হরমুজ প্রণালি সংকট: ট্যাংকার যুদ্ধের নেপথ্যে কৌশলগত আধিপত্য ও বৈশ্বিক প্রভাব

হরমুজ প্রণালিতে ট্যাংকার
বিদেশে এখন
0

কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে তেলের ট্যাংকার লক্ষ্য করে পাল্টাপাল্টি হামলা নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ওয়াশিংটন ইরানের তিনটি তেলের ট্যাংকারে এবং তেহরান মার্কিন যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ ও ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে। বিশ্লেষকেরা একে দুই দেশের দীর্ঘ ছয় মাসের সংঘাতের এক ‘পরিকল্পিত উসকানি’ হিসেবে দেখছেন, যা সমুদ্রসীমায় দুই পক্ষের সরাসরি আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লড়াইকে স্পষ্ট করে তুলেছে। আল জাজিরার বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে এ আলোচনা উঠে এসেছে।

কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে তেলের ট্যাংকার লক্ষ্য করে পাল্টাপাল্টি হামলা নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ওয়াশিংটন ইরানের তিনটি তেলের ট্যাংকারে এবং তেহরান মার্কিন যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ ও ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে। বিশ্লেষকেরা একে দুই দেশের দীর্ঘ ছয় মাসের সংঘাতের এক ‘পরিকল্পিত উসকানি’ হিসেবে দেখছেন, যা সমুদ্রসীমায় দুই পক্ষের সরাসরি আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লড়াইকে স্পষ্ট করে তুলেছে।

সমুদ্রসীমায় ‘ট্যাংকার যুদ্ধ’

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, ইরানি হামলার জবাবে তারা খার্গ দ্বীপের কাছে একটি, জাস্কের কাছে আরেকটি এবং ওমান উপসাগরে অপর একটি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকার বিকল করে দিয়েছে। অন্যদিকে, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোর (আইআরজিসি) মার্কিন বিমানবাহী জাহাজ ও ডেস্ট্রয়ার লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে।

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক উলফগ্যাং পুশতাই আল জাজিরাকে বলেন, সাধারণ কোনো যুদ্ধজাহাজ নয়, ইরান সরাসরি মার্কিন বিমানবাহী রণতরিকে নিশানা করেছে, যা মার্কিন অভিযানের মেরুদণ্ড। এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা এবং এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা হামলা ছিল প্রত্যাশিত।

অবরোধ বনাম ‘ছায়া ট্যাংকার’

যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, আক্রান্ত ইরানি ট্যাংকারগুলো মূলত আইআরজিসি ও তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের অর্থায়নের প্রধান উৎস। গত এপ্রিল থেকে মার্কিন নৌবাহিনী ইরানের বন্দরগুলো অবরুদ্ধ করে রাখায় তেহরান তাদের ‘ছায়া ট্যাংকার বহর’ ব্যবহার করে তেল রপ্তানি সচল রাখার চেষ্টা করছে।

ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের মুখপাত্র হাসান কাশকাভি একে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই’ বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, মার্কিন নৌ অবরোধ আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং ইরান সামরিক উপায়েই এর জবাব দেবে।

মার্কিন চাপ ও বিশ্ববাজারের অস্থিতিশীলতা

মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট সম্প্রতি ইরানের আর্থিক স্বার্থ ও তেল রাজস্বের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। যদিও ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করছে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন লাখ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন স্বাভাবিক রয়েছে, কিন্তু কেপলারের ডেটা বলছে ভিন্ন কথা। কেপলারের মতে, হরমুজে দৈনিক জাহাজ চলাচলের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গড়ে মাত্র ১৩টিতে নেমেছে।

এ অস্থিতিশীলতায় ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৬ দশমিক ২৮ ডলারে উঠেছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রেও ডিজেল ও গ্যাসের দাম রেকর্ড ছুঁয়েছে।

ট্রাম্পের রাজনৈতিক সংকট ও সংঘাতের ভবিষ্যৎ

সামনে নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন। দেশটিতে জ্বালানির দাম বাড়ায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে ৩৩ শতাংশে নেমেছে। রয়টার্স/ইপসোসের সাম্প্রতিক জরিপ বলছে, ৬৩ শতাংশ মার্কিন নাগরিক এই যুদ্ধের ঘোর বিরোধী।

জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডল ইস্ট স্টাডিজ প্রোগ্রামের পরিচালক সিনা আজোদি মনে করেন, কোনো রাজনৈতিক রফাদফা ছাড়া এই যুদ্ধ বন্ধের সম্ভাবনা কম। দুই পক্ষের কেউই পিছু হটবে না, ফলে সংঘাত আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তেহরানের বিশ্লেষক আলী আকবর দারেইনিও মনে করেন, মার্কিন অবরোধ ইরানের প্রতিরোধ ক্ষমতাকে আরও উসকে দেবে এবং তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।

এএম