ক্ষমতার সিঁড়ি যখন বিজেপি: যেভাবে ‘দিদি’ মমতাসহ ৬ মুখ্যমন্ত্রীর পতন

মমতাসহ ৬ মুখ্যমন্ত্রী
বিদেশে এখন
0

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) কাছে বড় ব্যবধানে হেরেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এ পরাজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলায় তার ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটলো। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে এটি এক ঐতিহাসিক পরিহাস। কারণ ১৯৯৮ সালে তৃণমূল কংগ্রেস গঠনের পর বিজেপির হাত ধরেই প্রথম নির্বাচনি বৈতরণি পার হয়েছিলেন মমতা। তবে মমতা একা নন, ভারতের অন্তত ছয়জন প্রভাবশালী মুখ্যমন্ত্রী বিজেপির সঙ্গে জোট করে ক্ষমতায় আরোহণ করলেও, শেষ পর্যন্ত সেই বিজেপির হাতেই ক্ষমতা হারিয়েছেন।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়: মিত্র থেকে ঘোর বিরোধী

নব্বইয়ের দশকের শেষে কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূল গঠনের পর অটল বিহারি বাজপেয়ির এনডিএ জোটের অন্যতম প্রধান মুখ ছিলেন মমতা। বাজপেয়ি মন্ত্রিসভায় রেলমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন তিনি। ২০০৪ সালের লোকসভা ও ২০০৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে লড়েছিলেন তিনি। লক্ষ্য ছিল বামফ্রন্টকে হটানো। পরবর্তী সময়ে পথ আলাদা হলেও ২০ বছর পর সেই পুরোনো মিত্র বিজেপির হাতেই রাজনৈতিকভাবে ধরাশায়ী হলেন ‘দিদি’।

মেহবুবা মুফতি: ভূস্বর্গে অভূতপূর্ব জোটের পতন

কাশ্মীরের রাজনীতিতে পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি (পিডিপি) ও বিজেপির জোট ছিলো সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত। ২০১৪ সালে এই জোট সরকার গঠন করে এবং ২০১৬ সালে মেহবুবা মুফতি রাজ্যের প্রথম নারী মুখ্যমন্ত্রী হন। তবে মতাদর্শগত বিরোধ ও সহিংসতার জেরে ২০১৮ সালে বিজেপি সমর্থন প্রত্যাহার করলে মেহবুবার শাসনের নাটকীয় অবসান ঘটে।

উদ্ধব ঠাকরে: হিন্দুত্বের ‘হোটেল রাজনীতি’

মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে শিবসেনা ও বিজেপি ২৫ বছর অবিচ্ছেদ্য ছিল। ২০১৯ সালে ক্ষমতার ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধে সেই সম্পর্ক ভেঙে যায়। উদ্ধব ঠাকরে কংগ্রেস ও এনসিপির সঙ্গে জোট করে মুখ্যমন্ত্রী হলেও ২০২২ সালে একনাথ শিন্ডের নেতৃত্বে শিবসেনার বড় একটি অংশ বিজেপির সঙ্গে হাত মেলায়। ফলে ঘরের শত্রুর সাহায্য নিয়ে বিজেপি ঠাকরেকে ক্ষমতাচ্যুত করে।

অরবিন্দ কেজরিওয়াল: শূন্যস্থানে উত্থান ও প্রস্থান

দিল্লিতে আম আদমি পার্টির (আপ) অরবিন্দ কেজরিওয়ালের সঙ্গে বিজেপির সরাসরি জোট না হলেও তার উত্থানে বিজেপির সাংগঠনিক দুর্বলতা পরোক্ষ ভূমিকা রেখেছিল। দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের আবেগ কাজে লাগিয়ে কেজরিওয়াল ১০ বছর দিল্লি শাসন করলেও ২০২৫ সালের নির্বাচনে বিজেপি প্রবলভাবে ঘুরে দাঁড়ায় এবং তার কাছ থেকে দিল্লির মসনদ ছিনিয়ে নেয়।

নবীন পাটনায়েক: ২৪ বছরের সাম্রাজ্যের পতন

ওডিশার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী নবীন পাটনায়েক ১৯৯৮ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত বিজেপির সঙ্গে জোট বেঁধে সরকার চালিয়েছেন। দীর্ঘ সময় আলাদাভাবে লড়াই করে অপরাজেয় থাকলেও ২০২৪ সালের নির্বাচনে সেই পুরোনো মিত্র বিজেপিই নবীনের ২৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটায়। বিজেডির দুর্গ ভেঙে ওডিশায় প্রথমবারের মতো একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় বিজেপি।

নীতীশ কুমার: ‘পাল্টি’ রাজনীতির চড়া মূল্য

বিহারের নীতীশ কুমার তার রাজনৈতিক জীবনে বহুবার বিজেপির সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন এবং ছেড়েছেন। ২০২৪ সালের শুরুতে আবারও এনডিএ-তে ফিরলেও, এবার সমীকরণ বদলে গেছে। জেডিইউ ও বিজেপি জোট সরকার গঠন করলেও বর্তমানে নীতীশ আর মুখ্যমন্ত্রী নেই। বিজেপি নেতা সম্রাট চৌধুরী মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেয়ায় নীতীশের প্রভাবশালী জমানার অবসান হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

ভারতের এই ছয় শীর্ষ নেতার রাজনৈতিক ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আঞ্চলিক দলগুলো বিজেপির জাতীয় শক্তিকে ব্যবহারের মাধ্যমে ক্ষমতায় থিতু হতে চাইলেও, দীর্ঘমেয়াদে বিজেপিই তাদের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গসহ এই রাজ্যগুলোর বর্তমান চিত্র সেই রূঢ় রাজনৈতিক বাস্তবতারই প্রতিফলন।

এনএইচ