা হবে। এসব এলাকায় সড়ক, ড্রেনেজ ও অন্যান্য মৌলিক সুবিধার ঘাটতি রয়েছে। অন্য একটি প্রকল্পের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যমান সড়কগুলো পুনর্বাসন করা হবে।’

একনেক রংপুরের এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে রংপুর জেলার জন্য প্রস্তুত করা মাস্টারপ্ল্যান এবং সিটি করপোরেশনের মাস্টারপ্ল্যানের সঙ্গে সমন্বয় করার নির্দেশ দিয়েছে।

সভায় বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর পর্যাপ্ত নিজস্ব জনবল থাকলে, বিশেষ করে সেক্ষেত্রে, পরামর্শক খাতে ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে।

সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও নওগাঁ জেলার গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় যানবাহন কেনার একটি প্রস্তাব সরকার কর্তৃক যানবাহন কেনার ওপর সাধারণ বিধিনিষেধের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাতিল করা হয়েছে।

পঞ্চগড় শহরের চারপাশে বাইপাস সড়ক নির্মাণ-সংক্রান্ত একটি প্রকল্পের ক্ষেত্রে সরকার সংশোধিত অর্থবছর ভিত্তিক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রকল্পের বাস্তবায়ন সময়সূচি নির্ধারণের নির্দেশ দিয়েছে।

জোনায়েদ সাকি বলেন, ‘প্রকল্পের গুণগত মান, পরিবেশগত বিধিবিধান পরিপালন, যথাযথ ড্রেনেজ ব্যবস্থা, আর্থিক শৃঙ্খলা এবং সংশ্লিষ্ট মাস্টারপ্ল্যানের সঙ্গে সমন্বয় নিশ্চিত করতে সরকার ভবিষ্যতেও প্রকল্পের সঙ্গে সুনির্দিষ্ট শর্ত যুক্ত করবে।’

এসএস