ডেমোক্র্যাটদের প্রতীক যেভাবে গাধা হলো
ডেমোক্র্যাটিক পার্টির গাধা প্রতীকের সূত্রপাত ১৮২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারের সময়। ওই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন ১৮১২ সালের যুদ্ধের নায়ক অ্যান্ড্রু জ্যাকসন, যিনি পরবর্তী সময়ে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
জ্যাকসনের নির্বাচনি স্লোগান ছিল ‘জনগণকে শাসন করতে দাও’। জনতুষ্টিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও একগুঁয়ে স্বভাবের কারণে বিরোধীরা তাকে ব্যঙ্গ করে গাধা (জ্যাকঅ্যাস) বলে ডাকতে শুরু করে। তবে এই বিদ্রূপে ক্ষুব্ধ না হয়ে উল্টো মজা পান জ্যাকসন। তিনি নিজের নির্বাচনি পোস্টারে গাধার ছবি যুক্ত করে নেন। ওই নির্বাচনে তৎকালীন ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট জন কুইন্সি অ্যাডামসকে পরাজিত করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন জ্যাকসন।
কার্টুনিস্ট টমাস নাস্টের ভূমিকা
অ্যান্ড্রু জ্যাকসনের সময় গাধা প্রতীকের সূচনা হলেও পুরো ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রতীক হিসেবে এটিকে জনপ্রিয় করে তোলেন জার্মান বংশোদ্ভূত প্রভাবশালী রাজনৈতিক কার্টুনিস্ট টমাস নাস্ট। তাকে আধুনিক রাজনৈতিক কার্টুনের জনক বলা হয়।
১৮৭০ সালে হার্পারস উইকলি সাময়িকীতে নাস্টের আঁকা একটি কার্টুনে মৃত এক সিংহকে জীবন্ত একটি গাধার লাথি মারার দৃশ্য দেখানো হয়। সেখানে গাধাটি দিয়ে গৃহযুদ্ধের বিরোধিতাকারী ও তাৎক্ষণিক শান্তির আহ্বান জানানো উত্তরাঞ্চলীয় ডেমোক্র্যাটদের চরমপন্থি অংশের সংবাদপত্রগুলোকে (কপারহেড পেপারস) বোঝানো হয়। আর মৃত সিংহটি দিয়ে বোঝানো হয়েছিল আব্রাহাম লিংকনের সদ্য প্রয়াত যুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী ই এম স্ট্যান্টনকে। নাস্ট মনে করেছিলেন, ডেমোক্র্যাটিক সংবাদমাধ্যম স্ট্যান্টনকে অসম্মান করছে। নাস্টের এই কার্টুনের পরই গাধা প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে পুরো ডেমোক্র্যাটিক পার্টির স্বীকৃত প্রতীক হিসেবে মার্কিনদের মনে জায়গা করে নেয়।
রিপাবলিকানদের প্রতীক হাতি এল কীভাবে
১৮৫৪ সালে রিপাবলিকান পার্টি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এর ছয় বছর পর ১৮৬০ সালে দলটি থেকে প্রথম প্রেসিডেন্ট হিসেবে হোয়াইট হাউসে যান আব্রাহাম লিংকন। লিংকনের ১৮৬০ সালের নির্বাচনি প্রচারের সময় ইলিনয়ের একটি সংবাদপত্রে এবং গৃহযুদ্ধের সময় অন্তত একটি রাজনৈতিক কার্টুনে রিপাবলিকানদের প্রতীক হিসেবে হাতির ছবি ছাপা হয়েছিল। গৃহযুদ্ধের সময় সৈন্যরা সরাসরি যুদ্ধের মুখোমুখি হওয়া বোঝাতে হাতি দেখার বাগ্ধারা ব্যবহার করতেন।
তবে রিপাবলিকানদের প্রতীক হিসেবে হাতি স্থায়ী রূপ পায় টমাস নাস্টের হাত ধরেই। ১৮৭৪ সালে হার্পারস উইকলিতে প্রকাশিত এক কার্টুনে তিনি হাতিকে রিপাবলিকানদের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেন। ওই সময় গুঞ্জন উঠেছিল যে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইউলিসিস এস গ্রান্ট তৃতীয় মেয়াদে নির্বাচনের কথা ভাবছেন (১৯৫১ সালে ২২তম সংশোধনীর আগে প্রেসিডেন্টের মেয়াদের সীমা নির্ধারিত ছিল না)।
গ্রান্টের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন নাস্ট। গ্রান্টের সম্ভাব্য তৃতীয় মেয়াদের প্রার্থিতার তীব্র সমালোচনা করেছিল সংবাদপত্র নিউ ইয়র্ক হেরাল্ড। এর জবাবে আঁকা কার্টুনে নাস্ট বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীকে নানা প্রাণীর রূপ দেন, যেখানে একটি গর্তের কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকা হাতির গায়ে লেখা ছিল ‘রিপাবলিকান ভোট’। গ্রান্ট শেষ পর্যন্ত নির্বাচন না করলেও নিউ ইয়র্ক হেরাল্ডের সমালোচনার প্রভাবে নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ হারায় রিপাবলিকানরা। পরে হতাশ নাস্ট আরেকটি কার্টুন আঁকেন, যেখানে দেখা যায় গাধার পাতা ফাঁদে আটকা পড়েছে একটি হাতি।
১৮৭০-এর দশকে নাস্ট আরও বেশ কিছু কার্টুনে রিপাবলিকানদের বোঝাতে হাতি ব্যবহার করেন। ১৮৮০ সাল নাগাদ অন্যান্য কার্টুনিস্টরাও দুটি দলকে বোঝাতে গাধা ও হাতির ব্যবহার শুরু করেন এবং প্রতীক দুটি স্থায়ী রূপ পায়।
গাধা ও হাতির বাইরে ১৮৭১ সালে নিউ ইয়র্কের দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদ উইলিয়াম টুইড ও তার রাজনৈতিক বলয় তামানি হলের বিরুদ্ধে আঁকা কার্টুনে হিংস্র বাঘের প্রতীক ব্যবহার করে খ্যাতি পান নাস্ট। রাজনীতির বাইরে সান্তা ক্লজের আধুনিক অবয়ব তৈরির কৃতিত্বও দেয়া হয় তাকে।
দুই প্রতীকের অর্থ ও নকশা
ডেমোক্র্যাটদের কাছে গাধা কঠোর পরিশ্রম, নিষ্ঠা, বিনয় ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি নিবেদনের প্রতীক। তবে রিপাবলিকানরা এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে গাধাকে একগুঁয়েমির প্রতীক হিসেবে দেখে।
অন্যদিকে রিপাবলিকানদের কাছে হাতি বুদ্ধিমত্তা, মর্যাদা ও শক্তির প্রতীক (কারণ হাতিকেই একমাত্র প্রাণী হিসেবে দেখা হয়, যা সিংহের সামনে রুখে দাঁড়াতে পারে)। বিপরীতে ডেমোক্র্যাটরা এই হাতিকে সার্কাসের প্রাণীর সঙ্গে তুলনা করে থাকে।
দুই দলের এই দুটি প্রতীকেই মার্কিন পতাকার নির্ধারিত রং ও তারকা ব্যবহার করা হয়। সাধারণত রিপাবলিকানদের হাতির লোগোতে ৩টি এবং ডেমোক্র্যাটদের গাধার লোগোতে ৪টি তারকা থাকে।
—হিস্টোরি ডটকম ও সিএনএনের প্রতিবেদনে অবলম্বনে





