ইসরাইলে নির্বাচনি অচলাবস্থা; পরবর্তী সরকার গঠন করতে পারেন কে?

ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের কাছে ইহুদি-আরব জোট সরকার গঠনের দাবিতে প্ল্যাকার্ড হাতে এক বিক্ষোভকারী
বিদেশে এখন
0

ইসরাইলে গত ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত পার্লামেন্ট নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু কিংবা বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকোট—কারও জোটই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। ফলে নতুন সরকার গঠন নিয়ে দেশটিতে আবারও রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। ক্ষমতায় যেতে হলে দুই শিবিরকেই এখন এমন কিছু দলের ওপর নির্ভর করতে হবে, নির্বাচনি প্রচারের সময় যাদের এড়িয়ে চলার ঘোষণা দিয়েছিল তারা। আনাদোলু ও আল জাজিরার বিশ্লেষণীর এমন তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্ভাব্য জোট সরকার বা বাইরে থেকে সমর্থন নিয়ে সংখ্যালঘু সরকার গঠনের জন্য ইসরাইলের দলগুলোকে আগামী কয়েক সপ্তাহ তীব্র রাজনৈতিক দর-কষাকষির মধ্য দিয়ে যেতে হবে। আর কোনো সমঝোতা না হলে আবারও নির্বাচনের মুখে পড়তে পারে দেশটি।

নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল কী

ইসরাইলের পার্লামেন্ট নেসেটের মোট আসন ১২০টি। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন অন্তত ৬১টি আসন। চূড়ান্ত ফলাফল অনুযায়ী কোনো জোটই এই ম্যাজিক ফিগারে পৌঁছাতে পারেনি।

নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে মোট ৫৩টি আসন। এর মধ্যে তার দল লিকুদ পার্টি ২৭টি, ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম (ইউটিজে) ৭টি, ওৎজমা ইয়েহুদিত ৭টি, শাস ৬টি এবং রিলিজিয়াস জায়োনিজম ৬টি আসন পেয়েছে।

নেতানিয়াহুবিরোধী ইহুদি দলগুলোর জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন। এর মধ্যে গাদি আইজেনকোটের দল ইয়াশার ২১টি, নাফতালি বেনেট ও ইয়াইর লাপিদের বিয়াখাদ ১২টি, ইয়াইর গোলানের দ্য ডেমোক্র্যাটস ৮টি এবং আভিগদোর লিবারম্যানের ইসরাইল বেইতেনু ৭টি আসন পেয়েছে।

অন্যদিকে আরব-নেতৃত্বাধীন দুটি দল রেকর্ড ১৯টি আসন পেয়ে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে নির্ণায়ক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। এর মধ্যে জয়েন্ট লিস্ট (যৌথ তালিকা) ১১টি এবং রাআম ৮টি আসন পেয়েছে।

লন্ডনের কিংস কলেজের জ্যেষ্ঠ টিচিং ফেলো ও ইসরাইলি রাজনৈতিক বিশ্লেষক আহরন ব্রেগম্যান আনাদোলুকে বলেন, ‘গাণিতিক হিসাবে এই মুহূর্তে নেসেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জোট সরকার গঠন করা নেতানিয়াহুর পক্ষে সম্ভব নয়।’

কোনো প্রমাণ ছাড়াই আরব-নেতৃত্বাধীন দলগুলোর বিরুদ্ধে নির্বাচন চুরির অভিযোগ তুলেছে নেতানিয়াহুর দল লিকুদ পার্টি। তবে রোববার ইসরাইলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির চেয়ারম্যান নোয়াম সোলবার্গ স্পষ্ট জানিয়েছেন, বিদেশি হস্তক্ষেপের সন্দেহের সত্যতা পাওয়া গেলেও নির্বাচনের সামগ্রিক ফলাফল বহাল থাকবে।

ব্রেগম্যান বলেন, ‘নেতানিয়াহু যা করছেন তা তার চিরচেনা কৌশল। নির্বাচনে ভালো ফল করা এবং বিরোধীদের জোট গঠনে সহায়তা করতে সক্ষম আরবদের বিরুদ্ধে নির্বাচন চুরির অভিযোগ তুলে তিনি আসলে অপর পক্ষকে জোট গঠন থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করছেন।’

এরপর কী ঘটবে এবং হারজোগ কাকে মনোনীত করবেন

নির্বাচনের ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করে ৪ নভেম্বরের মধ্যে প্রেসিডেন্ট ইসহাক হারজোগের কাছে জমা দিতে হবে। আগামী ১০ নভেম্বর নতুন নেসেট সদস্যদের শপথ নেয়ার কথা রয়েছে। এরপর দলগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে ১১ নভেম্বরের মধ্যে যেকোনো একজন নেসেট সদস্যকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানাবেন প্রেসিডেন্ট।

সরকার গঠনের জন্য মনোনীত প্রার্থী প্রথমে ২৮ দিন সময় পাবেন। প্রয়োজনে এই সময়সীমা আরও ১৪ দিন বাড়ানো হতে পারে।

প্রেসিডেন্ট হারজোগ কাকে প্রথমে সরকার গঠনের আহ্বান জানাবেন, তা এখনো স্পষ্ট করেননি। তবে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু এবং সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোট। ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম ইয়েদিওথ আহরোনোথের খবরে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করতে কয়েকটি আরব দল আইজেনকোটকে সমর্থন দেয়ার কথা ভাবছে। ফলে সরকার গঠনের দৌড়ে নেতানিয়াহুর চেয়ে আইজেনকোট কিছুটা এগিয়ে থাকতে পারেন।

আরেকটি নির্বাচন এড়াতে রাজনৈতিক নেতাদের দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে ‘সৃজনশীল সমাধান’ খোঁজার আহ্বান জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট হারজোগ।

আরব দলগুলোর সমর্থন নিয়ে কি সরকার গড়বেন আইজেনকোট

গাদি আইজেনকোট তার বিরোধী জোটের ৪৮টি আসনের সঙ্গে জয়েন্ট লিস্ট ও রাআমের ১৯টি আসন মিলিয়ে ৬৭ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠ জোট গড়ার চেষ্টা করতে পারেন। তবে এ জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক আপসের প্রয়োজন হবে।

টাইমস অব ইসরাইলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিরোধী জোটের চারটি প্রধান দলের মধ্যে তিনটিই (ইয়াশার, বিয়াখাদ ও ইসরাইল বেইতেনু) নির্বাচনি প্রচারের সময় আরব দলগুলোকে নিয়ে সরকার না গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কেবল দ্য ডেমোক্র্যাটস দলের নেতা ইয়াইর গোলান প্রকাশ্যে এমন সহযোগিতার পক্ষে অবস্থান নেন।

ইসরাইল বেইতেনুর নেতা আভিগদোর লিবারম্যান সপ্তাহান্তে আবারও বলেছেন, রাআম বা জয়েন্ট লিস্টের ওপর নির্ভরশীল কোনো সরকারে তার দল যোগ দেবে না। তার দলের ৭ জন আইনপ্রণেতাকে বাদ দিলে বাকি বিরোধী দল ও আরব দলগুলোর মোট আসন দাঁড়ায় ৬০টিতে, যা সংখ্যাগরিষ্ঠতার চেয়ে ১টি কম।

তবে ইসরাইলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাক মনে করেন, বিরোধী নেতারা তাদের অবস্থান পরিবর্তন করতে পারেন। শুক্রবার ফ্রান্স ২৪-কে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘নেতানিয়াহু এমন সমস্যায় পড়লে সঙ্গে সঙ্গে মানসুর আব্বাসকে আমন্ত্রণ জানাতেন এবং তাকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ দিয়ে দিতেন।’

রাআম দলের নেতা মানসুর আব্বাস এরই মধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে আইজেনকোটের শর্তগুলো তার দলের জন্য কোনো বাধা হবে না এবং তারা সরকারে যোগ দিতে প্রস্তুত। অন্যদিকে জয়েন্ট লিস্টের জ্যেষ্ঠ নেতা আহমাদ তিবি জানিয়েছেন, তারা জোটে যোগ না দিলেও বাইরে থেকে এমন সরকারকে সমর্থন দিতে প্রস্তুত। দলটির আরেক নেতা ইউসেফ জাবারিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, নেতানিয়াহু সরকারকে হটাতে তার দল প্রস্তুত। তিনি লেখেন, ‘ইহুদি-আরব অংশীদারত্বের মাধ্যমেই পরিবর্তন আসে, যা হতে হবে প্রকৃত ও সমান অংশীদারত্ব।’

ইসরাইলি নাগরিক সমাজ সংগঠন জাজিমের সহপ্রতিষ্ঠাতা রালুকা গানিয়া আল জাজিরাকে বলেন, বিরোধী জোট ও ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী আরব দলগুলোর মধ্যে জোট গঠনই ‘ইসরাইলের গণতন্ত্রের সামনে এগিয়ে যাওয়ার একমাত্র পথ’। বিশ্লেষক ব্রেগম্যানও মনে করেন, ইসরাইলের মোট জনসংখ্যার ২১ শতাংশ আরবদের প্রত্যাখ্যান করার এই ধারা ‘চিরকাল চলতে পারে না’। আগামী ১০ নভেম্বর নেসেটের অধিবেশনে লিকুদ পার্টির স্পিকার আমির ওহানাকে সরিয়ে নতুন স্পিকার নির্বাচনের মাধ্যমে বিরোধী ও আরব দলগুলোর এই সহযোগিতার প্রাথমিক পরীক্ষা হতে পারে।

নেতানিয়াহু কি বিরোধী শিবিরে ভাঙন ধরাতে পারবেন

বিরোধী শিবিরের কোনো দল বা স্বতন্ত্র আইনপ্রণেতাদের নিজের দিকে টেনে ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা করতে পারেন নেতানিয়াহু। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য তার আরও ৮টি আসন প্রয়োজন।

তাত্ত্বিকভাবে ৮ আসন পাওয়া আরব দল রাআমের সঙ্গে জোট বাঁধার একটি পথ খোলা আছে নেতানিয়াহুর সামনে। কিন্তু তার জোটের কট্টর ডানপন্থি শরিক ইতামার বেন-গভির এবং বেজালেল স্মোট্রিচ আরব দলগুলোর সঙ্গে যেকোনো সমঝোতার তীব্র বিরোধী। ২০২১ সালেও রাআমের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনের চেষ্টা করেছিলেন নেতানিয়াহু। কিন্তু স্মোট্রিচ তাতে রাজি না হওয়ায় সেই চেষ্টা ভেস্তে যায় এবং পরে নাফতালি বেনেট ও ইয়াইর লাপিদের জোটে যোগ দেন মানসুর আব্বাস।

জাতীয় ঐক্যের বা সংখ্যালঘু সরকার গঠনের সম্ভাবনা কতটুকু?

লিকুদ পার্টি এবং বিরোধী দলগুলো (ইয়াশার, বিয়াখাদ ও ইসরাইল বেইতেনু) মিলে একটি জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠন করলে তাদের আসন হবে ৬৭টি। কিন্তু এই সরকারের নেতৃত্ব কে দেবেন, তা নিয়েই মূল জটিলতা। আইজেনকোট, বেনেট ও লিবারম্যান—তিনজনই নেতানিয়াহুর অধীনে কাজ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

আরেকটি বিকল্প হলো বাইরে থেকে সমর্থন নিয়ে ৬১টির কম আসন নিয়ে আইজেনকোটের নেতৃত্বে সংখ্যালঘু সরকার গঠন। চ্যানেল ১২-এর বরাত দিয়ে টাইমস অব ইসরাইল জানিয়েছে, কট্টর অর্থোডক্স দল ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম (ইউটিজে) জোটে যোগ না দিয়েও পার্লামেন্টে আস্থা ভোটে অনুপস্থিত থেকে আইজেনকোটকে সরকার গঠনে সহায়তা করার কথা ভাবছে।

কট্টর অর্থোডক্স ইহুদি পুরুষদের বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা থেকে অব্যাহতি দেয়ার আইন পাস করতে ব্যর্থ হওয়ায় নেতানিয়াহুর ওপর ক্ষুব্ধ ৭টি আসন পাওয়া ইউটিজে। রোববার ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম ওয়াইনেট জানিয়েছে, রাআম ও ইউটিজে ভোটদানে বিরত থাকলে এবং জয়েন্ট লিস্ট বিপক্ষে ভোট না দিলে সংখ্যালঘু সরকার গঠন করা যায় কি না, তা খতিয়ে দেখতে নিজের দলকে নির্দেশ দিয়েছেন আইজেনকোট। তবে কট্টর অর্থোডক্সদের সামরিক অব্যাহতি বাতিলের পক্ষে আইজেনকোটের অবস্থানই এই সমঝোতার পথে বড় বাধা।

কেউই সরকার গঠন করতে না পারলে কী হবে এবং অন্তর্বর্তী দায়িত্বে কে থাকছেন

প্রথম মনোনীত প্রার্থী নির্ধারিত ৪২ দিনের (২৮ ও অতিরিক্ত ১৪ দিন) মধ্যে সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে প্রেসিডেন্ট হারজোগ অপর কোনো নেসেট সদস্যকে ২৮ দিনের সময় দিয়ে সরকার গঠনের সুযোগ দিতে পারেন। সেই চেষ্টাও ব্যর্থ হলে নেসেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যরা (অন্তত ৬১ জন) মিলে তৃতীয় কোনো প্রার্থীকে মনোনীত করার অনুরোধ জানাতে পারেন।

সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে এবং অচলাবস্থা না কাটলে নেসেট আনুষ্ঠানিকভাবে ভেঙে দেয়া হবে এবং ৯০ দিনের মধ্যে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ইসরাইলি ভোটারদের কাছে এটি নতুন কিছু নয়; ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে দেশটিতে পাঁচবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

নতুন সরকার গঠিত না হওয়া পর্যন্ত বেনইয়ামিন নেতানিয়াহুই অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাবেন। ফলে জোট গঠনের প্রক্রিয়া যত দীর্ঘায়িত হবে, পরবর্তী সরকারে জায়গা না পেলেও ইসরাইলের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করা এই প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় থাকার মেয়াদ আরও কয়েক মাস বেড়ে যাবে।

এএম