তবে ট্রাম্পের এই দাবি অস্বীকার করেছে ইরান। তেহরানের দাবি, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি কোনো আলোচনায় বসেনি; হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে শুধুমাত্র ওমানের সঙ্গে কথা চলছে। এদিকে ইরানের সংবাদ সংস্থা ফার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের পার্লামেন্টে একটি বিল পর্যালোচনাধীন রয়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও অন্যান্য ‘শত্রু’ দেশের জাহাজ চলাচল হরমুজ প্রণালিতে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব রয়েছে।
কতটা বাস্তবতা আছে ট্রাম্পের আশাবাদে?
বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্প গত কয়েক মাস ধরেই ইরানের পরাজয় ঘোষণা করে যুদ্ধের সমাপ্তি নিয়ে আশা জাগিয়ে আসছেন। বিপরীতে ইরানি কর্মকর্তারা বারবার বলছেন, তারা দীর্ঘ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। এই যুদ্ধের পুরো সময়জুড়ে ট্রাম্প বড় ধরনের হামলার হুমকি দিয়ে আবার তা প্রত্যাহার করার এক অদ্ভুত চক্রে ঘুরপাক খাচ্ছেন। যেমন গত ৭ এপ্রিল তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, ইরান যদি হরমুজ প্রণালি না খোলে তবে ‘পুরো একটি সভ্যতা রাতেই ধ্বংস হয়ে যাবে।’ কিন্তু আল্টিমেটামের দুই ঘণ্টা বাকি থাকতে তিনি সেই হুমকি প্রত্যাহার করে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন।
কুইন্সি ইনস্টিটিউটের নির্বাহী সহ-সভাপতি ত্রিতা পারসি আল-জাজিরাকে বলেন, ট্রাম্পের এই বারবার হুমকি ও হামলা বাতিলের প্রবণতা আসলে শান্তি আলোচনার সম্ভাবনাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তিনি বলেন, ‘এটি একটি ক্লান্তিকর ধারায় পরিণত হয়েছে। এক সময় আলোচনার সব বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে যাবে।’ ওয়াশিংটনের মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের কূটনৈতিক ফেলো অ্যালান আয়ার বলেন, ইরান মনে করছে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কথা বলে লাভ নেই, কারণ ‘যুক্তরাষ্ট্রের কথার ওপর ভরসা করা যায় না’।
সমরাস্ত্র সংকট ও পাল্টা প্রতিক্রিয়া
রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো মাইকেল স্টিভেন্স জানান, যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। এর ফলে অঞ্চলটিতে মোতায়েন করা মার্কিন সেনারা এখন আগের চেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়েছেন। পূর্ব এশিয়ার মতো অন্যান্য কমান্ডের ওপরও চাপ বাড়ছে বলে জানান তিনি।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ট্রাম্পের বক্তব্যকে ‘নাটকীয় কূটনীতি’ বলে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। এক্সে (সাবেক টুইটার) দেয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘বিশাল হামলা আসছে... আবার বলা হচ্ছে থাক, তারা তো আলোচনা করতে চায়—এটাই হল লুপে চলতে থাকা নাটকীয় কূটনীতি। জোরজবরদস্তি, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ এবং ভুয়া খবর ছড়িয়ে সুবিধা নেয়ার কৌশল ব্যর্থ হতে বাধ্য।’
হরমুজ প্রণালি নিয়ে দর-কষাকষি
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান মার্চ মাসের শুরুতে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়ার পর থেকে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমেছে। সোমবার থেকে বৃহস্পতিবারের মধ্যে মাত্র ৩৩টি জাহাজ প্রণালিটি পাড়ি দিয়েছে, যা আগের সপ্তাহে ছিল ৫০টি। গত ১৭ জুন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হলেও অস্পষ্ট শর্তের কারণে সেটি ভেস্তে যায়। এরপর ইরান কয়েকটি জাহাজে গুলি চালালে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা শুরু করে।
গত সপ্তাহে সেই হামলা বন্ধের পর থেকে ওমানের মধ্যস্থতায় নতুন আলোচনা চলছে। বৃহস্পতিবার ইরান ও ওমান জলপথের রুট বা স্থানাঙ্ক নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছে বলে জানানো হয়েছে। তেহরানের দাবি, চুক্তিটি চূড়ান্ত হওয়ার একেবারে কাছাকাছি রয়েছে। তবে ইরান চাইছে নিজেদের জলসীমার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে এবং ভবিষ্যতে জাহাজগুলোর কাছ থেকে ফি আদায়ের সুযোগ রাখতে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র চায়, প্রণালিতে ইরানের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না এবং কোনো ধরনের ফিও আদায় করা যাবে না।
মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাবেক আরব উপদ্বীপ বিষয়ক পরিচালক ডেভিড দে রোশ আল-জাজিরাকে বলেন, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য প্রণালিটি খুলে দিতে ট্রাম্প প্রশাসন যে চাপে রয়েছে, তাতে যুক্তরাষ্ট্রকে শেষ পর্যন্ত কিছুটা ছাড় দিতে হতে পারে। তিনি বলেন, ‘সম্ভাব্য চুক্তির রূপরেখা হতে পারে এমন যে, ইরান তাদের জলসীমার নির্দিষ্ট এলাকায় অবাধ আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল সীমিত করবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এটাই সম্ভবত সেরা সমাধান।’





