যুদ্ধবিরতির মধ্যেই লেবাননে ইসরাইলি হামলায় নিহত ১৬

দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়েহতে ইসরাইলি বিমান হামলার পর আকাশে ধোঁয়ার কুণ্ডলী
বিদেশে এখন
0

নতুন যুদ্ধবিরতির খবর প্রকাশিত হলেও দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলের হামলায় আজ (শনিবার, ২০ জুন) অন্তত ১৬ জন নিহত হয়েছেন। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চলমান সহিংসতা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া নতুন সমঝোতাকে হুমকির মুখে ফেলছে। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

লেবাননের সিভিল ডিফেন্স সংস্থা জানিয়েছে, নাবাতিয়েহ জেলায় চলমান হামলার পর তাদের সদস্যরা ১৬ জনের মরদেহ এবং ১২ জন আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নিয়ে গেছেন। আজ (শনিবার, ২০ জুন) ভোর থেকে উদ্ধারকাজ চলছিল।

শুক্রবার হিজবুল্লাহ ও ইসরাইলের মধ্যে নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হওয়ায় সুইজারল্যান্ডে নির্ধারিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা বাতিল করা হয়। ওই আলোচনার মাধ্যমে এ সপ্তাহে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তী সমঝোতাকে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত করে আরও বিস্তারিত চুক্তিতে রূপ দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা ছিল।

অন্তর্বর্তী চুক্তিতে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে ইসরাইলের মন্ত্রী, কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকদের অনেকেই এর সমালোচনা করেছেন। তাদের দাবি, এতে হিজবুল্লাহর হুমকির জবাব দেয়ার ক্ষেত্রে ইসরাইল বাধাগ্রস্ত হবে। ইসরাইলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, হিজবুল্লাহর ছোড়া প্রক্ষেপণের জবাবে তারা সংগঠনটির বিভিন্ন অবস্থানে হামলা চালাচ্ছে।

শনিবারের সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলাগুলোর একটি হয় টাইর জেলার বারিশ শহরে। সেখানে তিনতলা একটি আবাসিক ভবনে হামলায় এক দম্পতি ও তাদের দুই সন্তান নিহত হন।

গতকাল (শুক্রবার, ১৯ জুন) হিজবুল্লাহর হামলায় একটি ট্যাংক বিধ্বস্ত হলে একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাসহ চার ইসরাইলি সেনা নিহত হন। হিজবুল্লাহ দাবি করেছে, পূর্ববর্তী যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে ইসরাইল অগ্রসর হওয়ার পর তারা এ হামলা চালিয়েছে। এরপর ইসরাইলের পাল্টা হামলায় দক্ষিণ লেবানন ও বেকা উপত্যকাজুড়ে ৪৭ জন নিহত হন বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

শুক্রবার সন্ধ্যায় কার্যকর হওয়া নতুন যুদ্ধবিরতির প্রকৃত অবস্থা এখনো স্পষ্ট নয়। হিজবুল্লাহ বলেছে, ইসরাইল যুদ্ধবিরতি মেনে চললে তারাও তা মেনে চলবে। তবে সংগঠনটি আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধবিরতি কার্যকরের কথা নিশ্চিত করেনি।

হিজবুল্লাহর সংসদ সদস্য হাসান ফাদলাল্লাহ বলেন, ইসরাইলি হামলার জবাব দেয়ার অধিকার তাদের রয়েছে। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধবিরতির কথা বলা হচ্ছে। আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো শত্রুপক্ষ যেন আমাদের দেশ ও গ্রামে হামলা না চালায় এবং নতুন কোনো এলাকা দখলের চেষ্টা না করে।’

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে হামলা চালানোর কয়েক দিন পর হিজবুল্লাহ উত্তর ইসরাইলের বেসামরিক এলাকায় রকেট ও ড্রোন হামলা শুরু করে। এর জবাবে ইসরাইল দক্ষিণ লেবাননের বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে তথাকথিত ‘বাফার জোন’ গড়ে তোলে।

চলমান সহিংসতা ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে এ আঞ্চলিক যুদ্ধের স্থায়ী সমাধান নিয়ে সংশয় বাড়ছে। এ সংঘাতে এখন পর্যন্ত অন্তত ৭ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। এছাড়া জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিরতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এ সপ্তাহে স্বাক্ষরিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান অন্তর্বর্তী চুক্তির ফলে হরমুজ প্রণালি আবারও খুলে দেয়া হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর তেহরান অধিকাংশ জাহাজ চলাচলের জন্য এটি বন্ধ করে দিয়েছিল। চুক্তিতে লেবাননে সামরিক অভিযান বন্ধ এবং দেশটির সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান দেখানোর কথা বলা হয়েছে। তবে ইসরাইল ও হিজবুল্লাহ কেউই এ চুক্তির পক্ষভুক্ত নয়।

ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ইসরাইলের জন্য সব হুমকি দূর না হওয়া পর্যন্ত দক্ষিণ লেবাননে সেনা মোতায়েন থাকবে। অন্যদিকে হিজবুল্লাহ জানিয়েছে, ইসরাইল লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ না হলে তারা হামলা বন্ধ করবে না। ইরানও বলছে, এটি চুক্তির একটি শর্ত।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই শনিবার বলেন, চূড়ান্ত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তির খসড়া তৈরির পরবর্তী ধাপ নিয়ে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। তিনি জানান, অন্তর্বর্তী চুক্তি ডিজিটালভাবে স্বাক্ষরিত হওয়ায় সুইজারল্যান্ডের বৈঠকটি জরুরি ছিল না। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই নতুন বৈঠকের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

অন্তর্বর্তী চুক্তি অনুযায়ী, পরমাণু চুক্তি চূড়ান্ত করতে আলোচকদের ৬০ দিন সময় দেয়া হয়েছে। তবে প্রয়োজনে এ সময় বাড়ানো যেতে পারে। অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, এত জটিল বিষয়ে দুই মাসের মধ্যে সমঝোতায় পৌঁছানো কঠিন হবে। চুক্তিতে ইরানের জন্য আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের তহবিলসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক সুবিধার কথা বলা হয়েছে।

ইতিমধ্যে কিছু অর্থনৈতিক ছাড় পেয়েছে তেহরান। অন্তর্বর্তী চুক্তির পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দর অবরোধ তুলে নিয়েছে এবং দেশটিকে অবাধে তেল বিক্রির সুযোগ দিয়েছে।

এএম