গতকাল (বুধবার, ১০ জুন) রাত সাড়ে ৭টার দিকে ভৈরব পৌর শহরের কমলপুর এলাকার যুবকদের সঙ্গে দুর্জয়মোড় সংলগ্ন এলাকার যুবকদের এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্রথমে উভয় পক্ষের মধ্যে বাকবিতণ্ডা শুরু হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তা ভয়াবহ সংঘর্ষে রূপ নেয়। দা, বল্লম, রড, লাঠিসোঁটা ও অন্যান্য দেশিয় অস্ত্র নিয়ে দুই পক্ষ মুখোমুখি অবস্থান নেয়। সংঘর্ষের সময় চারদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং সাধারণ মানুষ জীবন বাঁচাতে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটতে থাকে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গততিন দিন আগে কমলপুর এলাকার একটি মাইক্রোবাসের চালক আরমানের সঙ্গে দুর্জয়মোড় এলাকার কয়েকজন যুবকের ভাড়া নিয়ে বাকবিতণ্ডা ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর স্থানীয়ভাবে বিষয়টি মীমাংসার উদ্যোগ নেয়া হলেও উভয় পক্ষের মধ্যে ক্ষোভ ও উত্তেজনা থেকেই যায়। কয়েক দফা সালিশ বৈঠক হলেও সেখানে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের ঘটনা ঘটে। সেই বিরোধের জের ধরেই বুধবার পরিস্থিতি নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বুধবার বিকেল থেকেই দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। অভিযোগ রয়েছে, বিকেলের দিকে দুর্জয়মোড় এলাকার একদল যুবক কমলপুর এলাকার মাইক্রোস্ট্যান্ড এবং আশপাশের কয়েকটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা চালায়। এ ঘটনার পর পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সম্ভাব্য হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের আশঙ্কায় অনেক ব্যবসায়ী আগেভাগেই দোকানপাট বন্ধ করে নিরাপদ স্থানে সরে যান।
সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি ও সচেতন মহল একাধিকবার উভয় পক্ষকে শান্ত করার চেষ্টা চালালেও তা ব্যর্থ হয়। শেষ পর্যন্ত রাত সাড়ে ৭টার দিকে দুই পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষ চলাকালে কমলপুর ও দুর্জয়মোড় এলাকার সড়কের দুই পাশে থাকা অর্ধশতাধিক দোকানপাট ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়া দু’টি যাত্রীবাহী বাসও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ব্যবসায়ীরা জানান, সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পর তারা দোকান ফেলে প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে যান। পরে ফিরে এসে দেখেন অনেক দোকানের শাটার ভাঙা, মালামাল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে এবং নগদ অর্থ ও মূল্যবান সামগ্রী লুট হয়ে গেছে।
ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং দ্রুত ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নিরূপণ করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন।
সংঘর্ষের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সড়কপথ ঢাকা–সিলেট মহাসড়কে। সংঘর্ষকারীরা মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে অবস্থান নিয়ে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চালালে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। এতে সড়কের দুই পাশে কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। শত শত বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, পণ্যবাহী যানবাহন ও ব্যক্তিগত গাড়ি আটকা পড়ে।
ঢাকাগামী যাত্রী আমিন হোসেন বলেন, ‘আমরা ঢাকার উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলাম। ভৈরব এলাকায় এসে দেখি পুরো রাস্তা বন্ধ। চারপাশে মানুষ দা–বল্লম নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করছে। ছোট শিশু ও নারী যাত্রীরা ভয়ে কাঁদছিলো। আমরা গাড়ির ভেতরেই বসে ছিলাম। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি আগে কখনও দেখিনি।’
আরও পড়ুন:
আরেক যাত্রী সালিম জানান, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাসে বসে থেকেও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। তাদের সঙ্গে ছোট বাচ্চা ছিলো। সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তির কথা কেউ ভাবেনি।
পরিবহন শ্রমিক রবিউল হুসাইন বলেন, ‘মহাসড়ক বন্ধ থাকায় সব গাড়ি এক জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিল। যাত্রীরা ক্ষুব্ধ ও আতঙ্কিত ছিলেন। আমরাও অসহায় অবস্থায় ছিলাম।’
এদিকে সংঘর্ষের খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালায়। তবে বিপুল সংখ্যক সংঘর্ষকারী এবং দেশীয় অস্ত্রের ব্যবহার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে ভৈরব থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আতাউর রহমান আকন্দসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন। পরে অতিরিক্ত পুলিশ, দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণ ইউনিট ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে মোতায়েন হলে ধীরে ধীরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সংঘর্ষে পুলিশ সদস্যসহ অন্তত অর্ধশতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। আহতদের ভৈরব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিক এবং আশপাশের হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্যত্র পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
ঘটনার পর পুরো এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। নতুন করে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে কমলপুর, দুর্জয়মোড়সহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি সব দিকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল জোরদার করা হয়েছে।
এ বিষয়ে ভৈরব থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আতাউর রহমান আকন্দ বলেন, ‘মাইক্রোস্ট্যান্ডে ভাড়া নিয়ে দুই গ্রুপের মধ্যে প্রথমে বিরোধ সৃষ্টি হয়। বিকেলে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। কিন্তু রাত সাড়ে ৭টার দিকে উভয় পক্ষ দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আবারও সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এতে মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। জড়িতদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রাখা হয়েছে।’
স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়া হলে এ ঘটনার জেরে আবারও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই তারা স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ কামনা করেছেন।





