তবে এ ব্ল্যাকআউট বা নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি কার্যকর হওয়ার আগেই এয়ারবাস, প্ল্যানেট ল্যাবস, সেন্টিনেল এবং ভ্যান্টরের মতো মহাজাগতিক ক্যামেরায় ধরা পড়েছে যুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসলীলা। আল জাজিরার ‘ওপেন সোর্স ইউনিট’ ইরান, লেবানন এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের এমন ১৫টি কৌশলগত স্থাপনার উপগ্রহ চিত্র বিশ্লেষণ করেছে, যা মহাকাশ থেকে এ যুদ্ধের প্রকৃত রূপ উন্মোচন করে।
নাতানজ পারমাণবিক কমপ্লেক্স (ইসফাহান): ইরানের বৃহত্তম এ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রে ২০২৫ সালের জুনে দুই দফায় হামলা চালানো হয়। প্রথমে ইসরাইল এবং পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র তাদের ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’-এর অংশ হিসেবে ফোরদো ও ইসফাহানের পাশাপাশি এখানেও ‘জিবিইউ-৫৭ বাঙ্কার বাস্টার’ বোমা দিয়ে হামলা চালায়।
চলতি বছরের মার্চের শুরুতে তোলা স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, যৌথ হামলায় ভূগর্ভস্থ সমৃদ্ধকরণ হলের দিকে যাওয়ার মূল ভবন, র্যাম্প এবং কর্মী ও যানবাহন চলাচলের প্রবেশপথগুলো সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত ও ধ্বংস হয়েছে।
সিরি দ্বীপের তেল শোধনাগার: ইরানের দক্ষিণ উপকূল থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এ দ্বীপটি দেশটির তেল রপ্তানির অন্যতম প্রধান বিকল্প রুট। গত ১৫ এপ্রিলের সেন্টিনেল-২ স্যাটেলাইটের ছবিতে দেখা গেছে, এখানকার তেল স্থাপনায় এক বিশাল অগ্নিকাণ্ড ঘটছে। ওপেন সোর্স ইউনিটের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ১০ লাখ ব্যারেল ধারণক্ষমতাসম্পন্ন প্রধান তেল মজুত ট্যাংকারটিতে সরাসরি আঘাত হেনেছে ক্ষেপণাস্ত্র। এর আগে খার্গ দ্বীপের মূল তেল টার্মিনালেও একই ধরনের হামলা চালানো হয়েছিল।
বন্দর আব্বাস সমুদ্রবন্দর: হরমুজ প্রণালি কাছে অবস্থিত এ ইরানি বন্দর নগরীতে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ১ এপ্রিলের মধ্যে প্ল্যানেট ল্যাবস ও এয়ারবাসের ক্যামেরায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র ধরা পড়েছে। এখানকার কমপ্লেক্সজুড়ে অন্তত ১১টি স্থানে মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন মিলেছে। ওপেন সোর্স ইউনিটের বিশ্লেষণে জানা গেছে, বন্দরের প্রধান গুদামঘর এবং নোঙর করে রাখা একটি যুদ্ধজাহাজ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ফাত বিমান ঘাঁটি (কারাজ): তেহরান থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত এ ঘাঁটিটি মূলত আইআরজিসি অ্যারোস্পেস ফোর্সের একটি প্রধান চালিকাশক্তি, যেখানে ঘাতক হেলিকপ্টার ও ড্রোন ইউনিট রয়েছে। গত ১০ এপ্রিলের এয়ারবাসের উচ্চ-রেজোলিউশন ছবিতে দেখা গেছে, ঘাঁটির উত্তর দিকের হ্যাঙ্গার ও কারিগরি ভবনগুলোর ছাদ ধসে পড়েছে এবং রানওয়েতে পোড়া দাগ ও ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে।
বন্দর আব্বাস নৌঘাঁটি: এটি ইরান নৌবাহিনীর প্রধান সদর দপ্তর। গত ২ মার্চের প্ল্যানেট ল্যাবসের চিত্রে দেখা গেছে, পুরো বন্দরজুড়ে বিধ্বংসী আঘাত হানা হয়েছে। যার মধ্যে ইরানি যুদ্ধজাহাজ ‘আইআরআইএস মাকরান’ এ সরাসরি আঘাতের ফলে সেটির হাল বা কাঠামোতে আগুন ধরে যায় এবং ডেক থেকে ঘন কালো ধোঁয়া উড়তে দেখা যায়।
নাকুরা (ইউনিফিল সদর দপ্তর): দক্ষিণ-পশ্চিম লেবাননের এই কৌশলগত সামুদ্রিক সীমান্ত এলাকাটি জাতিসংঘ অন্তর্বর্তীকালীন বাহিনীর সদর দপ্তর। ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে সংগৃহীত চিত্রে দেখা গেছে, পুরো এলাকাজুড়ে ইসরায়েলি হামলায় ১০০টিরও বেশি ভবন সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে।
বিন্ত জুবাইল: দক্ষিণ লেবাননের এই ঐতিহাসিক সীমান্ত শহরটিতে ইসরায়েলি স্থল অভিযান ও বিমান হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। স্যাটেলাইট বিশ্লেষণ নিশ্চিত করেছে যে, এখানকার প্রায় ৭২৫টি বাড়িঘর ও স্থাপনা মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে।
রাচাফ, কোজাহ এবং বেইত লিফ: সীমান্ত সংলগ্ন এই পাহাড়ি ও আবাসিক এলাকাগুলোতে তীব্র হামলায় পুরো জনবসতি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। উচ্চ-রেজোলিউশন চিত্রে দেখা গেছে, কোজাহ ও বেইত লিফ অঞ্চলের ঐতিহাসিক সেন্ট জোসেফ চার্চ সহ প্রাচীন বেসামরিক ও ধর্মীয় উপাসনালয় এবং একটি জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা অবস্থান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইরানের ওপর হামলার জবাবে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্র দেশগুলোর সামরিক ঘাঁটিতে পাল্টা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে তেহরান।
আল উদেইদ বিমান ঘাঁটি (কাতার): দোহা থেকে ৩০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত এই ঘাঁটিটি মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের ফরওয়ার্ড হেডকোয়ার্টার্স। গত ৪ এপ্রিলের স্যাটেলাইট চিত্রে এখানে তিনটি স্থানে আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে, যার মধ্যে একটি লজিস্টিক অপারেশন ভবন সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে এবং ‘ক্যাম্প অ্যান্ডি’ হাউজিংয়ের একটি ভবন আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
আলী আল সালেম বিমান ঘাঁটি (কুয়েত): ১ মার্চের এয়ারবাস স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, কুয়েতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দ্বারা ভূপাতিত ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষের আঘাতে ঘাঁটির উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পশ্চিমের অন্তত ৯টি লজিস্টিক ও তাবু এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
আল-ধাফরা বিমান ঘাঁটি (সংযুক্ত আরব আমিরাত): আবুধাবির দক্ষিণে অবস্থিত এই ঘাঁটিতে মার্কিন বিমান বাহিনীর ৩৮০তম এয়ার এক্সপেডিশনারি উইং অবস্থান করে। গত ৭ এপ্রিলের সেন্টিনেল ও এয়ারবাসের চিত্রে দেখা গেছে, ইরানি হামলায় ঘাঁটির বেশ কয়েকটি প্রধান এয়ারক্রাফট হ্যাঙ্গার সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটি (সৌদি আরব): রিয়াদ থেকে ৮০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত এই ঘাঁটিতে গত ২৯ মার্চের ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় প্রধান রানওয়েতে সরাসরি আঘাতের ফলে বড় গর্ত তৈরি হয়েছে এবং রানওয়ের পাশে দাঁড়ানো বিমানের টারমাক ও সংলগ্ন ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর (বাহরাইন): মানামার মিনা সালমান নৌ-স্থাপনায় অবস্থিত মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই মার্কিন নৌ-কমান্ড সেন্টারে গত ১ মার্চ ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সরাসরি আঘাত হানে। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, ঘাঁটির একাধিক অত্যন্ত সংবেদনশীল রাডার ডোম ধুলোয় মিশে গেছে এবং বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।





