গত ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে ১২০ আসনের পার্লামেন্টে (নেসেট) সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন কোনো পক্ষই এককভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি। এর ফলে দেশটিতে দীর্ঘ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। নির্বাচনে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোটের আসন কমে দাঁড়িয়েছে ৫৩টিতে, যার ফলে তাদের পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার কোনো স্পষ্ট পথ নেই। অন্যদিকে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট এককভাবে পেয়েছে ৪৮টি আসন। তবে নির্বাচনে রেকর্ড ভোট পাওয়া দুই আরব দল জয়েন্ট লিস্ট ও রামের ১৯টি আসনের সমর্থন পেলে বিরোধী শিবিরের মোট আসন দাঁড়ায় ৬৭টিতে, যা সরকার গঠনের জন্য স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা এনে দেয়।
২০২১ সালে আরব দল রামকে সঙ্গে নিয়েই গঠিত জোটের কাছে ক্ষমতা হারিয়েছিলেন নেতানিয়াহু। সংশ্লিষ্টদের মতে, এবারও যাতে আরব ও ইহুদি দলগুলো মিলে নতুন কোনো জোট সরকার গঠন করতে না পারে, সেজন্যই আরব দলগুলোর রাজনৈতিক বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ করার কৌশল নিয়েছেন নেতানিয়াহু। নেতানিয়াহুর এই অভিযোগের জবাবে বৃহস্পতিবার এক ভিডিও বার্তায় গাদি আইজেনকোট বলেন, ‘তারা নির্বাচনে হেরে গেছে বলেই এসব করছে।’
নির্বাচনের আগেই অবশ্য এই প্রচারণার প্রস্তুতি শুরু করেছিল নেতানিয়াহুর দল লিকুদ এবং কট্টর ডানপন্থি বেজালেল স্মোট্রিচের রিলিজিয়াস জায়নিস্ট পার্টি। তারা আরব এলাকাগুলোর ভোটকেন্দ্রে প্রায় দুই হাজার পর্যবেক্ষক মোতায়েনের ঘোষণা দিয়ে ভোটকেন্দ্রগুলোকে সম্ভাব্য জালিয়াতির ক্ষেত্র হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করে। নির্বাচনের দিন সকালে পুলিশ রাম দলের তিন কর্মীকে কথিত ভোট কেনার অভিযোগে গ্রেপ্তার করে। পরে ইসরাইলের চ্যানেল ১২ জানায়, স্বয়ং নেতানিয়াহুর চিফ অব স্টাফ পুলিশপ্রধানকে সরাসরি বিষয়টি জানিয়েছিলেন। পরে আদালত পুলিশি বিধিনিষেধের বেশিরভাগ আবেদন খারিজ করে দেন এবং আসামিদের কয়েকজনকে ছেড়ে দেয়া হয়।
ভোট গণনার পর এই বিতর্ক আরও জোরালো রূপ নেয়। লিকুদ পার্টি দাবি করে, তারা আরব দলগুলোর বিরুদ্ধে ঘুষ, হুমকি ও জালিয়াতির শত শত সাক্ষ্য জমা দিয়েছে। কট্টর ডানপন্থি নেতা ইতামার বেন-গভির ও স্মোট্রিচ আরব নেতাদের গ্রেপ্তারের দাবি তোলেন। বেন-গভির অভিযোগ করেন, কাতার থেকে অর্থ এনে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে আনা হয়েছে। তবে কাতার এই অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করে একে ‘হাস্যকর ও বিপজ্জনক’ বলে মন্তব্য করেছে। এর মধ্যে সেন্ট্রাল ইলেকশনস কমিটির চেয়ারম্যান ও সুপ্রিম কোর্টের ডেপুটি প্রধান বিচারপতি নোয়াম সোলবার্গের একটি ফাঁস হওয়া চিঠি প্রকাশ্যে আসে, যেখানে তিনি অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেতের প্রধান ডেভিড জিনির কাছে বিদেশি অর্থায়নের অভিযোগ খতিয়ে দেখার অনুরোধ জানান। পরে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পরই জিনি এমন চিঠি পাঠাতে বলেছিলেন। রোববার নেতানিয়াহু নিজে এক ডানপন্থি কর্মীর ভিডিও শেয়ার করে নির্বাচন বাতিলের আহ্বান জানান।
তবে ইসরাইলের প্রধান নির্বাচন কর্তৃপক্ষ নেতানিয়াহুর তোলা ব্যাপক কারচুপির দাবি পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে। সেন্ট্রাল ইলেকশনস কমিটি আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়, নির্বাচনে পদ্ধতিগত কারচুপি বা অনিয়মের কোনো প্রমাণ নেই। রোববার নির্বাচন কমিটির চেয়ারম্যান, শিন বেত প্রধান ও অ্যাটর্নি জেনারেল যৌথ বিবৃতি দিয়ে জানান, নির্বাচন যথাযথ ও নিয়ম মেনেই হয়েছে। বিদেশি অর্থায়নের অভিযোগ প্রমাণিত হলেও তা নির্বাচনের ফলাফলে কোনো প্রভাব ফেলবে না। বিচারপতি নোয়াম সোলবার্গ বলেন, ‘ব্যালট বাক্সে দেয়া আপনাদের রায় বহাল রাখা হবে।’
বিরোধী দলগুলো জানিয়েছে, তারা যে কোনো তদন্তের পক্ষে হলেও নেতানিয়াহুর এই প্রচারণাকে ফলাফলে হস্তক্ষেপের অপচেষ্টা হিসেবে দেখছে। আইজেনকোট এটিকে নির্বাচনকে বিতর্কিত করার ‘ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র’ বলে আখ্যা দেন। বামপন্থি ডেমোক্র্যাটস দলের নেতা ইয়ার গোলান বলেন, ব্যালটে পরাজয় মেনে নিতে না পারা একনায়করাই এমন আচরণ করে থাকে। অন্যদিকে জয়েন্ট লিস্ট এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, কোনো অপপ্রচারই আরব জনগণের অর্জনকে মুছে দিতে পারবে না এবং ভোটারের রায় পরিবর্তনের ক্ষমতা কারও নেই।





