দেশে শিশু নিখোঁজ-হত্যার ঘটনার সঙ্গে বাড়ছে উদ্বেগ

বিশেষ প্রতিবেদন
0

প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও শিশু নিখোঁজ হচ্ছে, আর তাদের একটি বড় অংশ ফিরছে নিথর দেহে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম মুন অ্যালার্টের তথ্য অনুযায়ী, কেবল সেপ্টেম্বরের প্রথম ১০ দিনেই সারা দেশে ৪৬ জন শিশু নিখোঁজ হয়েছে; যাদের মধ্যে ১১ জনকে জীবিত এবং ৪ জন মৃত উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া এখনও নিখোঁজ আছে ৩১টি শিশু। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার না হলে অপরাধপ্রবণতা কমবে না। কিন্তু পরিবারের অভিযোগ, থানায় গেলে পুলিশ জিডি নিতে গড়িমসি করে; যা অনেক শিশুর জন্যই কাল হয়ে দাঁড়ায়।

অপ্রতিম কিংবা সুনামগঞ্জের তিন শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু কেবল কিছু বিচ্ছিন্ন সংখ্যা নয়, বরং এটি আমাদের পুরো সমাজ ব্যবস্থার একটি গভীর ও আর্তনাদময় চিত্র। ঘরের ভেতরে কিংবা বাইরে— শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা বাড়ছেই।

কুমিল্লায় ১৩ বছরের অপ্রতিমের নিথর দেহ কিংবা সুনামগঞ্জে অচেতন বাবার পাশ থেকে তিন ভাই-বোনের মর্মান্তিক মৃত্যু—এসব কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধের ঘটনা নয়। এগুলো আমাদের সমাজ ব্যবস্থার এমন এক গভীর ফাটলের চিত্র তুলে ধরে, যেখানে ঘরের ভেতর কিংবা বাইরে কোথাও নিরাপদ নয় একটি শিশু।

প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও শিশু নিখোঁজ হচ্ছে, আর তাদের কেউ কেউ ফিরছে নিথর দেহে। এই নির্মম বাস্তবতার পেছনে লুকিয়ে আছে প্রাতিষ্ঠানিক উদাসীনতা, আইনি জটিলতা এবং সামাজিক অবক্ষয়ের এক অন্ধকার গল্প।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম মুন অ্যালার্টের তথ্য মতে, সেপ্টেম্বরের ১০ দিনে সারাদেশে ৪৬ জন শিশু হারিয়েছে যাদের মধ্যে ১১ জন জীবিত এবং ৪ জনকে মৃত উদ্ধার করা হয়েছে , এখনও নিখোঁজ ৩১ জন। তারা বলছে, নিখোঁজ শিশু উদ্ধারের ক্ষেত্রে প্রথম তিন ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ের মধ্যে তৎপরতা শুরু করলে শিশুকে উদ্ধার করা সহজ হয়।

মুন অ্যালার্ট ও জিরো মিসিং চিলড্রেন ফাউন্ডেশনের সভাপতি মো. সাদাত রহমান বলেন, ‘গত ২০ বছরে নিখোঁজ শিশুদের জন্য বাংলাদেশে ওইভাবে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। পুলিশের মধ্যে আসলে এই ডোমেইনে কাজ করার একটা অনাগ্রহ আমরা দেখছি যে, একটা বাচ্চা নিখোঁজ হয়েছে, উদ্ধারের জন্য যত ক্যাপাসিটি থাকা দরকার, সেটি নেই। আমাদের শিশুদের সুরক্ষার জন্য যদি এরকম বিশেষ একটি ইউনিট থাকে, ওদের কাজই হবে শুধু “ক্রাইম এগেইন্সট চিলড্রেন” নিয়ে। তাহলে আমরা এই বাচ্চাগুলোকে উদ্ধার করতে পারবো। কেননা এই নিখোঁজদের মধ্যে অনেকে তো দুনিয়া থেকেই নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছে।’

নিখোঁজের পর থানায় জিডি নিতে পুলিশ অনীহা দেখায় বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। তাদের দাবি, ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে আগে আত্মীয়স্বজনের বাড়ি খুঁজে আসার পরামর্শ দেয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধের পরিসংখ্যান কম দেখাতে থানা-পুলিশ নিখোঁজের জিডি ও মামলা নিতে গড়িমসি করে। নিখোঁজ শিশুদের পরিবারগুলো যখন থানার দ্বারে দ্বারে ঘুরেও তাৎক্ষণিক সাড়া পায় না, তখন সেই বিলম্বই অনেক শিশুর জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।

আরও পড়ুন:

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের কেবল প্রথম আট মাসেই সারা দেশে ২৫৪ শিশু খুন হয়েছে। এর মধ্যে নিখোঁজের পর মরদেহ উদ্ধার হয়েছে ৩৬ শিশুর এবং ২৪ শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছর সাত মাসে দেশে ৭২ হাজার ৪৮৯টি শিশু নিখোঁজের ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি হয়েছে। এর মধ্যে শুধু ২০২৫ সালেই নিখোঁজ হয়েছে ২২ হাজার ৫৫০ শিশু।

পুলিশের তথ্যমতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত শূন্য থেকে ৯ বছর বয়সী ৬৮ জন এবং ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী ১ হাজার ৯৭০ জন শিশু এখনও উদ্ধার হয়নি।

পুলিশ জানায়, ছোট শিশুরা সাধারণত পথ ভুলে হারিয়ে গেলেও কিশোর-কিশোরীরা অভিমান, পারিবারিক কলহ বা স্বাধীন জীবনযাপনের আশায় ঘর ছাড়ে। তবে অনেক ক্ষেত্রেই এই নিখোঁজের পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এ.এইচ.এম. শাহাদাত হোসাইন বলেন, ‘আমরা এই জাতীয় অপরাধ সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখে থাকি, কারণ শিশুরাই ভবিষ্যৎ। অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে আমাদের প্রতিটি ইউনিটকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। আমরা সমাজের সর্বস্তরের মানুষ যদি এই বিষয়ে সতর্ক থাকি এবং সন্তানদের খোঁজখবর রাখি, আমার মনে হয় এই ধরনের অপরাধ দমন সম্ভব।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি সমাজের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বড়দের বিরোধ বা হিংসার শিকার হচ্ছে শিশুরা। এসব ঘটনার দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার না হলে অপরাধপ্রবণতা কমবে না। তাদের মতে, রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার—শিশুদের জন্য আজ এক আস্থার সংকটে পরিণত হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক উদাসীনতা কাটানো, পুলিশের দ্রুত পদক্ষেপ এবং একটি শিশুবান্ধব সমাজ গড়ে তোলা ছাড়া এই বিভীষিকা থেকে মুক্তির কোনো উপায় নেই।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অবসরপ্রাপ্ত) শামসুল হায়দার সিদ্দিকী বলেন, ‘এটা একটা সামাজিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই জিনিসটা একদিনে হয়নি, ধীরে ধীরে হয়েছে। সবাই যদি একসঙ্গে কাজ করি তাহলে এই জিনিসটা ধীরে ধীরে দূর হবে। কিন্তু সবাই সচেতন হতে হবে। এটা একা কারও পক্ষে সম্ভব নয়।’

এসএইচ