সুজানগরে যুবদলের নেতায় ‘ভয়ে’ অফিসে যান না উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা

সুজানগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
এখন জনপদে
0

‎পাবনার সুজানগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের টেন্ডার বাতিলের দাবিতে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সুপ্রভা রাণীকে তার কার্যালয়ে আড়াই ঘণ্টার বেশি সময় অবরুদ্ধ করে রাখার অভিযোগ উঠেছে উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক সিদ্দিকুর রহমান পিন্টুর বিরুদ্ধে। এসময় তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন ওই চিকিৎসক। ঘটনার পর নিরাপত্তাহীনতা ও প্রাণভয়ে তিনি কর্মস্থলে যেতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন।

‎গত মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) দুপুরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এ ঘটনা ঘটে।

‎তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন যুবদল নেতা সিদ্দিকুর রহমান পিন্টু। তার দাবি, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রতিবাদ জানাতে তারা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার কাছে গিয়েছিলেন। কাউকে অবরুদ্ধ করা কিংবা প্রাণনাশের হুমকি দেয়ার ঘটনা ঘটেনি।

‎স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. সুপ্রভা রাণী জানান, গত ১০ সেপ্টেম্বর ই-জিপি পদ্ধতিতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এমএসআর খাতের ছয়টি প্যাকেজে ৮০ লাখ ৭৬ হাজার টাকার দরপত্র আহ্বান করা হয়। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পরামর্শ ও ই-জিপি নীতিমালা অনুসরণ করে অনলাইনে দরপত্র মূল্যায়ন করা হয়। এতে গত ২ নভেম্বর চারটি প্রতিষ্ঠান কাজ পায়। এরপর স্থানীয় কয়েকজন নেতা দরপত্রের শর্ত কঠিন হয়েছে দাবি করে তা বাতিলের জন্য চাপ দিতে থাকেন।

‎তিনি জানান, মঙ্গলবার কনফারেন্স রুমে একটি সভায় ব্যস্ত ছিলেন তিনি। এসময় সিদ্দিকুর রহমান পিন্টুর নেতৃত্বে আট থেকে দশজনের একটি দল তার দাপ্তরিক কক্ষে গিয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে এবং সিসি ক্যামেরা ঘুরিয়ে দেয়। পরে তার কক্ষে প্রবেশ করে ছিটকিনি লাগিয়ে দরপত্র বাতিলের জন্য চাপ দেয়া হয়।

‎ডা. সুপ্রভা রাণী বলেন, ‘আমাকে নিয়মবহির্ভূতভাবে পুনরায় দরপত্র আহ্বান করার জন্য চাপ দেয়া হচ্ছিলো। আমি রাজি না হওয়ায় তারা নানাভাবে ভয়ভীতি দেখান। এমনকি অফিসের বাইরে দেখে নেয়ার হুমকিও দেন। আমি চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। প্রাণনাশের আশঙ্কায় বর্তমানে কর্মস্থলে যেতে পারছি না।’

‎তিনি আরও জানান, বিষয়টি মৌখিকভাবে স্থানীয় প্রশাসনকে জানিয়েছেন। পাশাপাশি পাবনার সিভিল সার্জনের কাছে লিখিত অভিযোগ দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

‎নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী জানান, মঙ্গলবার দীর্ঘ সময় ধরে স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে তার কক্ষে আটকে রেখে দরপত্র বাতিলের জন্য চাপ দেয়া হয়। তবে নিরাপত্তার কারণে তারা প্রকাশ্যে এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।

আরও পড়ুন:

‎হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. ওয়াসিম খান বলেন, ‘যারা টেন্ডার পাননি, তারা মঙ্গলবার ম্যাডামকে বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞাসা করছিলেন। এসময় চিৎকার-চেঁচামেচিও হচ্ছিলো। আমি ওপর থেকে নেমে এসে দেখি, সিসি ক্যামেরা উল্টানো। পরে থানায় খবর দিলে ওসি সাহেব আসেন।’

‎দরপত্র প্রক্রিয়া নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি মূল্যায়ন কমিটির সদস্য হলেও দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার বিষয়টি আমাকে জানানো হয়নি। কোনো অনিয়মের অভিযোগ থাকলে তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো যেতে পারে। কিন্তু এভাবে হাসপাতালে চিৎকার-চেঁচামেচি করা প্রত্যাশিত নয়।’

‎অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক সিদ্দিকুর রহমান পিন্টু বলেন, ‘টেন্ডার প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে। বৈধ ঠিকাদারি লাইসেন্স থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় কাউকে কাজ না দিয়ে গোপনে অন্য জেলা, বিশেষ করে ঝিনাইদহ থেকে লোক এনে কমিটি করা হয়েছে। এছাড়া বিশেষ কিছু শর্ত জুড়ে দেয়া হয়েছে।’

‎তিনি বলেন, ‘আমরা শুধু নিয়মের কথা বলতে গিয়েছিলাম। তাকে অবরুদ্ধ করা হয়নি কিংবা প্রাণনাশের হুমকিও দেয়া হয়নি। ওসি সাহেবও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। নিজের দুর্নীতি আড়াল করতেই ওই কর্মকর্তা এখন মিথ্যা অভিযোগ তুলছেন।’

‎পাবনার সিভিল সার্জন আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘সুজানগরে নিয়ম মেনেই টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে বলে আমি জানি। সম্প্রতি টেন্ডার না পেলে বিভিন্ন দপ্তরে এ ধরনের হেনস্তা ও হয়রানিমূলক আচরণ করা হচ্ছে। এর আগে আমিও এ ধরনের হেনস্তার শিকার হয়েছি। এগুলো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’

‎তিনি বলেন, ‘আপাতত ওই স্বাস্থ্য কর্মকর্তা কয়েক দিন নিরাপদে থাকুন। এ বিষয়ে আমরা দ্রুত প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেবো।’

‎সুজানগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোজাফফর হোসেন বলেন, ‘ঘটনার দিন হাসপাতাল থেকে ফোন করে আমাকে ডাকা হয়। সেখানে গিয়ে কয়েকজনকে দেখতে পাই। তবে স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে—এমন কোনো অভিযোগ তিনি আমাকে জানাননি। পরে আমি নামাজ পড়তে যাওয়ার পর জানতে পারি, তিনি চলে গেছেন। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত লিখিত বা মৌখিক কোনো অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

এসএস