প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী বেলজিয়াম ও লুক্সেমবার্গের প্রায় ৪০টি ডেলহাইজে সুপারমার্কেট এ হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া সুইডেন, আয়ারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, এস্তোনিয়া এবং ফিনল্যান্ডের বেশ কিছু দোকানও আক্রান্ত হয়েছে।
আক্রান্ত রেফ্রিজারেটর প্রস্তুতকারক বেলজিয়ান কোম্পানি সবকোবেল জানিয়েছে, কুলিং ইউনিটের ইভাপোরেটরগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘ডিফ্রস্ট মোড’-এ চলে যায়, যার ফলে সেগুলোর অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করে।
গত মাসে ফ্রান্সে শত শত সুপারমার্কেটে যেভাবে হামলা চালানো হয়েছিল, এটিও একই পদ্ধতিতে করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। স্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী, অক্টোবর মাসের ওই হামলার কারণে লাখ লাখ ইউরো মূল্যের খাবার নষ্ট হয়ে যায় এবং তা ফেলে দিতে হয়।
ডেলহাইজের সিস্টেম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান সবকোবেলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) স্টেফান মোয়েলান্স সোমবার বেলগা বার্তা সংস্থাকে জানান, এটি একটি সাইবার হামলা। আক্রান্ত ইউনিটগুলোকে নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করতে তাদের কর্মীরা সারারাত ও সকালজুড়ে কাজ করেছেন।
তিনি জানান, অক্টোবরের শুরুতে ফ্রান্সে হামলার পর থেকেই তারা গ্রাহকদের রেফ্রিজারেটরগুলোকে এ নিরাপত্তা ঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত রাখতে কাজ করছিলেন। তবে এ সমস্যা সমাধানের জন্য কেবল সফটওয়্যার আপডেটই যথেষ্ট নয়, রেফ্রিজারেটরগুলোর যন্ত্রাংশে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।
ইউরোপের অধিকাংশ সুপারমার্কেটই ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত থাকে, যার ফলে দূর থেকেই এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও ত্রুটি সমাধান করা যায়।
মোয়েলান্স আরও বলেন, ‘সবচেয়ে সহজ সমাধান হলো সুরক্ষিত ইন্টারনেট সংযোগের মাধ্যমে ফ্রিজগুলো পরিচালনা করা। ফ্রান্সে হামলার পর আমাদের বেশিরভাগ গ্রাহকই সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন।’
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউরোপজুড়ে বিভিন্ন দোকানের ফ্রিজারের তাপমাত্রা বেড়ে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস (১২২ ডিগ্রি ফারেনহাইট) পর্যন্ত পৌঁছেছিল। সর্বশেষ এ হামলার পেছনে কারা জড়িত তা এখনো স্পষ্ট নয়।
এদিকে, গত আগস্টে আমেরিকার কয়েকটি সামরিক ঘাঁটিতে রেফ্রিজারেশন ব্যবস্থা অচল হওয়ার কারণ অনুসন্ধান করছে যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষ। সাম্প্রতিক এসব ঘটনার সঙ্গে কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে তারা ফরাসি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে।
বেলজিয়াম ও সুইডেনের জাতীয় সাইবার-নিরাপত্তা সংস্থা জানিয়েছে, তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি সেন্টার (এনসিএসসি) জানিয়েছে, তারা ঘটনার বিস্তারিত জানার জন্য আন্তর্জাতিক অংশীদার ও শিল্পসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কাজ করছে। তবে যুক্তরাজ্যে এখন পর্যন্ত কোনো হামলার খবর পাওয়া যায়নি।
এদিকে উত্তর বেলজিয়ামের ফ্ল্যান্ডার্সের হোইলার্টে অবস্থিত ডেলহাইজের একটি শাখা স্থানীয় সংবাদ ওয়েবসাইট ‘হেট লাতস্টে নিউজকে জানিয়েছে, তাদের প্রায় ১,০০,০০০ ইউরো (৮৩,৫০০ পাউন্ড) সমমূল্যের পণ্য নষ্ট হয়েছে।
ফরাসি মালিকানাধীন সুপারমার্কেট চেইন কাফুর জানিয়েছে, বেলজিয়ামে তাদের ১৫টি স্টোর আক্রান্ত হয়েছে। তবে সব শাখা খোলা রাখা নিশ্চিত করতে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেয়া হয়। ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থার অধীনে বেলজিয়ামে ‘স্পার’ স্টোর পরিচালনা করা কোলরুইট গ্রুপ রয়টার্সকে জানিয়েছে যে তাদের পাঁচটি দোকানের ফ্রিজিং সিস্টেমে হামলা চালানো হয়েছে।
সুইডেনের বাজেট ফার্নিচার বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ইকেয়া জানিয়েছে, বেলজিয়ামের পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর মনস-এ অবস্থিত তাদের দোকানের রেফ্রিজারেশন সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রয়টার্সকে দেয়া এক বিবৃতিতে কোম্পানির এক মুখপাত্র বলেন, ‘অন্যান্য শাখাগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে—আমরা সে সম্ভাবনা উড়িয়ে দিতে পারছি না।’
সুইডেনে আইসিএ এবং কুপের একাধিক দোকান হামলার শিকার হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।আইসিএর এক মুখপাত্র নিশ্চিত করেছেন যে, কেন্দ্রিয় নেটওয়ার্কের বাইরে চালিত অল্প কিছু আইসিএ স্টোর এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতি সামাল দিতে আইসিএ বর্তমানে আক্রান্ত দোকানগুলোকে সহযোগিতা করছে।’
দক্ষিণ সুইডেনের সজোবোতে অবস্থিত একটি আইসিএ শাখা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছে, রাতের বেলা আমাদের রেফ্রিজারেটর এবং ফ্রিজার হ্যাক করা হয়েছে এবং সেগুলোর তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রিতে সেট করে দেয়া হয়েছে। দোকানটি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হলেও পরবর্তীতে গ্রাহকদের জন্য পুনরায় খুলে দেয়া হয়।
সুইডেনে কুপ-এর ৮০০টি দোকানের মধ্যে ৭টি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পরিস্থিতি বর্তমানে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে কোম্পানিটি বিবিসিকে নিশ্চিত করেছে।
পার্শ্ববর্তী দেশ ফিনল্যান্ডেও কিছু ‘কে-স্টোর’ এ রেফ্রিজারেটর বিকল হওয়ার ঘটনা জানা গেছে। সুপারমার্কেট চেইন কেসকোর মালিক ফিনল্যান্ডের সংবাদপত্র ‘হেলসিংইন সানোমাত’ কে জানিয়েছেন, তাদের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা সমস্যার কারণ অনুসন্ধান করছেন। এ হামলার প্রভাব পড়েছে আয়ারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস এবং এস্তোনিয়াতেও।
আয়ারল্যান্ডে ১৩টি সুপারভ্যালু সুপারমার্কেট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চেইনটির মালিক প্রতিষ্ঠান মাসগ্রেভ গ্রুপের এক মুখপাত্র ‘দ্য আইরিশ টাইমস’-কে নিশ্চিত করেছেন যে একটি সাইবার ঘটনার কারণে তাদের রেফ্রিজারেশন সিস্টেম ব্যাহত হয়েছে। তবে তিনি জানান, এর প্রভাব রেফ্রিজারেটরের নির্দিষ্ট একটি মডেলেই সীমাবদ্ধ ছিল।
ড্যানিশ প্রস্তুতকারক সংস্থা ডানফসের একজন মুখপাত্র ডাচ পাবলিক রেডিও চ্যানেল এনওএসকে জানিয়েছেন, নেদারল্যান্ডসে অন্তত ১৭টি প্রতিষ্ঠানের কুলিং ও ফ্রিজিং সিস্টেমে হামলা চালানো হয়েছে, যার মধ্যে মাংসের দোকান এবং স্থানীয় ছোট দোকানও রয়েছে।





