পুরোপুরি চালের গোডাউন। অথচ নিয়মিত শিল্পচর্চার তথ্য দিয়ে নেয়া হয়েছে ৫৯ হাজার টাকার অনুদান। এ তালিকায় লোককথা শিল্পীগোষ্ঠীর ঠিকানা কুষ্টিয়া পৌর মার্কেটের দ্বিতীয় তলা। সেখানে খুঁজেও মেলেনি প্রতিষ্ঠানটির। এ বিষয়ে কথা বলতে চাইলে ক্যামেরায় সংগঠন প্রধানদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সংগঠনের একজন মুঠোফোনে বলেন, ‘আমি তো সবসময় গান-বাজনা নিয়ে থাকি, ওখানে গান হয় ভাই। আমি, আমার ওখানে তো প্র্যাকটিস করি আমরা, বুঝছেন। হ্যাঁ, আর ইয়ে তো একটু গন্ধ লাগে বলে ইদানিং আমি একটু বাইরে প্র্যাকটিস করতেছি।’
স্থানীয়দের মধ্যে একজন বলেন, ‘এই লাইনে যা দোকান আছে সব গোডাউন। মানে চালের গোডাউন হোক, জালের গোডাউন হোক, আর আছে কি কোনো সুতা-বুতাম-টুতাম, লেস-টেস অনেককিছু যাবতীয় জিনিস আছে।’
সাড়ে ৩৬ হাজার টাকা অনুদান পাওয়া ফুলকুঁড়ি আসর, যার ঠিকানা শহরের কদমতলা মোড়ের হাউজিং বি ব্লকে। পুরো এলাকা ঘুরেও মেলেনি এর কার্যালয়। একই চিত্র শহরের আমলাপাড়ার অনন্যা ৭৯ নাট্যদল সংগঠনটির। বাস্তবে ফার্নিচারের দোকান, অথচ অফিস দেখিয়ে নেয়া হয়েছে অনুদান।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে কুষ্টিয়ার ৩০টি প্রতিষ্ঠানকে ১৩ লাখ ২৯ হাজার টাকা অনুদান দিয়েছে মন্ত্রণালয়। অনুসন্ধানে বেশিরভাগের ঠিকানা ভূয়া, সাইনবোর্ড বা দৃশ্যমান কার্যক্রম চোখে পড়েনি। সাংস্কৃতিক কর্মীদের অভিযোগ, এতে বঞ্চিত হয়েছে প্রকৃত সংগঠন। ব্যাহত হচ্ছে সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশ। তাই বাস্তব অস্তিত্ব যাচাই করে অনুদান দেয়ার দাবি তাদের।
কুষ্টিয়ার সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের মধ্যে একজন বলেন, ‘সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আমি ওইভাবে সমালোচনা করবো না। তবে এটা ঠিক যে, অনেক সংগঠনেরই শুধু নামেমাত্র একজন বা দুইজন, একজন সভাপতি নাম দেন, একজন সেক্রেটারির নাম দিয়েই অনুষ্ঠান তো নাই সেরকম, তাদের ঘরও নাই, এই মানুষগুলো এই অনুদানগুলো পেয়ে থাকছে।’
আরও পড়ুন:
অন্য একজন বলেন, ‘বিগত প্রায় ১৭ বছর যাবৎ আসলে এটা রাজনৈতিক বিবেচনায় বিভিন্ন সংগঠনকে অনুদান দিয়েছে। সেসময় এই অনুদানের একটা অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে, অনুদানের পরে সেই অনুদানটা সে কি কাজে লাগালো তার একটা প্রতিবেদন জমা দেয়া লাগে। কিন্তু দীর্ঘদিন যাবৎ এই প্রতিবেদনগুলো নেয়া হয় না।’
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আলমআরা জুঁই বলেন, ‘সংস্কৃতির মঞ্চ হোক যোগ্যতা, নিরপেক্ষতা এবং যেটাকে কি বলা যায় যে, দীর্ঘদিনের সাধনার পরিশ্রমের মূল্যায়নকে মূল্যায়ন করা। দীর্ঘদিন যারা সংস্কৃতি চর্চার সঙ্গে আছেন যে সংগঠনগুলো বা যে কর্মীরা, যে দীর্ঘদিনের যে সাধনার সঙ্গে যারা আছেন, কুষ্টিয়ার কথাই শুধু বলি আমি, বাইরে যাবো না বেশি দূর। তো তাদেরকে যদি মূল্যায়ন করা হয়, তাহলে কুষ্টিয়ার সাংস্কৃতিক অঙ্গন অনেক উপকৃত হবে।’
অনুদানের ক্ষেত্রে অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানান জেলা কালচারাল অফিসার।
জেলা কালচারাল অফিসার তাইফুর রহমান বলেন, ‘এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবো এবং তার অংশ হিসেবে আমি যেটা বলতে পারি যে, এই সরকারি অর্থ যেসব সাংস্কৃতিক সংগঠন পেয়েছে, সেটা সঠিকভাবে তারা ব্যয় করছে কি না, এটার জন্য আমরা কিন্তু অলরেডি দুইটা মিটিং করেছি।’
এমন অনিয়মের অভিযোগ পেয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যায় ‘এখন টিভি’। তবে এ ব্যাপারে ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি হননি তিনি।
কাঙ্গাল হরিনাথ ও রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবিজড়িত কুষ্টিয়া পরিচিত সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে। সেই জনপদেই সংস্কৃতি চর্চার টাকায় নয়ছয়ের অভিযোগে ক্ষুব্ধ সাংস্কৃতিক কর্মীসহ স্থানীয়রা।




