২ কোটি ৮৭ লাখের বেশি বরাদ্দ; ভোটের পর অচল নীলফামারীর সিসি ক্যামেরা

নীলফামারী
ভোটের জন্য স্থাপিত সিসি ক্যামেরা
এখন জনপদে
0

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা ও নজরদারির জন্য নীলফামারীতে সিসি ক্যামেরা স্থাপনে ২ কোটি ৮৭ লাখ টাকার বেশি বরাদ্দ দেয়া হলেও এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। উপজেলা পর্যায়ে ৮৭ লাখ ৫৭ হাজার ৬০০ টাকা এবং জেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল দুই কোটির বেশি টাকা। অথচ নির্ধারিত সংখ্যার তুলনায় কম ক্যামেরা বসানো এবং এরই মধ্যে বেশ কিছু ক্যামেরা নষ্ট হয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

প্রশ্ন উঠেছে, আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তায় এসব ক্যামেরা কতটা কাজে আসবে।

২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নীলফামারীর চারটি আসনে ৫৬২টি কেন্দ্রে ভোট হয়। এর মধ্যে ২৫৮টি কেন্দ্রকে গুরুত্বপূর্ণ এবং ৭০টি কেন্দ্রকে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। এসব কেন্দ্রে বাড়তি নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেয়া হয়।

ভোটকেন্দ্র নজরদারির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বা গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে প্রতি কেন্দ্রে ছয়টি করে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের বরাদ্দ ছিলো ৩২ হাজার ৮০০ টাকা। কিন্তু মাঠপর্যায়ে গিয়ে দেখা গেছে, কোথাও দুইটি, কোথাও তিনটি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী অনেক কেন্দ্রে শুধু প্রিজাইডিং কর্মকর্তার কক্ষ ও কেন্দ্রের বাইরের অংশে ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।

একটি ভোটকেন্দ্রের শিক্ষক জানিয়েছেন, স্কুলটা নির্বাচনি কেন্দ্র। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এখানে নির্দেশনা অনুযায়ী দুইটি সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে। স্থানীয়ভাবে তাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বলেছে, বুথে সিসি ক্যামেরার দরকার নেই। প্রিজাইডিং কর্মকর্তা যে রুমে থাকবেন, অফিস কক্ষে একটি সিসি ক্যামেরা আর বাইরে একটি সিসি ক্যামেরা।

অর্থাৎ কাগজে-কলমে ছয়টি ক্যামেরার বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে সব কেন্দ্রে সে অনুযায়ী সরঞ্জাম স্থাপন হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

শুধু কম ক্যামেরা বসানোতেই শেষ নয়, নির্বাচনের কয়েক মাস পর অনেক কেন্দ্রের ক্যামেরাই এখন অচল। ফলে যে প্রযুক্তি ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা ও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে ব্যবহারের কথা ছিল, সেটিই এখন অনেক স্থানে কার্যত অকার্যকর।

আরও পড়ুন:

আরেক শিক্ষক জানিয়েছেন, নির্বাচনের আগেই তার স্কুলে তিন বছর থেকে তিনটি সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে। বর্তমানে এগুলো অচল হয়ে পড়ে আছে। এটি একটি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র। এখানে সিসি ক্যামেরাগুলো মেরামত করা জরুরি।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও আশঙ্কা, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী বেশি থাকায় সংঘাত বা বিশৃঙ্খলার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই ভোটকেন্দ্রে কার্যকর ক্যামেরা ব্যবস্থা আরও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তারা।

নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার কাশিরাম বেলপুকুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান লাঞ্চু চৌধুরী বলেন, ‘এখানে অনেক প্রার্থী হয়। অনেক মেম্বার প্রার্থী, অনেক মহিলা মেম্বার। একটা সেন্টারে দেখবেন ১০-১৫ জন প্রার্থীর লোকজন আছে। দাঙ্গা, মারামারি, হুড়োহুড়ি হতে পারে। এজন্য সিসি ক্যামেরা অতিজরুরি। বিশেষ করে আরও বেশি বাড়ানো দরকার।’

তবে ক্যামেরা কেনা, স্থাপন ও বরাদ্দের হিসাব নিয়েই উঠেছে বড় প্রশ্ন। মাঠপর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, একটি ব্যবহৃত সিসি ক্যামেরার দাম আনুমানিক ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। অথচ একটি কেন্দ্রের জন্য ৩২ হাজার ৮০০ টাকা বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে। কোথায় কতটি ক্যামেরা বসানো হয়েছে, কত টাকা খরচ হয়েছে এবং অবশিষ্ট অর্থের কী হয়েছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা।

নীলফামারী সদরের উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা জছিজুল আলম মন্ডল বলেন, ‘সব স্কুলে ৬টি করে লাগানোর নির্দেশনা আমরা পাইনি। আমাদের বলা হয়েছিল, বাইরের অংশ এবং প্রিজাইডিং অফিসারের রুম কভার করার জন্য ক্যামেরা দিতে। আমরা সে অনুযায়ী বাইরের অংশ এবং প্রিজাইডিং অফিসারের রুম কভার করেছি।’

তবে নীলফামারী সদরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুবাশ্বিরা আমাতুল্লাহ বলেন, ‘বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমরা ৪টি করে ক্যামেরা দিয়েছি। কোথাও যদি মনে হয়েছে আগের হিস্ট্রি একটু খারাপ আছে বা কক্ষ সংখ্যা বেশি আছে, সেক্ষেত্রে পাঁচটা, এমনকি ৬টিও দিয়েছি।’

আরও পড়ুন:

দুই কর্মকর্তার বক্তব্যে ক্যামেরার সংখ্যা ও স্থাপনের বিষয়ে ভিন্নতা স্পষ্ট। ফলে কোন কেন্দ্রে কতটি ক্যামেরা বসানো হয়েছিল এবং বরাদ্দের অর্থ কীভাবে ব্যয় হয়েছে, তা নিয়ে স্বচ্ছ হিসাবের দাবি উঠেছে।

ফলে জাতীয় নির্বাচনের সময় কেনা বা স্থাপন করা ক্যামেরাগুলোর কী অবস্থা, কতগুলো সচল রয়েছে এবং সেগুলো স্থানীয় নির্বাচনে পুনর্ব্যবহার করা যাবে কি না, সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে।

জাতীয় নির্বাচনের সরঞ্জাম কেনায় অনিয়মের অভিযোগেরও তদন্ত দাবি করেছেন নীলফামারী সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সভাপতি মো. আকতারুল আলম। তিনি বলেন, ‘দুইটা ক্যামেরা ৬ হাজার টাকা দিয়ে স্থাপন করে বাকি ৩০ হাজার টাকা তাহলে কোথায় গেল? এখানে অবশ্যই অনিয়ম হয়েছে, এখানে অবশ্যই দুর্নীতি হয়েছে। সরকারি বরাদ্দ তো জনগণেরই টাকা। এত পরিমাণ টাকা আবার নতুন করে বরাদ্দ হবে, আবার ক্যামেরা লাগানো হবে, এটা আমরা চাই না। এর সঠিক তদন্ত হওয়া দরকার।’

স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা ব্যবহারের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম বলেছেন, স্থানীয় নির্বাচনে সব কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা রাখার ব্যবস্থা করা হবে। একই সঙ্গে বডি ওর্ন ক্যামেরা বাড়ানো এবং ড্রোন ব্যবহারের কথাও জানিয়েছেন তিনি।

এদিকে, নির্বাচন কমিশনের হিসাবে, ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচন উপলক্ষে দেশের ঝুঁকিপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের জন্য মোট প্রায় ৭২ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল।

এসএস