ভারতজুড়ে আন্দোলনের ঝড়; মোদি সরকারের পতন কি আসন্ন?

নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির বিক্ষোভকে সামনে রেখে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়
বিদেশে এখন
0

শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপালে গণবিক্ষোভে সরকারপ্রধানদের বিদায়ের পর এবার ভারতের দিকে নজর। ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্ক, তরুণদের আন্দোলন ও বিরোধী নেতাদের আটকে দিল্লিতে নজিরবিহীন নিরাপত্তাব্যবস্থায় চাপ বাড়ছে নরেন্দ্র মোদি সরকারের ওপর। তবে এই আন্দোলন কি সত্যিই সরকার পতনের দিকে এগোচ্ছে, নাকি আপাতত রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জেই সীমাবদ্ধ থাকবে?

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে আজ (শনিবার, ১০ অক্টোবর) নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ঘিরে ব্যাপক ধরপাকড় ও কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা পরিস্থিতিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি তুলে তরুণদের সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) ও বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করছে।

আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক নাম বাদ দেয়ার প্রক্রিয়া ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) নির্বাচনি সুবিধা দিতে পারে। তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে বিজেপি ও নির্বাচন কমিশন।

দিল্লির এ পরিস্থিতি দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদলের স্মৃতিও সামনে আনছে। ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কায় অর্থনৈতিক সংকট ও গণবিক্ষোভের মুখে প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপক্ষে দেশ ছাড়েন এবং পদত্যাগ করেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়েন। আর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে নেপালে তরুণদের বিক্ষোভের পর পদত্যাগ করেন প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলি। তিনটি ঘটনাতেই জনরোষের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল শাসনব্যবস্থা নিয়ে অসন্তোষ ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর আস্থার সংকট।

আরও পড়ুন

দিল্লিতে নজিরবিহীন নিরাপত্তা, আটক শত শত

শনিবারের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে নয়াদিল্লির গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেয় পুলিশ। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্দোলনকারীদের পাশাপাশি বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদেরও আটক করা হয়। কয়েকটি এলাকায় বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে দেয়া হয় এবং গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও যাতায়াতব্যবস্থায় বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। বিভিন্ন মেট্রো স্টেশনে প্রবেশ সীমিত করা এবং মোবাইল ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রাখার খবরও এসেছে।

আন্দোলনের অন্যতম উদ্যোক্তা অভিজিৎ দীপকেসহ সিজেপির কয়েকজন নেতাকে দিল্লিতে পৌঁছানোর পর আটক করা হয় বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। যন্তর-মন্তরে সমাবেশ আয়োজনের পরিকল্পনা থাকলেও পুলিশের বাধায় সেখানে বড় জমায়েত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

আন্দোলনকারীদের দাবি, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার খর্ব করতেই এমন ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। অন্যদিকে প্রশাসনের অবস্থান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলা ঠেকানো জরুরি। বিক্ষোভ দমনে এত বড় নিরাপত্তা আয়োজন রাজনৈতিকভাবে সরকারের জন্য অস্বস্তিকর প্রশ্ন তৈরি করেছে।

আরও পড়ুন

ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে ১৩ কোটি নাম

আন্দোলনের মূল কারণ ভারতের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) প্রক্রিয়া। নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগে ভোটার তালিকা যাচাই ও হালনাগাদের এ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। কমিশনের ভাষ্য, এর উদ্দেশ্য হলো তালিকা থেকে অযোগ্য ও একাধিকবার অন্তর্ভুক্ত ভোটারের নাম বাদ দেয়া এবং তালিকাকে নির্ভুল করা।

কিন্তু এ প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের ৫ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়, এসআইআর প্রক্রিয়ায় খসড়া ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ পড়ার পর নির্বাচন কমিশন সংশ্লিষ্ট রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলোকে তালিকার বাইরে থেকে যাওয়া যোগ্য ভোটারদের পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করতে বিশেষ উদ্যোগ নেয়ার নির্দেশ দিয়েছে।

বিরোধীদের অভিযোগ, এ প্রক্রিয়ায় দরিদ্র, সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভোটাধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাদের আশঙ্কা, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়লে সংশ্লিষ্ট নাগরিক নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না, যা নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।

বিরোধীদের দাবি, এই সংশোধন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। সিজেপি এসআইআর স্থগিত রাখা, নির্বাচন কমিশনার নিয়োগসংক্রান্ত আইন পুনর্বিবেচনা এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবিও তুলেছে।

আরও পড়ুন

অন্যদিকে বিজেপি ও নির্বাচন কমিশন অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের বক্তব্য, ভোটার তালিকা নির্ভুল করা একটি প্রশাসনিক ও আইনগত প্রক্রিয়া; এর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে।

তরুণদের ক্ষোভ থেকে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ

সিজেপির উত্থানও ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক তরুণদের আন্দোলন থেকে গড়ে ওঠা এই সংগঠন বেকারত্ব, পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস ও শিক্ষাব্যবস্থার অনিয়মের মতো ইস্যুতে আলোচনায় আসে। পরে তাদের আন্দোলন নির্বাচনব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও নির্বাচন কমিশনের জবাবদিহির দাবিতে বিস্তৃত হয়।

রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্দোলনটির নেতৃত্বে থাকা অভিজিৎ দীপকে এর আগে শিক্ষাব্যবস্থাসংক্রান্ত প্রতিবাদেও সক্রিয় ছিলেন। জুলাইয়ে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পর আন্দোলনকারীরা নিজেদের রাজনৈতিক প্রভাবের প্রমাণ হিসেবে সেই ঘটনাকে তুলে ধরছেন।

এবারের আন্দোলনে বিরোধীদলগুলোর অংশগ্রহণ পরিস্থিতিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন এবং ভোটার তালিকার সংশোধনকে কেন্দ্র করে বিরোধীরা এক জায়গায় আসার সুযোগ পেয়েছে। তরুণদের ক্ষোভের সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান যুক্ত হওয়ায় আন্দোলনটি শুধু একটি সংগঠনের কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ নেই।

মোদি সরকারের পতন কি বাস্তবসম্মত?

আরও পড়ুন

ভারতের সাংবিধানিক ও সংসদীয় বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতায় থাকতে হলে লোকসভায় সরকারের সংখ্যাগরিষ্ঠতার সমর্থন ধরে রাখতে হয়। সরকার পতনের প্রধান পথগুলোর একটি হলো লোকসভায় অনাস্থা প্রস্তাবে পরাজিত হওয়া। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করতে পারেন কিংবা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটতে পারে।

তবে রাজনৈতিক চাপের গুরুত্বও উড়িয়ে দেয়া যায় না। নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থা, ভোটার তালিকার নির্ভুলতা, তরুণদের কর্মসংস্থান এবং বিরোধীদলগুলোর ঐক্য, এসব ইস্যু একসঙ্গে সরকারের ভাবমূর্তিতে প্রভাব ফেলতে পারে। আন্দোলন দীর্ঘস্থায়ী হলে বা বিভিন্ন রাজ্যে ছড়িয়ে পড়লে তা ভবিষ্যৎ নির্বাচনে রাজনৈতিক প্রভাব ফেলতে পারে।

সামনে কোন দিকে যাবে ভারতীয় রাজনীতি?

আগামী দিনগুলোতে অন্তত তিনটি বিষয় ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। প্রথমত, সিজেপি ও বিরোধীদলগুলো আন্দোলনকে কতটা সংগঠিত ও দীর্ঘস্থায়ী করতে পারে। দ্বিতীয়ত, নির্বাচন কমিশন বাদ পড়া ভোটারদের পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করা ও সংশোধন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নেয়। তৃতীয়ত, আগামী রাজ্য নির্বাচনগুলোতে ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্ক কতটা প্রভাব ফেলে। এ তিনটি ক্ষেত্রেই পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে মোদি সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়তে বা কমতে পারে।

শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপালের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, রাজনৈতিক অনাস্থা ও তাৎক্ষণিক কোনো সংকট একত্র হলে গণআন্দোলন দ্রুত বড় আকার নিতে পারে।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, দ্য গার্ডিয়ান, আল জাজিরা ও দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।

এএম