দেশজুড়ে হাম সংক্রমণের মধ্যে জরিপ দল দিলো সতর্কবার্তা। ৩ থেকে ৭ এপ্রিল ঢাকা উত্তর সিটির ৬টি জোনে ম্যালেরিয়ার বাহক স্ত্রী এলোফিলিস মশার উপস্থিতি মিলেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জরিপের এ ফলে এক সপ্তাহে ৯৮টি ম্যালেরিয়ার বাহক এনোফিলিস মশার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। চলতি বছর ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত এ ৬ জোনে এনোফিলিস মশা পাওয়া গেছে আড়াই হাজারের বেশি।
অথচ চলতি বছর ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ ও ২০৩০ সালে নির্মূলের পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবে তার উল্টো চিত্র। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসেবে গেলো বছর ম্যালেরিয়া আক্রান্ত হয় ১০ হাজার ১৬২, মৃত্যু হয় ১৬ জনের। চলতি বছর প্রথম ৩ মাসেই আক্রান্ত হয় ৪৬০ জন। এদের সবাই তিন পার্বত্য জেলা, কক্সবাজার, চট্টগ্রামসহ দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ১১ জেলা।
তবে গত ১৭ এপ্রিল বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর পর আলোচনায় কোথা থেকে সংক্রমিত হলেন তিনি। যদিও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, মাহবুবুর রহমানের মৃত্যুর কয়েকদিন আগে আফ্রিকার দেশ ক্যামেরুন সফর করেছিলেন। তিনি সেখানেই আক্রান্ত হয়েছেন নাকি ঢাকায়, সেই প্রশ্ন পাশে রেখেই বলা যায়, রাজধানীতে এনোফিলিস মশার অস্তিত্ব পাওয়ায় বাড়ছে উদ্বেগ।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বলেন, ‘আমরা এ পর্যন্ত ৯ প্রজাতির অ্যানোফিলিস মশা ঢাকাতে পেয়েছি। এখন ঢাকায় ম্যালেরিয়া ছড়াবে কি না, সেটা বিস্তর গবেষণার বিষয়। যেহেতু অ্যানোফিলিসের প্রজাতি এখানে আছে এবং সংখ্যায় কম না—বেশ ভালো ডেনসিটিতেই আছে, সেজন্য একদম উড়িয়ে দেয়া যায় না যে, ঢাকায় ম্যালেরিয়া কখনো হবে না।’
আরও পড়ুন:
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একবার এ রোগে আক্রান্ত হলে, দ্রুতই শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ অকার্যকর হয়ে যায়। এ অবস্থায় সংক্রমণ বাড়লে মৃত্যুহার কমানো কঠিন হয়ে পড়বে।
বিএমইউ ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফজলে রাব্বী চৌধুরী বলেন, ‘সিভিয়ার ম্যালেরিয়া হলে এটা দ্রুত আপনার অর্গানগুলোকে ড্যামেজ করে দিতে পারে। সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে পড়ে আরও ব্রেইনকে ড্যামেজ করতে পারে যেটা আমরা স্নায়ুর ইনফেকশন বলি। চোখের ক্ষতি করতে পারে এবং এটা খুব দ্রুত ফ্যাটাল হয়, খুবই দ্রুত মারা যায়।’
দেশে রোগীর সংখ্যা বাড়লেও খোলা বাজারে পাওয়া যায় না ম্যালেরিয়ার কোনো ওষুধ। আক্রান্ত রোগীর চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে ওষুধ সরবরাহ করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এ অবস্থায় রোগের সংক্রমণ প্রতিরোধের পাশাপাশি পর্যন্ত ওষুধের প্রস্তুত রাখার তাগিদ বিশেষজ্ঞদের।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘বহু ওষুধ প্রতিরোধী যে ম্যালেরিয়ার জীবাণু সেটি এবং আরেকটি হচ্ছে পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমার, ভারত থেকে ম্যালেরিয়া প্রবণ লোকজন বা ম্যালেরিয়ার জীবাণু বহন করে বাংলাদেশে এসে ছড়িয়ে দেয়। এ প্রেক্ষাপটে আমি মনে করছি ঢাকাতে অ্যানোফিলিস মশা পাওয়া যাচ্ছে এবং ম্যালেরিয়া পাওয়ার বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটছে, অতএব আমাদের নতুন করে ম্যালেরিয়া প্রতিরোধী কার্যক্রমকে ভাবা দরকার।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, গেল বছরগুলোতে যেসব রোগী পাওয়া গেছে তার সবই পাহাড়ি অঞ্চল বা বিদেশ ভ্রমণের ইতিহাস আছে। তবে সব ধরণের প্রস্তুতি রেখেছেন তারা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান বলেন, ‘এক সময় ম্যালেরিয়া ইরাডিকেশন প্রোগ্রাম ছিলো। সেটা যখন ইরাডিকেট হয়ে গেল তখন এ প্রোগ্রামগুলো সব বন্ধ হয়ে গেল—এটা স্বাভাবিক নিয়মেই বন্ধ হয়। এখন স্পোর্যাডিক যেখানে ম্যালেরিয়া দেখা দিবে বা হবে, সেখানে আমাদের ওইভাবেই অ্যাড্রেস করতে হবে। সরকার ম্যালেরিয়ার যে ট্রিটমেন্টটা করছেন, এটার জন্য সাফিশিয়েন্ট ম্যালেরিয়া ট্রিটমেন্ট, ভ্যাকসিন, ওষুধপত্র এগুলো মজুদ আছে।’
করোনার পর পুরোনো সব ভাইরাস আবারও সক্রিয় হচ্ছে, এ অবস্থায় নতুন সংক্রমণ তৈরি হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়তে পারে।




