প্রতিবেদনে বলা হয়, নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখাটা ইরানের জন্য লাভজনকও। ইরানি কর্মকর্তারা বলেছেন, প্রণালি দিয়ে কিছু ট্যাংকারকে নিরাপদে যেতে দেয়ার বিনিময়ে তারা ফি আদায় অব্যাহত রাখবেন। ২৩ মার্চ লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্তত দুটি জাহাজ প্রণালি পার হতে বড় অঙ্কের অর্থ দিয়েছে।
শিপিং অ্যানালিটিকস প্রতিষ্ঠান ভর্টেক্সার তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালির সরু অংশে প্রস্থ প্রায় ২৪ মাইল। আর প্রায় সব চলাচল হয় দুটি প্রধান শিপিং লেন দিয়ে, যা আরও সংকুচিত। ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (আইআইএসএস)–এর নৌবাহিনী ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিষয়ক সিনিয়র ফেলো নিক চাইল্ডস বলেন, এটিকে ‘চোকপয়েন্ট’ বলা হয় যথার্থ কারণেই। তার ভাষ্যমতে, বিশ্বে অনেক চোকপয়েন্ট থাকলেও এটিকে বিশেষভাবে কঠিন বলা যায়, কারণ বিকল্প নেই।
রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউট থিঙ্ক ট্যাংকের জার্নাল সম্পাদক কেভিন রোল্যান্ডস বলেন, ‘সংকীর্ণ জলপথে জাহাজের ‘মুভমেন্ট’ অত্যন্ত সীমিত।’ তিনি আরও বলেন, ‘খোলা সমুদ্রে রুট বদলানোর সুযোগ থাকে; চোকপয়েন্ট বা সংকীর্ণ সমুদ্রে তা অসম্ভব।’ তিনি বলেন, ‘এর অর্থ হলো—ইরানকে লক্ষ্য খুঁজতে নাও হতে পারে; তারা বসে অপেক্ষা করতে পারে।’
রোল্যান্ডসের মতে, ‘এতে এক ধরনের ‘‘কিল জোন’’ তৈরি হয়, যেখানে হামলার সতর্কতার সময় কয়েক সেকেন্ডও হতে পারে।’
এছাড়া ইরানের প্রায় ১,০০০ মাইল উপকূলরেখা আছে, যেখান থেকে তারা জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে পারে। এসব ক্ষেপণাস্ত্র ব্যাটারি চলমান, ফলে এগুলো ধ্বংস করা কঠিন; দীর্ঘ উপসাগরীয় উপকূলরেখার কারণে ইরান প্রণালির বাইরেও আঘাত হানতে পারে।
রোল্যান্ডস বলেন, ‘ইরানের উত্তর দিকের ভূপ্রকৃতি সমতল নয়; সেখানে পাহাড়, উপত্যকা, ঘনবসতি এলাকা ও উপকূলীয় দ্বীপ আছে। এগুলো হুমকি শনাক্ত করা কঠিন করে ও চলমান অস্ত্রব্যবস্থা আড়াল করা সহজ করে।’
বিশ্লেষকদের মতে, ‘যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইরানের আক্রমণক্ষমতার কিছুটা অবক্ষয় ঘটেছে।’ তবে রোল্যান্ডস বলেন, ‘ঝুঁকি শূন্যে নামানো প্রায় অসম্ভব; কিছু সময় ধরে জাহাজগুলোকে এসব ব্যবস্থার কিছু বা সবকিছু থেকে অবশিষ্ট হুমকির মুখে থাকতে হবে।’
রোল্যান্ডসের মতে, ‘জাহাজ এসকর্টের কোনো অভিযান হলে তা কেবল যুদ্ধজাহাজের প্রচলিত কনভয় পদ্ধতির মধ্যে সীমিত না থেকে ‘‘লেয়ার্ড ডিফেন্স’’ পদ্ধতিতে যেতে পারে—স্যাটেলাইট, টহল বিমান ও আকাশপথের ড্রোন নজরদারি, এবং মাইনমুক্ত করা নির্দিষ্ট রুট ব্যবহারের মতো ব্যবস্থা থাকতে পারে।’
চাইল্ডস বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অনেক প্রচলিত নৌক্ষমতা দুর্বল করতে পেরেছে। তবে বড় হুমকি এখনো ইরানের ‘‘অপ্রচলিত’’ অস্ত্রভান্ডার থেকে—ড্রোন, দ্রুতগতির ছোট আক্রমণকারী নৌযান এবং বিস্ফোরকভর্তি অচালিত নৌকা।’
চাইল্ডস আরও বলেন, ‘ইরান যদি মাইন পাতে, তাহলে তা “নিরীহ দেখায় এমন” ডাউ (পালতোলা নৌকা)–এর পেছন দিক থেকেও ফেলে দেয়া সম্ভব।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র হয়তো ইরানের বড় সাবমেরিনগুলোর বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েছে, তবে ‘‘মিজেট সাবমেরিন’’ নিয়েও ভাবতে হতে পারে।’
আরও পড়ুন:
যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও বাহরাইনও এই জলপথে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল সুরক্ষার পরিকল্পনা তৈরির চেষ্টা করছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরে হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি ইরান অন্তত ১৯টি জাহাজে হামলা চালিয়েছে।’
বিশ্লেষকদের মতে, ‘বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্য বিঘ্নিত করার লক্ষ্য পূরণে ইরানকে জাহাজ ধ্বংস করতেই হবে—এমন নয়। হুমকি যদি যথেষ্ট উচ্চ থাকে, তাহলে শিপিং কোম্পানিগুলো চলাচল পুনরায় শুরু করার ঝুঁকি নেবে না। তবে ইরান, চীন, ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু জাহাজ প্রণালি পার হয়েছে।’
ইরান বলেছে, ‘শত্রুতাহীন জাহাজ’ ইরানি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করলে প্রণালি দিয়ে যেতে পারবে। লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্তত ১৬টি জাহাজ প্রণালি পার হয়েছে; এর মধ্যে একটি ২০ লাখ ডলার ফি দিয়েছে বলে ধারণা করা হয়। সেখানে ভেঙে ফেলা জাহাজের ভুয়া পরিচয়ে চলা কয়েকটি ‘জম্বি’ ট্যাংকারের কথাও বলা হয়। সিএনএন জানায়, তারা স্বাধীনভাবে এ প্রতিবেদন যাচাই করতে পারেনি।
আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের তথ্য অনুযায়ী, শেষ পর্যন্ত ট্যাংকার চলাচল পুরোপুরি শুরু হলেও জট কাটাতে সময় লাগবে; প্রায় ২,০০০ জাহাজ পারস্য উপসাগরের ভেতরে আটকা আছে।
এদিকে ট্রাম্প প্রশাসন কূটনৈতিক অগ্রগতির কথা বলছে। অন্যদিকে ইরান বলছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় নেই; তবে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদানের কথা তারা স্বীকার করেছে।
এ প্রেক্ষাপটে আরও মার্কিন মেরিন ও নাবিক মধ্যপ্রাচ্যের দিকে যাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। সিএনএনের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের দুই কর্মকর্তা জানান, ১১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট এবং বক্সার অ্যামফিবিয়াস রেডি গ্রুপ পথে আছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা সিএনএনকে বলেন, ইউএসএস ট্রিপোলি অ্যাসল্ট শিপের মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট (এমইইউ) মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হচ্ছে—কোথায় মোতায়েন হবে বা কী কাজে ব্যবহৃত হবে, তা না জানিয়ে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এমইইউ সাধারণত উচ্ছেদ অভিযান ও অ্যামফিবিয়াস অপারেশনে ব্যবহার হয়, যেখানে জাহাজ থেকে তীরে যাওয়ার মতো কার্যক্রম দরকার হয়। এতে ‘বুটস-অন-দ্য-গ্রাউন্ড’ অভিযানের জল্পনা বেড়েছে, যদিও ট্রাম্প প্রশাসন এখন পর্যন্ত বলেছে—ইরানে স্থল অভিযান তারা বাদ দিয়েছে।
সামরিক বিশ্লেষকেরা বলেছেন, ইউএসএস ট্রিপোলি ও অন্যান্য মেরিন সম্পদ এনে ‘হুমকি’ তৈরি করাই ইরানের হিসাব বদলাতে যথেষ্ট—এমন ধারণার ওপর যুক্তরাষ্ট্র নির্ভর করতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখা অব্যাহত থাকলে ইরানের তেল বাণিজ্যসংশ্লিষ্ট আরও স্থাপনায় হামলার হুমকিও দিচ্ছেন। গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী খার্গ দ্বীপের সামরিক স্থাপনায় হামলা চালায়; এই দ্বীপ দিয়ে দেশটির মোট অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ পরিচালিত হয়। তবে সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন দ্বীপের তেল বাণিজ্যসংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোতে হামলা হয়নি; ট্রাম্প সতর্ক করেছেন, সেগুলো পরবর্তী লক্ষ্য হতে পারে—যা পরিস্থিতি আরও তীব্র করতে পারে।





