পাকা ধানের ঘ্রাণে নবান্নের অপেক্ষায় গ্রামবাংলা

ধান খেত
কৃষি
এখন জনপদে
0

ঝরা শরতের কাশ আর শীতের মাঝে ক্ষণস্থায়ী ঋতু হেমন্ত। ধানের ক্ষেতে কৃষকের খাটুনি, মাঠে সোনালি ঢেউ, বাতাসে পাকা ধানের গন্ধ। সঙ্গে নতুন ফসলের প্রস্তুতি। বাতাসে হিমেল পরশ, কুয়াশার আবছায়া ওড়না। ধানের পাতায়, ঘাসের ডগায় শিশির যেন মুক্তোদানা; মাঠজুড়ে ঐশ্বর্যের হীরকদ্যুতি। শিশিরভেজা ধানের শীষে কার্তিকের ভোর যেন সোনার আলপনা। মাঠে কৃষকের তোড়জোড়, জানান দিচ্ছে নবান্ন আসন্ন।

এই সময়টা প্রকৃতি যেন নতুন করে সাজে। তেমনি কৃষক আমিনুর রশিদের চোখে মুখেও স্বস্তির হাতছানি। ৪০ বিঘায় বুনেছেন স্বপ্নের বীজ। পরক্ষনেই তৃষ্ণার্ত মাটি আর সারের শূন্যতায় সংশয়ের ছায়া। ফলনের আশা-আশঙ্কার দোলাচল মনের কোনে।

কৃষক আমিনুর রশিদ বলেন, ‘সমস্যা এবার সার নাই, বিদ্যুৎ নাই। বিভিন্ন সমস্যা। খরচ জমিতে ধান চৌদ্দশ টাকা পইড়া যায়। আর বাজারে বিক্রি করতে গেলে ১১০০ টাকা এই অবস্থায় তো কৃষি কাজ করমু কেমনে মানুষ?’

বয়সের সন্ধ্যা নামলেও দেওয়ান বাদলের ছুটি নেই। মাঠে মাড়াইয়ের তালে ঝরছে সোনালি ধান, দম ফেলানোর ফুরসতের ফাঁকেই ভাবনা হেমন্তের এই সুরে কর্তীর ম্লান শাড়িতে কি ফিরবে রঙিন আভা?

অন্য একজন কৃষক বলেন, ‘এই বছর তো সার বিষ এই জিনিস তো ঠিকমতো পাওয়া যায় না। আমাদের একটু কষ্ট হয়। কারণ আমাদের তো কারেন্ট বিল দিতে হয়।’

দেশের মোট চাল উৎপাদনের প্রায় ৩৮ থেকে ৪০ শতাংশ আসে আমন মৌসুম থেকে। বিবিএসের তথ্য বলছে, গত পাঁচ বছরে ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে আমনের উৎপাদন। কিন্তু ডিজেলের দাম বাড়ায় বিঘাপ্রতি কৃষকের খরচও বেড়েছে দুই থেকে তিন হাজার টাকা। খরচ ওঠার দুশ্চিন্তা বুকে চেপে রেখেও কৃষক চেয়ে আছেন পিঠাপুলির উৎসবের পানে।

আরও পড়ুন:

শুধু ধান নয়, শীতের আগাম সবজিও কৃষকের ঘরে ফেরাচ্ছে স্বস্তির হাওয়া। এ সময় মাঠের যেন ছুটি নেই। মাটির বুকে লাল শাকের রক্তিম আভা, পালংয়ের সবুজ সারি; আরেক প্রান্তে আখ রোপণে ব্যস্ত কৃষকের হাত। মরা কার্তিকের দিন পেছনে ফেলে তাঁদের কণ্ঠে এখন ব্যস্ততার গল্প।

হেমন্ত আসে স্বস্তির বার্তা নিয়ে। আর্থিক সংকট কাটার সুযোগ নিয়ে। নতুন করে রচিত হয় জীবনের জয়গান।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘গ্রামের মানুষের মুখে হাসি ফুটবে, পিঠে পুলি শুরু হবে এবং মানুষ ধান বিক্রি করতে পারবে তখন এবং বাজারেও ধানের চালের সরবর হবে। কাজেই তখন স্বাভাবিকভাবেই মানুষের অবস্থা একটু ভালো হবে। এবং বিশেষ করে হেমন্তের শেষের দিকে গেলে দেখা যাবে যে তখন মূল্যস্ফীতিটা অনেকটা কমে আসে।’

আসন্ন বোরো মৌসুমে কৃষকের কষ্ট লাঘবে এখন থেকে কাজ করা প্রয়োজন বলে মত বিশেষজ্ঞদের। নইলে কৃষিতে হতাশার পারদ বাড়তেই থাকবে।

দেশে প্রতি বছর ১৬ লাখ মানুষ কৃষি পেশা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। হারভাঙা পরিশ্রমের পর যখন কৃষক তার ন্যায্য হিস্যা পায় না, তখন এই পেশায় কেনই বা থাকবেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের অর্থনীতির ভিত মজবুত করতে হলে কৃষকের প্রতি দায় ও দরদের সংস্কৃতি জরুরি।

এফএস