মার্কিন শঙ্কা ও চীনের অভ্যন্তরীণ সমীকরণ: এআই দৌড়ে কার প্রভাব কেমন?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তি খাতে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতার একটি রূপক চিত্র
বিদেশে এখন
তথ্য-প্রযুক্তি
0

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির বৈশ্বিক আধিপত্য অর্জনে সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি পথ বেছে নিয়েছে বিশ্বের শীর্ষ দুই অর্থনৈতিক শক্তি—যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। ওয়াশিংটন যেখানে দ্রুততম সময়ে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও ‘সুপার-ইন্টেলিজেন্স’ তৈরির পেছনে ছুটছে, সেখানে বেইজিংয়ের মূল লক্ষ্য প্রযুক্তিটির ওপর রাষ্ট্রীয় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা এবং অর্থনীতি ও সমাজজুড়ে এর ব্যাপক ব্যবহার নিশ্চিত করা।

চলতি বছরের মার্চে প্রকাশিত চীনের ১৫তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় এআই কথাটি ৫২ বার উল্লেখ করা হয়েছে এবং কম্পিউটিং পাওয়ারের জন্য আলাদা একটি পুরো অধ্যায় রাখা হয়েছে। চীনের স্পষ্ট লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের ৯০ শতাংশ অর্থনীতিতে এআই প্রযুক্তির সংযোগ ঘটানো। চীনের জাতীয় নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্য এই প্রযুক্তিকে অপরিহার্য মনে করে ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি।

চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্লেষকরা একমত যে, যার হাতে সবচেয়ে শক্তিশালী এআই থাকবে, সেই বিশ্বমঞ্চে নিজের পরাশক্তি বজায় রাখবে এবং অর্থনীতি ও সামরিক ক্ষেত্রে আগামী দশকগুলো নিয়ন্ত্রণ করবে। তবে বেইজিংয়ের প্রধান উদ্বেগ এআইয়ের কারণে সাধারণ চাকরি হারানো নয়, বরং এই প্রযুক্তি ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে ‘জ্ঞানভিত্তিক যুদ্ধ’ বা জনমত তৈরিতে ব্যবহার হতে পারে কি না, তা নিয়ে। চীনের গোয়েন্দা প্রধান চেন ইক্সিন সম্প্রতি সতর্ক করেছেন যে এআইয়ের অপব্যবহার দেশের রাজনৈতিক ও আদর্শগত নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে।

চীনা মডেলগুলোর কিছু বড় ধরনের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা রয়েছে, যা বেইজিং সাধারণত প্রকাশ করে না। এর মধ্যে অন্যতম হলো দ্রুত প্রবীণ হয়ে যাওয়া জনসংখ্যা, ১৯ শতাংশের বেশি তরুণ বেকারত্ব, আবাসন খাতের দীর্ঘমেয়াদি মন্দা এবং সেমিকন্ডাক্টর খাতে এনভিডিয়ার তুলনায় পিছিয়ে থাকা। রাষ্ট্রীয় সহায়তা সত্ত্বেও চীনের হুয়াওয়ে এখনো চিপ প্রযুক্তিতে মার্কিন চিপ নির্মাতা এনভিডিয়ার চেয়ে বেশ পেছনে।

তবে দুর্বলতার পাশাপাশি চীনের কিছু সুনির্দিষ্ট ও শক্তিশালী প্রভাব রয়েছে। বিশেষ করে বিদ্যুতের যোগান, বিরল খনিজ সম্পদের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ এবং শিল্পে রোবট ব্যবহারের দিক থেকে তারা যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে অনেক এগিয়ে। এআই তৈরির মূল কাঁচামাল বা ২০টি অত্যাবশ্যকীয় খনিজের প্রায় সবকটির সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে চীন। এ ছাড়া সাশ্রয়ী ও সবার জন্য উন্মুক্ত (ওপেন-সোর্স) এআই মডেল তৈরিতে চীন বেশ সাফল্য দেখিয়েছে। কিমি কে৩, কিউয়েন ৩.৮-ম্যাক্স এবং ডিপসিকের মতো চীনা ওপেন-সোর্স মডেলগুলো মার্কিন প্রযুক্তির তুলনায় অনেক কম খরচে ব্যবহার করা যাচ্ছে।

পরিসংখ্যান বলছে, প্রযুক্তি গ্রহণের দিক থেকে চীনা নাগরিকরা মার্কিন নাগরিকদের তুলনায় অনেক বেশি ইতিবাচক। চীনে প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ সপ্তাহে অন্তত একবার এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করেন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে এই হার ৫৪ শতাংশ। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চীনের রাষ্ট্রীয় সেন্সরশিপ ও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের কারণে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ পুরোপুরি প্রকাশ্যে আসছে না।

এএম