পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী চলতি বছরের মে থেকে জুলাই পর্যন্ত তিন মাসেই সারাদেশে ৯৩৪টি খুনের ঘটনায় মামলা হয়েছে। সেই হিসেবে প্রতিদিন খুন হয়েছে ১০টিরও বেশি। আর গত ৭ মাসের ৪ হাজার ২৫টি ধর্ষণের মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে এই সময়ে শিশু ধর্ষণ ও বলৎকারের ঘটনা ঘটেছে ১,৪৮৫টি।
তথ্য-উপাত্ত বলছে, বেশিরভাগ ঘটনায় ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় গ্রেপ্তার হয়েছে আসামিরা। কিছু মামলায় হয়েছে বিচার ও শাস্তিও। তারপরও কমছে না অপরাধ। উল্টো নতুন কায়দায় অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে।
পরিস্থিতি কেন হাঁটছে উল্টো দিকে প্রশ্ন ছিলো অপরাধ নিয়ন্ত্রক ও বিশেষজ্ঞদের কাছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম সোহাগ বলেন, ‘অপরাধের পরিমাণ বাড়ার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে হলো— আগে আমাদের সবার মধ্যে একটা ভালো সম্পর্ক ছিলো। আর তা বর্তমানে নেই বললেই চলে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, সমাজে টিকে থাকার চেষ্টা থেকে অনেক সময় অপরাধের প্রবণতা বাড়ে।
আরও পড়ুন
এদিকে দেশে অপরাধ বাড়ার পেছনে উদ্বেগজনক তথ্য দিচ্ছে মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, দীর্ঘ সময় কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী দুশ্চিন্তা, ভার্চুয়াল বা বাস্তবিক সহিংসতা, জাতীয় বা রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝে থাকলে মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স দুর্বল হয়ে যায়। এতে ব্রেন হাইজ্যাক বা ভালো সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রবণতা কমে যায়।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক ডা. সাইফুন নাহার বলেন, ‘মাদকের কারণে অনেক সময় আমরা ইমোশনাল কাজ করে থাকি। এর ফলে অপরাধের প্রবণতা বাড়ছে।’
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. তৈয়বুর রহমান বলেন, ‘আমার প্রতিদিন যেসব নিউজ দেখি তার অধিকাংশই অপরাধ মূলক। এর ফলে মানুষ অপরাধের পরিমাণ বাড়ছে।’
এ মনোরোগ বিশেষজ্ঞের মতে করোনা মহামারি ও তার পরবর্তী কর্মহীনতা, দুশ্চিন্তা , জুলাই আন্দোলন ও তার পরবর্তী জাতীয় ও রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাবে বাড়ছে খুন, ধর্ষণের মত ঘটনা।
বিশ্বখ্যাত জার্নাল ‘নেচার’ এবং আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যও বলছে একই কথা। দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা। অর্থনৈতিক চাপ, মাদকাসক্তি এবং সামাজিক দূরত্ব এবং বিচারহীনতার কারণে সাধারণ মানুষের মানসিক সহনশীলতায় প্রভাব পড়ে।
এতে তুচ্ছ কোনো ঘটনায় কয়েক সেকেন্ডের জন্য আদিম হিংস্র রূপ ধারণ করছে। ফলে কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছাড়াই মুহূর্তের মধ্যে ঘটে যাচ্ছে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের অপরাধ ঘিরে এমন সংকট সমাধানে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, তৈরি করতে হবে সমতার সমাজ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘আমাদের সামাজিক পরিবেশ যেদিন এক সঙ্গে কাজ করতে পারবে তখনই অপরাধ কমে আসবে।’
এক্ষেত্রে ক্ষয়ে যাওয়া সমাজ মেরামতে কেবল পরিবার কাজ করলে হবে না, রাষ্ট্রকে কাজ করতে হবে নির্মোহভাবে। এমনটাই বলছেন বিশেষজ্ঞরা।




